রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

শেষ পাতা

ছোট কোম্পানিতে বড় রিটার্ন

মেহেদী হাসান রাহাত

দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন দেয়ার দিক থেকে স্বল্পমূলধনি তথা ছোট কোম্পানিগুলোই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্বল্পমূলধনি ১০ কোম্পানির শেয়ারে অবিশ্বাস্য রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বীমা খাতের কোম্পানি।

ব্যাংক আমানতসহ অন্যান্য খাতের তুলনায় রিটার্ন বেশি হওয়ায় বাড়তি ঝুঁকি নিয়েও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে থাকেন বিনিয়োগকারীরা। দক্ষতার সঙ্গে কৌশলী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সঠিক কোম্পানি বাছাই করতে পারলে পুঁজিবাজার থেকে আশাতীত রিটার্নও মেলে। এদিক থেকে পুঁজিবাজারে বর্তমানে ছোট কোম্পানিগুলোকেই এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে বেশি।

গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন এসেছে এমন কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে হাজার ৭৮ শতাংশ রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির প্রিমিয়াম আয় মুনাফা প্রবৃদ্ধিও হয়েছে। তবে তা শেয়ারের রিটার্নের মতো অবিশ্বাস্য হারে বাড়েনি। ২০১৫ সালে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের গ্রস প্রিমিয়াম আয় ছিল ১৪ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সাল শেষে উন্নীত হয়েছে ২৯ কোটি টাকায়। ওই বছর কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ৭২ লাখ টাকা, যা গত বছর শেষে দাঁড়িয়েছিল কোটি ৮৭ লাখ টাকায়। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি গড়ে প্রায় শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে। তবে গত দুই বছর ধরে কোম্পানিটির লভ্যাংশের পরিমাণ নিম্নমুখী রয়েছে।

বড় ধরনের রিটার্নের বিষয়ে জানতে চাইলে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের মহাব্যবস্থাপক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের বীমা খাতের সম্ভাবনা অনেক। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলনা করলে এখনো বীমা কাভারেজের দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় বীমা খাতের ব্যবসা বাড়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বীমা খাতের উন্নয়নে বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই খাতের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক রিটার্নের ক্ষেত্রেও।

রিটার্নের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এশিয়া ইন্স্যুরেন্স। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ৬৯৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০১৫ সালে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা ২০১৯ সালে কোটি ৫৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি।

জানতে চাইলে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ইমাম শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের পর্ষদ যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় এবং এখানে যারা রয়েছেন তারা সবাই বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমাদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং এক্ষেত্রে পর্ষদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয় না। আমরা ধারাবাহিকভাবে ব্যবসায়িক আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। সব মিলিয়ে এসব কারণেই বিনিয়োগকারীরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। কারণেই কোম্পানির শেয়ারে উচ্চহারে রিটার্ন এসেছে।

প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে গত পাঁচ বছরে ৬২১ দশমিক ৮০ শতাংশ রিটার্ন এসেছে, যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। ২০১৫ সালে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ১১ লাখ টাকা। গত বছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে কোটি লাখ টাকায়। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি গড়ে ১১ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।

৫২১ দশমিক ৮০ শতাংশ রিটার্নের ভিত্তিতে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স। সময়ে মুনাফা প্রবৃদ্ধিও হয়েছে কোম্পানিটির। ২০১৫ সালে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা ২০১৯ সাল শেষে কোটি ৩৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের গড়ে ১১ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।

ওষুধ খাতের কোম্পানি বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারে পাঁচ বছরে রিটার্ন দাঁড়িয়েছে ৫২৬ দশমিক ৩০ শতাংশে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে কোম্পানিটির ব্যবসা মুনাফায়ও। ২০১৫ হিসাব বছরে কোম্পানিটির মোট বিক্রি ছিল ২০৫ কোটি টাকা। গত হিসাব বছরে তা বেড়ে বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৪৬৪ কোটি টাকায়। অন্যদিকে করপরবর্তী মুনাফা ২০১৫ হিসাব বছরের কোটি ৮৫ লাখ থেকে বেড়ে ২০১৯ হিসাব বছরে এসে দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি গড়ে দশমিক শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে পাঁচ বছরে রিটার্ন এসেছে ৫০৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। যদিও সময় কোম্পানিটির আর্থিক পারফরম্যান্স ছিল নিম্নমুখী।

২০১৪ সালে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ১২ লাখ টাকা, যা ২০১৮ সাল শেষে কোটি টাকায় নেমে এসেছে। মুনাফা কমার পাশাপাশি কোম্পানিটির লভ্যাংশের পরিমাণও কমেছে সময়ে। উল্লিখিত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি গড়ে দশমিক ৪০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।

পাঁচ বছরে রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে রিটার্ন এসেছে ৪৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ। সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক পারফরম্যান্সের গ্রাফও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৫ সালে যেখানে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০১৯ সাল শেষে তা কোটি ৭৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছরে গড়ে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১২ দশমিক শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্বল্পমূলধনি কোম্পানি ইনটেক লিমিটেডের শেয়ারে গত পাঁচ বছরে ৩৩৬ দশমিক শতাংশ রিটার্ন এসেছে। ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে লাখ ৯০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছিল কোম্পানিটির। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে কোম্পানির মুনাফা হয়েছে কোটি ২৩ লাখ টাকা। সময়ে কোম্পানিটি গড়ে ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে। যদিও ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে কোম্পানিটি।

বীমা খাতের সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে পাঁচ বছরে ৩২০ দশমিক শতাংশ রিটার্ন এসেছে। ২০১৫ সালে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০১৯ সাল শেষে সেটি দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি টাকায়। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি গড়ে ১১ দশমিক শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে গত পাঁচ বছরে ৩১৭ দশমিক শতাংশ রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ২০১৫ সালে কোম্পানিটির করপরবর্তী মুনাফা ছিল কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা ২০১৯ সাল শেষে কোটি ৯৭ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। সময়ে গড়ে কোম্পানিটি ১০ দশমিক শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের জুলাই থেকেই বীমা খাতের বিভিন্ন কোম্পানি বিশেষ করে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গিয়েছে, যার প্রভাবে খাতের কোম্পানিগুলোর সার্বিক রিটার্নও বেড়েছে অনেক। বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধন কম হওয়ার কারণে শেয়ার সংখ্যাও কম। ফলে খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে কারসাজি করাও সহজ। কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের ব্যবসায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হওয়া সত্ত্বেও শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির বিষয়টিকেও এখন সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন