বুধবার | জানুয়ারি ২০, ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

সময়ের ভাবনা

সাইবার নিরাপত্তা বিঘ্নের হুমকি মোকাবেলা প্রসঙ্গে

মামুন রশীদ

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর নতুন করে সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থা ও এটিএম বুথে নজরদারি বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো। পত্রিকায় এসেছে কোনো কোনো ব্যাংক রাতে এটিএম বুথ বন্ধ রাখা শুরু করেছে।

বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয়। এতে বলা হয়, উত্তর কোরিয়াভিত্তিক হ্যাকার গ্রুপ ‘বিগল বয়েজ’ ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা আবার বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন ও সুইফট নেটওয়ার্কে হ্যাকিং করতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিরাপত্তা বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো। 

এর আগে গত আগস্টে করোনার মাঝেই বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর নতুন করে সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখনো উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গ্রুপ এই হামলা চালাতে পারে বলে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ফলে অনেক ব্যাংক অনলাইন ব্যাংকিং সেবা সীমিত করে। কোনো কোনো ব্যাংক অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন বন্ধ করে দেয়।

দেশের প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমে আগেও সাইবার ঝুঁকি, বিশেষত কভিডকালে বর্ধিত সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবধানবাণীর কথা এসেছে। দেশের বেশকিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকে সম্প্রতি এটিএম জালিয়াতি, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি বা আইটি ফায়ারওয়াল ভেঙে হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার অভিঘাত থেকে আমরা এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। যদিও এ জালিয়াতি যতটা না সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট, তার চেয়ে বেশি শারীরিক চুরি; যা আইটি বা প্রাযুক্তিক ফায়ারওয়াল ভেঙে করা হয়েছে। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।

আজকের বিশ্বে তথ্য ব্যবস্থা ও নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা অধিকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তার গুরুত্ব অনুধাবন করে সব উন্নত দেশ সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তথাপি উন্নয়নশীল দেশগুলো এ অধিকার নিশ্চিত করার বিষয় থেকে এখনো অনেক দূরে। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। নেটওয়ার্ক হুমকি মোকাবেলা ও নিরাপদ ইনফরমেশন সোসাইটি তৈরি করার জন্য সার্বিক প্রতিকার ও তার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

আইসিটি খাতে এরই মধ্যে আমাদের বেশ উন্নয়ন হয়েছে। গ্রামীণ জনপদের গরিব লোকদের মধ্যে আইসিটি ব্যবহার করে শিক্ষা শক্তিশালী করার মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসে সহযোগিতা করার প্রতি মনোযোগ দিয়েছে বর্তমান আইসিটি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় আরো পরিকল্পনা করছে গ্রহণযোগ্য প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও মানের উন্নয়ন ঘটাতে। এ সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে সাধারণ মানুষের উন্নতি হবে এবং তা দেশের সার্বিক উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে পারবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আরো ভালো চাষাবাদ ও নিজেদের পণ্যের আরো ভালো বিপণন বা মার্কেটিংয়ের জন্য একটা পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রবেশাধিকার দেয়া হচ্ছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় তথ্য গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকদের একটি বড় অংশ দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের কাজ করতে পারবে।

বর্তমানকালে অর্থনৈতিক শক্তি ও ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠেছে শিক্ষা। এজন্য জ্ঞানের আদান-প্রদানের ওপর ক্রমেই বিধিনিষেধ বাড়ছে। চলমান বিশ্বায়ন ও তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য পণ্য ও সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে সবার জন্য বিশেষ করে গরিব মানুষদের কল্যাণ বৃদ্ধিতে নির্ণায়ক ও উপকারী ভূমিকা রাখতে চাইলে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে নতুন উদ্যমের সঙ্গে চলতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকি মোকাবেলায় কিছু নীতি গ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে জাতীয় আইসিটি নীতি, সাইবার আইন, ইলেকট্রনিক ট্রানজেকশন অ্যাক্ট গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা কম্পিউটার অ্যালার্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি রেসপন্সেস-সংক্রান্ত সঠিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে।

সাইবার বিশ্বে বাংলাদেশ নতুন। এখানকার সমাজ বিপুল উৎসাহে সাইবার সম্পদ ব্যবহার করছে। তবে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়া সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি ধীরে এগোচ্ছে। সরকার ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এনসিএসটি) গঠন করেছে। এনসিএসটিতে এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের কাজ হলো কাউন্সিলের তৈরি করা নীতি বাস্তবায়ন করা। জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালায় আইসিটির উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রফতানি বাজার ধরতে, সুশাসন নিশ্চিত করতে, আইসিটি-সংশ্লিষ্ট নীতি কার্যকর করতে কাজ চলছে। সফটওয়্যার প্রকল্পের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দরকার। বিশ্বমানের আইসিটি পেশাদার গড়ে তুলতে এবং এ খাতে ভালো করার জন্য একটি বিশ্বমানের আইসিটি ইনস্টিটিউশন গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কোর্স চালু করতে হবে, যাতে আমাদের নতুন প্রজন্ম সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যনিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে এবং দেশের আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলার যোগ্যতা অর্জন করে।

সাইবার অপরাধ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সাইবার অপরাধ আইন ও প্রয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশজুড়ে প্রশিক্ষণ চালুর জন্য আরো প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এ দেশের নীতিতে আরো যোগ হওয়া উচিত ব্যক্তিগত গোপনীয়তাবিষয়ক নীতি, ট্রাস্ট মার্কস ও অন্যান্য স্বনিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ; যা পণ্যের মান ও সেবার উন্নতি ঘটাবে এবং ভোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি করবে।

আমরা ক্রমাগত আরো ডিজিটালাইজড বিশ্ব বা আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছি। কভিডকালে বিকল্প ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে নতুন নতুন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে এবং হয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ ও সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক গুণ বেড়েছে। এখানে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বেশি কাম্য। আরো বেশি উন্নত প্রক্রিয়া ও অবকাঠামো আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করতে পারে। তাই প্রযুক্তির বৃহত্তর ব্যবহার বিবেচনায় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের এখনই সময়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে আরো অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে।


মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন