বৃহস্পতিবার | জানুয়ারি ২১, ২০২১ | ৮ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ থেকে হিমেল বরকত হয়ে ওঠার গল্প

জাহিদুল ইসলাম জিন্নাহ্

ভাই রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে দাদা বলে ডাকতেন হিমেল বরকত। দাদা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সান্নিধ্য পেয়েছেন অনেক কম। দাদার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতিও তাই তার খুব অল্প। স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার নাম বদলে দিল। বাবা তার নাম রেখেছিলেন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ। রুদ্র স্কুলের ফরমে তার নাম নির্ধারণ করে দিল- হিমেল বরকত। রুদ্র নিজেও বদলে নিয়েছিল নিজের নাম, লেখালেখির শুরুর দিকেই। মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।

স্কুলে পড়ার সময় টুকটাক ছড়া লিখতেন হিমেল বরকত। একদিন তার মেজো আপা (সোফিয়া শারমিন) খাবার টেবিলে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে জানাল, ‘দাদা, বাবু তো ছড়া-টড়া লিখছে। তুমি একটু দেখে দিও।’ হিমেল বরকত স্বভাবসুলভ লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেন। দাদা হেসে বললো, ‘ভালো তো! আমাকে দেখিয়ো।’ হিমেল বরকত গোপনে-গোপনে ছড়াগুলো নতুন করে, কাটাকুটি ছাড়া আলাদা কাগজে তুললেন। কিন্তু দাদাকে দেখাবার লজ্জাটুকু কাটাতে পারলেন না। লেখা আর দেখানো হল না। তবে, আবৃত্তি শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কাছ থেকে। স্কুলের প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত কবিতাগুলো তারা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কণ্ঠে রেকর্ড করে নিতেন, তারপর ওগুলো শুনে-শুনে নিজেদের প্রস্তুত করতেন। এখনো তার কানে বাজে দাদার সেই ভরাট-দরাজ গলার আবৃত্তি, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃসময়’ কবিতাটি- যেটি আবৃত্তি করে স্কুলে প্রথম হয়েছিলেন হিমেল বরকত। পরে জেনেছেন, ঢাকায় যে কজন কবি স্বকণ্ঠে কবিতাপাঠে শ্রোতাপ্রিয় ছিলেন, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাদের অন্যতম।

ভাই রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে ঘিরে টুকরো-টুকরো কিছু স্মৃতি রয়েছে হিমলে বরকতের। কিন্তু সেগুলো দিয়ে ব্যক্তি রুদ্রের সমগ্রতাকে দাঁড় করানো যায় না। বয়স এবং অবস্থানগত দূরত্বের কারণে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য তার ভাগ্যে জোটেনি। অথচ, দাদাই নির্ধারণ করে দিয়েছে তার পথ। মনে পড়ে, দাদা বেঁচে থাকতে দাদার পরিচয় দিতে গিয়ে সংকোচ বোধ করতেন। সংকোচের কারণও ছিল। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয়পর্বের শুরুতে বাবা-মার পরিচয় জেনেই জিজ্ঞেস করত, ‘তোমার বড় ভাই কী করে?’ বলতেন, ‘কবি। কবিতা লেখে।’ এই উত্তর তাদের সন্তুষ্ট করতে পারতো না। বিস্ময়-বিহ্বল চোখে তাদের অবধারিত পরবর্তী প্রশ্ন হতো, ‘আর কিছু করে না?’ প্রতিনিয়ত এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে-হতে তার কিশোর-মনে ধারণা জন্মালো, কবিতা লেখা বা লেখালেখি করা বোধহয় কোনো কাজের মধ্যে পড়ে না বা পড়লেও তা হয়তো সম্মানজনক কিছু নয়।

তার এই গ্লানি-সংকোচ নিমিষে উবে গেল দাদার মৃত্যুর পর। সত্যি বলতে গেলে, মৃত্যুর পরই দাদাকে তার চেনার শুরু। সেসময় প্রায় প্রতিদিনই দাদাকে নিয়ে সংবাদপত্রে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক, দাদার বন্ধু, পরিচিত-অপরিচিত অনেকের লেখায়, স্মৃতিচারণে দাদার প্রবল জনপ্রিয়তা ও কবি হিসেবে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন।

তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও সংগ্রামী চৈতন্যে মুগ্ধ হলেন। এসময় কিছু শুভানুধ্যায়ী তাকে শোনালেন, ‘তোমাকেও তোমার দাদার মতো লেখালেখি করতে হবে।’ অবচেতনে হয়তো গেঁথে গিয়েছিল সেই স্বপ্নের বীজ। দাদার কবিতা পড়তেন প্রচুর আর একটু-একটু লেখারও চেষ্টা করতেন। এরপর কলেজ শেষ করে ভর্তি হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, লেখালেখির স্বপ্নে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চোখে ও চৌদিকে’। সময়টা ২০০১ সাল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘দশমাতৃক দৃশ্যাবলী’। এরপরে বের হয় ‘বৈশ্ববিদ্যালয়’ নামে আরেকটি কবিতার সংকলন। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তার সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের আদিবাসী কাব্য সংগ্রহ’। দেশের ২৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কবিতা নিয়ে তিনি বইটি প্রকাশ করেন। তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হলো ‘কবিতা সমগ্র ত্রিদিব দস্তিদার’, ‘বাংলাদেশের আদিবাসী কাব্য সংগ্রহ’, ‘চন্দ্রাবতী রামায়ণ ও প্রাসঙ্গিক পাঠ’ প্রভৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে টানা দু-বছর দাদার রচনাবলি সম্পূর্ণ করার কাজে মনোনিবেশ করলেন। দাদার মৃত্যুর পর ‘কবি রুদ্রে’র সঙ্গে যে-পরিচয়, তা আরো ঘনিষ্ঠ হল এসময়। দাদার পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, সংবাদপত্র-সাময়িকী, বিভিন্ন সাংগঠনিক দলিল দেখতে-দেখতে দাদাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন। দাদা নিজেই এতো যত্নে সবকিছু গুছিয়ে না-রাখলে তার পূর্ণাঙ্গ রচনাবলি সম্পাদনা করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য হতো। বুঝতে পারলেন, যারা রুদ্রকে এলোমেলো, বোহেমিয়ান মনে করেছে তারা আসলে ভুলপাঠই করেছে রুদ্রের। কবিতার প্রতি, কর্মের প্রতি আমৃত্যু মগ্নতার পরিচয় পেয়েছেন তার সংরক্ষণ-সচেতনতায়, অসংখ্যবার পাণ্ডুলিপি পরিমার্জনায়, পুনর্লিখনের পরিশ্রমে। রাখাল, দ্রাবিড়, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ সংগীত পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনের মূল কাগজপত্র থেকেও বুঝতে পারেন, রুদ্রের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কত প্রগাঢ় ছিল।

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা নিয়ে তার সম্পাদনায় একে একে প্রকাশ করেন ‘রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রেমের কবিতা’, ‘রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী-১’, ‘রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী-২’, ‘রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ’ প্রভৃতি।

হিমেল বরকত ১৯৭৭ সালের ২৭ জুলাই বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার মিঠেখালি গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ডা. শেখ ওয়ালিউল্লাহ পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। মা সিরিয়া বেগম ছিলেন একজন গৃহিনী। দশ ভাই-বোনের মধ্যে ড. হিমেল বরকত সবার ছোট। সবার বড় ছিলেন প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। হিমেল বরকত ২০০৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারই সহপাঠী হাজিজা পারভীন পপির সঙ্গে। পারিবারিক জীবনে তিনি একটি কন্যা সন্তানের জনক।

হিমেল বরকতের ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে তার জন্মস্থান মিঠেখালি গ্রামে। এই গ্রামে জন্মের পর প্রায় ৬ বছর ছিলেন। শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে এই গ্রামটি জড়িয়ে রয়েছে তার। এরপরেই পড়াশোনার সুবাদে তিনি মোংলায় চলে আসেন। তারপরেও কোনো ছুটি পেলেই চলে যেতেন মিঠেখালি গ্রামে। ছোটবেলায় মাছ ধরা, সাঁতার কাটা, খেলাধুলা করা বলতে গেলে গ্রামের শৈশব যেমন হয় হিমেল বরকতের ক্ষেত্রেও তার কোনো হেরফের হয়নি। ছোটবেলায় পুকুরে মাছ ধরার সময় কোনো ছোট মাছ পেলে তারা বন্ধুরা মিলে তার নানা রকম চিকিৎসা করতেন যেমন, মলম লাগিয়ে দেয়া, বরিক পাউডার লাগিয়ে দিতেন। চিকিৎসা করে সেই মাছটিকে তারা ছেড়ে দিতেন। ছোটবেলায় গ্রামে গ্রামে ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো। পুরস্কার হিসেবে দেয়া হতো চিরুনী। একবার পাশের গ্রামের সঙ্গে ফুটবল খেলায় তারা হেরে যান। তার একজন বন্ধু ছিল, তার নাম কালাম। সে কোনোভাবেই এই হারটি মেনে নিতে না পেরে মাঠের গেট লাগিয়ে প্রতিপক্ষদের ইচ্ছেমতো পিটিয়েছিল সেইদিন।

হিমেল বরকত মোংলার সেইন্ট পলস হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের সূচনা করেন। সেখান থেকেই ১৯৯৪ সালে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৯৬ সালে নটরডেম কলেজ থেকে পাস করেন উচ্চ মাধ্যমিক। লেখালেখির স্বপ্নে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখান থেকেই সম্পন্ন করেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ‘বাংলাদেশের কবিতায় উত্তর ঔপনিবেশিক কণ্ঠস্বর’ বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আমৃত্যু সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন।

হিমেল বরকত তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন। সদ্য স্কাউটে যোগ দিয়েছেন। প্রতি শুক্রবার যেতেন ক্লাস করতে। এমনই এক শুক্রবারের (২১ জুন, ১৯৯১) দুপুরে ক্লাস শেষে বাড়ির পথে ফিরছেন, তখনই খবর পেলেন- দাদা খুব অসুস্থ, তাদের ঢাকায় যেতে হবে। বাসায় পৌঁছে বুঝতে পারলেন, দাদা আর নেই। গ্যাস্ট্রিক আলসারে আক্রান্ত হয়ে দশদিন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে, তার পরদিনই সকালে হার্ট অ্যাটাক। কী ভয়ংকর আকস্মিক এই সংবাদ! ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, কিছুতেই কান্না থামে না। শুনলেন দাদাকে বাড়ি আনা হবে। তাদের আর ঢাকায় যেতে হল না। দাদা এলো ট্রাকে। ফুলে-ফুলে সাজানো কফিন, হাজার-হাজার মানুষের ভালোবাসার স্মারক। বড় আপা (শরিফুন হাসান বীথি) তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে-দিতে নিজেই কেঁদে উঠলেন: ‘দেখ, দাদাকে নিয়ে এসেছি। ফুল দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে এসেছি।’ তারা ট্রলারে উঠলেন। নানাবাড়ি মিঠেখালিতে দাদার কবর দেয়া হবে। ট্রলারের ছাদে বসে, কফিনের পাশে নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছেন আর মনে-মনে অসংখ্যবার পড়ে চলেছেন দাদার শেষ কবিতার দু-লাইন : ‘মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর আকাশ দ্যাখা হয় না/ এতো কিছুই দ্যাখার থাকে, এতো কিছু দেখতে হয় মাটিতে প্রতিদিন’। বাইরে তখন ট্রলারের যান্ত্রিক গর্জন আর তার ভেতর ভাই-হারানোর হাহাকার। অশ্রুঝাপসা চোখে আকাশের দিকে তাকালেন। ভাবলেন- আকাশ দেখতে না পারার কষ্টেই কি দাদা আকাশ হয়ে গেল? আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলে গেল?

ভাই রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো কবি ও শিক্ষক হিমেল বরকতও খুব অল্প বয়সেই আকাশ হয়ে গেলেন। ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নেয়ার সময় হার্ট অ্যাটাক হয় হিমেল বরকতের। পরে তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে। সেখানে আরো দুইবার হার্ট অ্যাটাক হয় তার। পরদিন ২২ নভেম্বর ভোর ৪টায় মারা যান তিনি।

লেখক:

মিডিয়া কর্মী ও গবেষক

[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন