বুধবার | জানুয়ারি ২০, ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

দেশের খবর

সিলেটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড

আগুনের সূত্রপাত নিয়ে মতানৈক্য, প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপত্তা

দেবাশীষ দেবু, সিলেট

সিলেটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের পর এখনো স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। ঘটনার ৩৭ ঘণ্টা পর আংশিক ৫১ ঘণ্টা পর পুরো সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও এখনো দিনের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং লেগে থাকে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের উৎস নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) কর্মকর্তারা বলছেন, পার্শ্ববর্তী একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তার ছিঁড়ে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। যদিও ওই বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

সিলেটের কুমারগাঁওয়ের ওই বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শর্ট সার্কিট থেকে আগুন ছড়ালেও আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না ওই কেন্দ্রে। এছাড়া সচল ছিল না উপকেন্দ্রের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরাও। সিসিটিভি ক্যামেরা সচল না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের উৎস খুঁজতে বেগ পেতে হচ্ছে তদন্ত কমিটিকেও।

১৭ নভেম্বর সকালে সিলেটের কুমারগাঁও এলাকার পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) নিয়ন্ত্রণাধীন জাতীয় গ্রিড লাইনের একটি উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বেলা ১১টার দিকে আগুন লাগার কিছুক্ষণের মধ্যে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফায়ার সার্ভিস প্রায় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত উপকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ক্ষমতা ২২০ মেগাওয়াট। ওইদিনের আগুনে পিজিসিবি এবং পিডিবির দুটি ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। একই সঙ্গে সুইচ রুম, সার্কিট ব্রেকারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পুড়ে যায়। এতে ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে দীর্ঘসময় বিদ্যুিবহীন হয়ে পড়েন সিলেট সুনামগঞ্জের প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহক। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সব যন্ত্রপাতি পুরোপুরি সচল না হওয়ায় এখনো দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের। গত সোমবারও সিলেটের অনেক এলাকায় দিনভর বিদ্যুৎ ছিল না।

এদিকে আগুনের ঘটনা তদন্তে ওইদিনই বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

অতিরিক্ত সচিব রহমত উল্লাহকে আহ্বায়ক করে বিদ্যুৎ বিভাগ গঠিত পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রধান প্রকৌশলী (ট্রান্সমিশন ) সাইফুল হককে আহ্বায়ক করে পিজিসিবি উৎপাদন শাখার প্রধান জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক বিউবি আরো দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। দুই কমিটিরই তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার কথা। তবে গত সোমবার পর্যন্ত কোনো কমিটিই প্রতিবেদন দিতে পারেনি। তিনটি তদন্ত কমিটির সদস্যরাই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

জানা যায়, কুমারগাঁও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের পাশেই রয়েছে সরকারি-বেসরকারি পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলো হচ্ছে পিডিবির ২২৫ ২০ মেগাওয়াটের পৃথক দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, দেশ এনার্জির ১০ মেগাওয়াট, এনার্জি প্রিমার ৫০ মেগাওয়াট ইউনাইটেড পাওয়ারের ২৮ মেগাওয়াটের তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। অগ্নিকাণ্ডে সবটিতেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে।

বিউবোর তদন্তসংশ্লিস্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৭ নভেম্বর সকালে পার্শ্ববর্তী দেশ এনার্জির মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তার ছিঁড়ে পিজিসিবির উপকেন্দ্রের ট্রান্সমিটারের ওপর পড়ে। এতে শর্ট সার্কিট হয়ে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

বিউবোর তদন্ত কমিটির সদস্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী (বিক্রয় বিতরণ) খন্দকার মোকাম্মেল হোসেন বলেন, আমরা এখনো তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারিনি। তবে তদন্ত চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের ভাষ্যমতে, পার্শ্ববর্তী দেশ এনার্জির উৎপাদন কেন্দ্রের তার ছিঁড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেরামতকাজ কিছু যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতির কারণে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কারণে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

এদিকে বিউবো কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে দেশ এনার্জির প্রকল্প পরিচালক জাকিউল হক বলেন, আমাদের উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আগুন ছড়ায়নি। আমরা যে লাইনের মাধ্যমে বিউবোকে বিদ্যুৎ দিই, সেই লাইনের সার্কিট আগুনে পুড়ে যায়। সেই লাইন পিজিসিবির উপকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থিত।

আগুনের সূত্রপাত নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ নেই বিদ্যুৎ বিভাগের তদন্ত কমিটির সদস্যদের। তারা জানিয়েছেন, শর্ট সার্কিট থেকে যেকোনো সময়ই আগুন লাগতে পারে। এজন্য যেকোনো বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য সার্কিট ব্রেকারসহ নানা ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। সিলেটের উপকেন্দ্রেও ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। তবে সেগুলো কাজ করেনি।

পিজিসিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা নতুন ক্যামেরা লাগানোর জন্য একটি চাহিদাপত্র পাঠিয়েছিলাম।

নিম্নমানের যন্ত্রপাতি তদারকির অভাবের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক অভিযোগই আসছে। এগুলো সম্পর্কে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তদন্তে সত্য জানা যাবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন