বৃহস্পতিবার | জানুয়ারি ২১, ২০২১ | ৮ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এখন সময়ের দাবি

ফারজানা ভূঁইয়া

জীবনকে সহজ করে চিন্তা করা সহজ নয়। সহজভাবে চলতে পারাও সহজ নয়। তার জন্য সাহস থাকা দরকার। সেই সাহসটাকে ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে লালন করতে হয় একটু একটু করে। একদিনে চাইলেই কেউ সেই সাহস অর্জন করতে পারেন না। এটি এমন না যে ট্যাবলেটের পাতার মতো কিনতে পাওয়া যায়, কিনলাম আর গ্লাস ভর্তি পানি দিয়ে খেয়ে নিলাম। জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত আসতে পারে বা আসে, তাই বলে জীবনকে উপভোগ কেন করবো না? কেন একটা খারাপ সময়ের জন্য সারাটা জীবনকে মলিন করে দিতে হবে? জীবনকে সব কিছুর পরও সহজভাবে গ্রহণ করাও ‘সহজ জীবনের’ জন্য অপরিহার্য একটি বিষয়। আর যদি আপনি মনে করেন জীবনে আপনার ‘অসংখ্য না পাওয়ায় পরিপূর্ণ’। তাহলে আমি বলবো -জীবনে না পাওয়া বলে কিছু যদি নাই থাকে তাহলে জীবনের পাওয়ার আনন্দ যে মলিন হয়ে যেতো। জানি, না পাওয়াকে মেনে নেয়াটা সহজ নয়। এটি অনেক কঠিন কাজ। আর সেই কঠিন কাজটি তারাই করতে পারে যারা জীবনে বাঁচতে জানে। জীবনকে তো আগে বাঁচিয়ে রাখা চাই, তাই না? যদি বেঁচেই না থাকেন তাহলে জীবন যুদ্ধটায় জয়ী হবেন কেমন করে? 

জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে তাই নিত্য চলে টানাপোড়েনের খেলা। সেই টানাপোড়েনের খেলায় প্রতিটি দিন যে ‘আমি জিতে যাই’ তা কিন্তু নয়। তারপরও প্রতিটি সকাল কিছু কিছু মানুষকে নতুন করে বাঁচার আশা জাগায়। প্রতিটি সকাল তাই আমার জন্য জীবনের নতুন প্রাপ্তি। কেন? কারণ আমি তো আজ অনেক রকম হতাশায় জীবন পার করতে পারতাম, হয়তো পরিবারের কারো জন্য, হয়তো চলার পথে কোন দুর্ঘটনায় চলে যেতে পারতো শরীরের কোন অংশ, হয়তো জীবনের শেষ দিন কবে তা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে গুণতে হতো চোখের জলে, হয়তো জীবনে শুধু এক মুঠো খাবারের জন্য হাত পেতে বসে থাকতে হতো রাস্তায়। এই সবের কিছুই তো আমার সাথে ঘটেনি তারপরও কিসে এত হতাশা?

হ্যাঁ, হতাশা এক অদ্ভুত বিষয়। হতাশা কেন কীভাবে মানুষের মনে বাসা বাঁধে কেউ তা বুঝতেই পারে না। সব থাকলেও হতাশা থাকে আবার কিছু না থাকলেও হতাশা থাকে। আমাদের চলার পথে নানা রকম পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে নিজেকে ঠিক রাখতে গিয়েও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হতে হয়। আর শুধু ঘরের বাইরেই হতাশার বসবাস তা কিন্তু নয় যে নারী ঘরের বাইরে যান না এমনকি কোন রকম খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হননা সেই নারীটিও ভুগতে পারেন নানা রকম হতাশাসহ মানসিক সমস্যায়। এই বিষয়গুলো এখন খুব সচেতনভাবে সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রিয় মানুষটি কেন হঠাৎ করে পরিবারের সবার সাথে খারাপ আচরণ করছেন? কেন পরিচিত মানুষটি আগের মতো করে আচরণ করছে না এই সব কিছুই একটু যত্ন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রিয় মানুষটির আচরণের পরিবর্তনের সাথে আপনাকেও তার মানসিক অবস্থার এমন পরিবর্তনের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। সেই মানুষটির হাতে রাখতে হবে বিশ্বস্থতার হাত। কেবল চরম ভালবাসা আর মমতা দিয়ে সব কিছুই আগের মতো করে নেওয়া যায়। আর এই সব রকম হতাশা এবং মানসিক সমস্যা কে দূর করে জীবন কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সত্যি সহজ কোন বিষয় নয়।

তাই প্রতিটি সচেতন মানুষেরই উচিত নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। সকল কে বলতে না পারলেও অন্তত কাছের মানুষটির কাছে মানসিক অবস্থার কথা খুলে বলা। যে কোন সমস্যাই আলোচনা করলে অনেকটাই সমাধান করা যায়। আর একজন সচেতন মানুষের কখনোই নিজের মানসিক অবস্থা খারাপ বলে পরিবারের সকলের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ করে দেওয়া উচিত নয়। কারন যিনি মানসিক সমস্যায় ভোগেন তিনি নিজে অনেক সময় বুঝতে না পারলেও চারপাশের মানুষ কিন্তু তা টের পান। তাই পরিবারের এবং চারপাশের মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে যদি তারা আপনার আচরন পরিবর্তন করতে বলে তাহলে বুঝতে হবে আপানার মানসিক স্বাস্থ্য হয়তো কোন কারণে খারাপ যাচ্ছে। তাই নিজেই সচেতন হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সব রোগের মতো মানসিক সমস্যাও একটা রোগ সেটি সহজ ভাবে মানতে শিখুন।

আর কত আধুনিক সমাজ হলে আমরা বুঝতে পারবো যে মানসিক সমস্যা মানেই পাগল নয়? এটি একটি রোগ যেমন জ্বর, মাথা ব্যথ্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগ। পার্থক্য হল- এগুলো দেহের রোগ যা দৃশ্যমান আর হতাশা, অতিরিক্ত রাগ করা, মরে যেতে ইচ্ছে করা, জীবনকে উপভোগ করতে না পারা, সন্দেহ করা ইত্যাদি হলো মনের রোগ। যা মানুষ দেখতে পায় না। কিন্তু দৃশ্যমান নয় বলে এই সমস্যাকে এতটা অবহেলা করা কি ঠিক? না তা মোটেও ঠিক নয়। ঠিক নয় বলেই আজ পুলিশের এক বড় কর্মকর্তাকে নামমাত্র একটা সেন্টারে ভর্তি করাতে গিয়ে নির্মমভাবেই না মৃত্যুকে মেনে নিতে হল। যদি সকলে সচেতন হতেন তবে তো অন্যরকম কিছু হতে পারতো। জীবনটা কে আবার নতুন করে চিন্তা করতে পারতো তাই না। 

আপনার মানসিক অবস্থা সবচেয়ে ভাল আপনিই বলতে পারবেন। তাই আসুন নিজে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হই এবং নিজেদের আশে পাশের এবং প্রিয় মানুষগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হই। হয়তো আমাদের হাত ধরেই সকল আঁধার দূর হয়ে আগামীকাল নতুন সূর্য উদিত হবে বাংলার বুকে। সেই সুন্দর দিনের স্বপ্ন দেখি প্রতিটি মুহূর্তে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
শাবিপ্রবি, সিলেট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন