বুধবার | জানুয়ারি ২০, ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

মুষ্টিমেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুক সিপিটিইউ

উন্নয়ন জোরদারে সরকার নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং প্রচলিত ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচনের মাধ্যমে সেগুলো বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়াগত কিছু দুর্বলতার কারণে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজগুলো গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। একাধিক বা ততোধিক প্রকল্পের কাজ একসঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ন্যস্ত হওয়ায়ই কোনোটিই সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে, তদুপরি কাজের মানও খারাপ হচ্ছে। বড় বিষয় হলো, বড় প্রতিষ্ঠানের একাধিপত্যে ঠিকাদারি ব্যবসায় নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো কাজ পেলে সেটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো কাজ  যেন না পায়, সেটি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে সাম্প্রতিক একনেক বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করুক সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)।               

সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায়  বেশ আগেই ই-টেন্ডারিং প্রবর্তন করা হলেও উদ্দেশ্যের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি। মূলত আইনি মারপ্যাঁচেই ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে সুনির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সব কাজ ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় হলেও বর্তমান সরকারি ক্রয় আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে দর দেয়ার বিধান থাকায় সব ঠিকাদারের দর একই হয়ে যায়। ফলে সর্বনিম্ন দরদাতা একাধিক হওয়ায় যার কাজের অভিজ্ঞতা, বার্ষিক লেনদেন (টার্নওভার), আর্থিক সক্ষমতা বেশি, সে-ই কাজ পেয়ে যায়। স্বভাবত এক্ষেত্রে গুটিকয়েক বড় ঠিকাদারই প্রাধান্য পাচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠান বেশি কাজ পাওয়ায় সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ার পাশাপাশি বারবার ডিপিপি সংশোধন করায় বাড়ছে ব্যয়। ক্যাসিনো কাণ্ডে কারা অন্তরীণ যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড এককভাবে বিপুল অর্থের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সরকারি উন্নয়মূলক কাজ পাওয়ার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে এলে ক্রয় আইনের দুর্বলতাসহ নানা বিষয়ে সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছিল। ই-টেন্ডার প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর ও স্বচ্ছ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় মতামত ও পরামর্শ নিয়ে আইনের কিছু ধারা সংশোধনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। অনেকটা সময় পেরোলেও এক্ষেত্রে অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এটা হতাশাজনক।  

অভিযোগ রয়েছে, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও মূল্যায়ন কমিটির কর্মকর্তারা দুর্বল আইনের সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। যেসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হবে, আগে থেকেই তাদের নির্ধারণ করে রাখে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান। সুবিধাজনকভাবে ডিপিপি তৈরি করে আগে থেকে ওই প্রতিষ্ঠানকে দরও জানিয়ে দেয়া হয়। এতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা বিনষ্ট হচ্ছে। কাজেই দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় ঠিকাদারি কাজ দেয়ার দৃষ্টান্তও কম নয়। উপর্যুপরি সরকারের আমলে এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও সুশাসন নিশ্চিতে এ ধরনের মন্দ সংস্কৃতিরও অবসান জরুরি।

ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকিতে ৪৮টি উপজেলায় নাগরিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত, নিয়মিত নিরীক্ষা পরিচালনা, দুর্নীতিবিরোধী বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানসহ দেশের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বর্তমানে কিছু শক্তিশালী দিক থাকলেও এর দুর্বলতা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বরাবরই সোচ্চার বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে (ওটিএম) প্রাক্কলিত মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে দর দাখিলের নিয়ম বাতিল, দরপত্র বাস্তবায়ন অগ্রগতিকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে প্রতিটি অংশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে প্রতি অংশের জন্য জরিমানার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। আর সীমিত দরপত্রের (এলটিএম) সমস্যা সমাধানে ৫ শতাংশের ওপরে বা নিচে দর দেয়ার পদ্ধতি বাতিল, ছোট ঠিকাদারদের পৃথক তালিকা করে তাদের এককভাবে এলটিএমে অংশ নেয়ার সুযোগ প্রদান, এলটিএম দরপত্রের ৩ কোটি টাকার শর্ত কমানো, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার পরিপন্থী অভিজ্ঞতা না থাকা প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার বর্তমান আইন প্রদত্ত সুযোগ এবং লটারি পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচনের পদ্ধতি বাতিলের পরামর্শ সংস্থাটির। বাজার বিকৃতি প্রতিরোধ, দর প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও গুটি কয়েকের একাধিপত্য অবসানে এসব পরামর্শ আমলে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া চাই।

শুধু আইনি সংস্কার নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বাড়ানোও প্রয়োজন। বর্তমানে ই-টেন্ডারিং প্রক্রিয়া পরিচালনায় নিয়োজিত সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিউইউ) আইনগত কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বশাসন, লোকবল, গবেষণাসহ বিভিন্ন দিক থেকে সীমাবদ্ধতায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিশ্চিতে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চলমান উন্নয়নযজ্ঞের সুবাদে বাংলাদেশে সরকারি ক্রয়ে ব্যয় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে সরকারি ক্রয়ের পরিমাণ আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাজেটের যা ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির যা ৮ শতাংশ। কিন্তু গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে সরকারি কাজ আটকে পড়ায় উল্লিখিত পরিমাণ অর্থের গুণক প্রভাব সমাজে ব্যাপকভাবে যেমন পড়ছে না, তেমনি সুশাসনের উন্নয়নও ঘটছে না। সর্বোপরি নতুন প্রতিষ্ঠার গড়ারও প্রতিবন্ধক এটি। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অনুসরণপূর্বক সরকারি ক্রয় এবং দরপত্র প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সংশ্লিষ্টরা জুতসই পদক্ষেপ নেবেন বলে প্রত্যাশা।   

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন