বৃহস্পতিবার | জানুয়ারি ২১, ২০২১ | ৮ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

প্রাণী খাতে সংকট তৈরি করছে রিজার্ভড অ্যান্টিবায়োটিক

প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন

প্রাণী মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ হচ্ছে না, এমন ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন মানুষ মারা যাবে অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ করে না, এমন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের মাধ্যমে। স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর সাত লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে এমন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত হয়ে, যেগুলোর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেই। মানুষ পশুর মারাত্মক সংক্রমণ রোধে অ্যান্টিবায়োটিক অত্যন্ত জরুরি। সমস্যাটা হচ্ছে যথেচ্ছ ব্যবহারে। গবেষণা বলছে, গবাদিপশুকে শুধু ভবিষ্যৎ সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর মানুষের জন্য অনুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিকের ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে পশুর জন্য। বাংলাদেশে প্রাণীরাও এর বাইরে নয়। সোমবার আয়োজিত এক অনলাইন বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা প্রাণী খাতে অযাচিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এরই মধ্যে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে গেছে। রিজার্ভড অ্যান্টিবায়োটিকগুলো সহজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে নতুন কোনো কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন করা না গেলে সংকট ঘনীভূত হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েক বছর আগে থেকেই জানাচ্ছে বিশ্বে যে পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়, তার অর্ধেকই ব্যবহূত হয় পশু উৎপাদনে। আর মানুষের জন্য তা বয়ে আনছে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি। পশু খাবার উৎপাদনকারীরা বলছেন, এতে গবাদিপশু সুস্থ থাকবে। আর খামারিরা বিষয়টি না বুঝেই সেই খাবার কিনে খাওয়াচ্ছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ একে নীরব মহামারী হিসেবে মনে করছেন। কারণ এর প্রধান ঝুঁকি হলো, কোনো সংক্রমণ ছাড়া এত বেশি অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে পশুর শরীরে যে জীবাণু, তা ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তৈরি করে ফেলে। ফলে মানুষ যখন এভাবে উৎপাদিত গরু, মুরগি বা মাছ খায়, তখন খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে এসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু প্রবেশ করে। এরপর মানুষ যখন তার নিজের অসুখ হলে সেসব অ্যান্টিবায়োটিক খায়, তখন সেই ওষুধে আর কাজ হচ্ছে না।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ হলো আমাদের অতি প্রয়োজনীয় এক বন্ধু। সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক কার্যকর পদ্ধতি। সমস্যা হলো, অত্যন্ত ছোট ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস ধীরে ধীরে কার্যকারিতা প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করে। একপর্যায়ে আন্টি-অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টি-ভাইরাল হয়ে যায়। এই প্রতিরোধী ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থেকে শক্তিশালী দ্রুত বাড়তে থাকে। এটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে তারা সেগুলো প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, মানুষ যখন সেগুলো পরিভোগ করছে তখন তার অজান্তেই সেও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করছে। এভাবে আস্তে আস্তে ব্যক্তির শরীর বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছেকোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া প্রাণিসম্পদের কোনো ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। কারণ এগুলো মাত্রা ঠিক না রাখলে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে ক্ষতি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ কম হলে যেমন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, তেমনি বেশি হলে তা গবাদিপশু, মুরগি বা মাছের শরীরে থেকে যায়। আবার এসব মাছ-মাংস বা দুধ ওই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কত দিন পর খাওয়ার উপযোগী হবে, সেটা মেনে চলতে হবে। তা না হলে বড় বিপদ নেমে আসবে। কারণ এখন অ্যান্টিবায়োটিক খুবই ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা যেমন মানুষের ক্ষেত্রে, তেমনি প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশে খামার ব্যক্তি পর্যায়ে পশু পালন অনেক বেড়েছে। গবাদিপশুর রোগবালাই নিত্যকার ঘটনা। কিন্তু পর্যাপ্ত পশু চিকিৎসক নেই দেশে। ফলে এজন্য মানুষ স্থানীয় ফার্মাসির দ্বারস্থ হচ্ছে। অসাধু ওষুধ বিক্রেতারা ত্বরিত চিকিৎসার জন্য মানুষের ব্যবহারের অ্যান্টিবায়োটিক গবাদিপশুর ওষুধ হিসেবে বিক্রি করছে। ব্যাপারে নজরদারির জন্য সরকারের উপযুক্ত কোনো কর্তৃপক্ষ পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশের একটা পরিমিত মাত্রা রয়েছে। ল্যাবরেটরি টেস্টে সেটি পরীক্ষা করে দেখতে হয়। গবাদিপশুতে এর বেপরোয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে না। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রবেশের পর সে দেহ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যায়। ফলে জরুরি অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে আর কাজ করে না। কিন্তু গবাদিপশুর চিকিৎসায় কৃষকরা ব্যাপক হারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন, খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব এখনই আমরা আন্দাজ করতে না পারলেও দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি তৈরি করবে নিশ্চয়ই।

পশুর রোগ সারাতে দরকার পশু চিকিৎসকের পরামর্শ। তারা বলতে পারেন, কোন ওষুধ কোন সময় পশুর জন্য কী পরিমাণ প্রযোজ্য। দেশে পশু পালন ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলেও এদের রোগবালাই নিয়ে খুব একটা ভেবে দেখা হয়নি। পশুরোগ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে। সেজন্য প্রয়োজন সঠিক ওষুধটি বাছাই করা এবং তার সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ। কাজটি পশু ডাক্তারই ঠিক করে দিতে পারেন। বাংলাদেশে যথেষ্ট পশু চিকিৎসক নেই। গবাদিপশু অসুস্থ হলে কৃষকরা কাছের ফার্মেসিতে যান। অন্যদিকে ফার্মেসিগুলোর ওপর কোনো নজরদারি নেই। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা হয় দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে। ব্যাপারে বিধিনিষেধ থাকা উচিত। পশু চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। সারা দেশে পর্যাপ্ত পশু চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে, কৃষকদের জন্য উপযুক্ত ওষুধও পৌঁছাতে হবে। গবাদিপশু উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে এটা করতে হবে এখনই। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার রোধ করতে হবে। সাধারণ মানুষের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিলেও মূল কাজটি করতে হবে রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্রের উদ্যোগী হতে হবে। খাবারের মান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যেন বাজারে বিক্রি করা খাদ্যদ্রব্যে অ্যান্টিবায়োটিক না থাকে। সরকার চাইলে তা বন্ধ করতে পারে। যেসব স্থান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক সংগ্রহ করা হয়, সেসব স্থান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মত্স্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চাইলে এটা তদারক করতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন