শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

দেশের খবর

নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ বিএসইসির প্রতিষ্ঠানে

সুজিত সাহা, চট্টগ্রাম ব্যুরো

লোকসানের মুখে একে একে বন্ধ কিংবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পর বর্তমানে বাংলাদেশ ইস্পাত প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নয়টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে লাভের ধারায় আছে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। লাভে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে নিয়োগ পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধরনের অনিয়ম বাড়তে থাকলে অচিরেই দক্ষ জনবলের সংকটে পড়বে প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশ ইস্পাত প্রকৌশল করপোরেশনের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন নথি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, করপোরেশনের অধীন এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাকে পুঁজি করে অনিয়ম হচ্ছে। অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দোষীরা শাস্তির আওতায় আসছে না।

বিএসইসির অধীনে চালু থাকা লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গাজী ওয়্যারস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির অফিস সহকারী সংস্থার কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুর রহমান। তার বাবা গোলাম মোস্তফা ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগ উঠেছে, মাসুদুর রহমান তার বাবার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে একটি জাল সার্টিফিকেট নিয়ে ২০০৭ সালে গাজী ওয়্যারসে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি দুটি পদোন্নতি লাভ করেন এবং সিবিএর প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। মাসুদুর রহমান যে পদে চাকরি করছেন, সেটির ন্যূনতম যোগ্যতা এইচএসসি হলেও মাসুদুর রহমান যথাযথ সনদ ছাড়াই পদে আবেদন করেছিলেন। অভিযোগ আসার পর মাসুদুর রহমানের সার্টিফিকেট নিয়ে গাজী ওয়্যারসকে বিষয়ে তদন্ত করতে নির্দেশ দেয় বিএসইসি। তদন্তে সম্প্রতি মাসুদুর রহমানের সার্টিফিকেট জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণ পায় কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের অক্টোবর মাসুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে গাজী ওয়্যারস লিমিটেড।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাসুদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের একাধিক অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে। দৈনিক ভিত্তিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর আমাকে জুনিয়র অফিস সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অক্টোবরের তারিখ থেকে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্তাধীন রয়েছে। বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বিএসইসির আরেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে নিয়োগ পদোন্নতির ক্ষেত্রেও। ২০১১ সালে প্রগতির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে যান্ত্রিক প্রকৌশলী হিসেবে আবেদন করেন প্রগতিতে বর্তমানে কর্মরত কায়কোবাদ আল মামুন। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর প্রকৌশলীর পদে ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে প্রগতির উৎপাদন কারখানায় উপপ্রধান প্রকৌশলীর (উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান) দায়িত্বে থাকা কায়কোবাদ আল মামুন ফরিদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ২০০৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যার সনদ ইস্যু হয় ২০০৭ সালের ১৩ জুন। অর্থাৎ ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দেখিয়ে কায়কোবাদ আল মামুন যান্ত্রিক প্রকৌশলী হিসেবে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে নিয়োগ পেয়েছেন। এরপর ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ইস্যুকৃত বিএসসি ইন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ডিগ্রির একটি সাময়িক সনদ জমা দিয়ে ২০১৭ সালে উপপ্রধান প্রকৌশলীর পদোন্নতির চেষ্টা চালান কায়কোবাদ আল মামুন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক সনদটি ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ফেরত দেয় প্রগতি। যদিও অভিযোগ সত্ত্বেও কায়কোবাদ আল মামুন বর্তমানে প্রগতির বাড়বকুণ্ডে অবস্থিত উৎপাদন কারখানার প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

একই ধরনের আরো একটি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে গাজী ওয়্যারস লিমিটেডে। সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সিবিএ সভাপতি অলক কুমার দেওয়ানজী (অফিস সহকারী-উৎপাদন) অবৈধভাবে মজুরী কমিশন থেকে পে-কমিশনের চাকরি রূপান্তর করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বিএসইসির ব্যবস্থাপক (তদন্ত) মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিএসইসিকে অবহিত করতে গাজী ওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর গাজী ওয়্যারসের সিনিয়র মাস্টার টেকনিশিয়ান শেখ দিদার মাহমুদ বিএসইসির চেয়ারম্যান বরাবর একটি অভিযোগ দেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৯৮৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অলক কুমার দেওয়ানজী প্লান্ট অপারেটর (মজুরি কমিশন স্কেল) হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ১৯৯৬ সালের জুলাই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পে-কমিশনের ঊর্ধ্বতন করণিক পদে রূপান্তর করা হয়। যদিও বিএসইসির কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৯ সালের ক্রমিক নং-২০() মোতাবেক ঊর্ধ্বতন করণিক পদে পদোন্নতি/নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজে তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট করণিক পদে (ক্রমিক নং-২৩/) পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এর আগে একই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গাজী ওয়্যারসের অলক কুমার দেওয়ানজীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ অধিদপ্তরের নিরীক্ষা হিসাবরক্ষণ অফিসার মো. আবুল হোসেন গাজী ওয়্যারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে -সংক্রান্ত চিঠি দেন। চিঠিতে মজুরি কমিশন থেকে পে-কমিশনে অবৈধ পন্থায় রূপান্তরের ঘটনায় ২৩ লাখ ৯৫ হাজার ৯২০ টাকা বেতন-ভাতা পরিশোধজনিত ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ সত্ত্বেও অলক কুমার দেওয়ানজীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজী ওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম কবির বণিক বার্তাকে বলেন, সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগে বিষয়টি করপোরেশন তদন্ত করেছে। প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিএসইসির নিয়ম অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন