রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

শেষ পাতা

সরকারি রেকর্ডে দেড় যুগের হিসাব

১২৩টি পাহাড় কাটা পড়েছে চট্টগ্রাম নগরীতে

দেবব্রত রায়, চট্টগ্রাম ব্যুরো

পাহাড় কাটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম নগরীতে। রাস্তা নির্মাণ থেকে শুরু করে আবাসন প্রকল্পসব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রথম আঘাতটা আসে পাহাড়ের ওপর। পরিবেশ-প্রতিবেশের কথা না ভেবে নির্বিচারে কাটা হয় পাহাড়।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর (মহানগর) কার্যালয়ের পাহাড় কাটার নথিপত্রে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৩ থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১২৩টি পাহাড় কাটা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি পাহাড় কাটার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর, যার বেশির ভাগ মামলা চার্জশিট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে রায় দিতে পারেননি পরিবেশ আদালত।

বন্দরনগরীতে অনেক আগে থেকেই পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটে এলেও এর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের তথ্য রেকর্ডভুক্ত আছে মাত্র পাঁচ বছরের। সেই রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত গোপন সংবাদ এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয় মোট ৭৩টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে কোটি টাকার বেশি জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত বায়েজিদ লিংক রোড নির্মাণে ১৬টি পাহাড় কাটার ঘটনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা জরিমানা করেন পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা এবং চট্টগ্রামের অঞ্চলের কর্মকর্তারা।

অভিযানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে পাহাড় কাটার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসত বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের একটা অফিস ছিল। কিন্তু কাজের সুবিধার জন্য একটি কার্যালয়কে ভেঙে চট্টগ্রাম অঞ্চল, চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম জেলা এবং গবেষণাগারনামে চারটি আলাদা কার্যালয় গঠন করা হয়। সেজন্য শুধু মামলা ছাড়া পুরনো তথ্যগুলো আর সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। যার কারণে চট্টগ্রামে মহানগর এলাকায় গত ২০ বছরে কী পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, তার সঠিক তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরেই সংরক্ষিত নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের (মহানগর) উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজের অভাবে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে আমাদের কাছে পাহাড় কাটার যে মামলা এবং অভিযানের তথ্য আছে, তাতে মহানগরে ১২৩টি পাহাড় কাটার তথ্য পাওয়া গেছে। বাস্তবে পাহাড় কাটার সংখ্যা আরো বেশি। চট্টগ্রামে কী পরিমাণ কেটে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কী পরিমাণ পাহাড় এখন টিকে আছে, তার জন্য একটি গবেষণা প্রয়োজন। এতে চট্টগ্রামের পাহাড় হয়তো রক্ষা করা সম্ভব হবে।

চট্টগ্রামে পাহাড় এখন দখলবাজদের নজরে। প্রতিনিয়ত পাহাড় দখল করে বসতি স্থাপন, ইমারত নির্মাণ করছে দখলবাজরা। বেসরকারি দখলদার তো আছেই, সেই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পাহাড় কাটায় লিপ্ত হয়েছে বিভিন্ন সময়। পাহাড় কাটা প্রতিরোধে সর্বসাধারণের সচেতনতা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্ষমতা বাড়ানো না গেলে পাহাড়শূন্য নগরীতে পরিণত হবে চট্টগ্রাম।

বিষয়ে পরিবেশবিদ মো. ইদ্রিশ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রম দুর্বল। বেশির ভাগ সময়ে পাহাড় কাটার পর তারা জানতে পারেন। কিন্তু আগে কাটার তথ্য তারা জানতে পারেন না। সেজন্য পহাড় কাটার পর জরিমানা করে দায় সারে পরিবেশ অধিদপ্তর। পাহাড় রক্ষা যদি তারা করতেই না পারে, তাহলে কীভাবে করা সম্ভব সে বিষয়ে তারা সরকারের কাছে কেন সুপারিশ করে না? কিন্তু তারা শুধু জরিমানা করেই চুপচাপ থাকে। তাছাড়া পাহাড় কাটা নিয়ে যে মামলা হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তাতেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। পাহাড় রক্ষা করতে হলে পরিবেশ আদালতকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তাছাড়া মামলাগুলোর দ্রুত চার্জশিট দেয়া, সাক্ষী উপস্থাপন, জড়িতদের বিরুদ্ধে রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। নয়তো পাহাড়শূন্য নগরীতে পরিণত হবে চট্টগ্রাম।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে ২০০৭ সালে পাহাড়ধসের ঘটনায় ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। সময় পাহাড়ধস প্রতিরোধ, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং পাহাড়ে বসতি স্থাপন না করার জন্য জেলা প্রশাসককে প্রধান করে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৯ সলের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত কমিটির সর্বশেষ সভা তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে ১৭টি পাহাড় উল্লেখ করা হয়। এসব পাহাড়ে ৮৩৫ পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। দখলদারদের কারণে কয়েক বছর পর পাহাড়গুলো থাকবে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান পরিবেশবিদরা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন