বৃহস্পতিবার | জানুয়ারি ২১, ২০২১ | ৮ মাঘ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : স্বপ্নের অভিযাত্রা

সনজিৎ নারায়ণ চৌধুরী

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান ও নদীমাতৃক দেশ। দেশের মোট শ্রমশক্তির শতকরা ৪০.৬ ভাগ কৃষিখাতে নিয়োজিত। কৃষি মানে শুধুই জমি চাষ নয়। কৃষি হচ্ছে নানা ধরনের ফসল, গবাদিপশু, পোল্ট্রি, মৎস্য ও বনজ সম্পদ উৎপাদনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। কৃষিজ্ঞান পরিধি কৃষিকাজ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণাকর্ম পর্যন্ত বিস্তৃত। কৃষিকাজে নদীর পানির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মাটি প্রাকৃতিকভাবে এতই গুণাগুণ সমৃদ্ধ যে কোথাও কোনো ফসলের বীজ বপন করলে তা থেকে আপনাআপনিই চারা উৎপন্ন হওয়া ও পরিণত অবস্থায় ফল দেওয়া বিস্ময়কর একটা বিষয়। উর্বর জমি ও পানির সহজপ্রাপ্যতায় দেশের কোনো অঞ্চলে একবার, কোনো অঞ্চলে দুইবার আবার কোনো কোনো অঞ্চলে তিনবারও ফসল ফলে। তাই এই মাটিকে অবহেলা অনাদরে না রেখে এর সর্বোত্তম ব্যবহার হলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।  প্রাকৃতিক সম্পদ, কর্মসংস্থান ও আয়-ব্যয়ের প্রায় ৭০ ভাগ কৃষিকাজকে ঘিরে আবর্তিত হয়। এজন্য প্রয়োজন কৃষিতে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সামষ্টিক জ্ঞানসমৃদ্ধ জনবল। এক্ষেত্রে কৃষি সংশ্লিষ্ট উচ্চশিক্ষা গ্রহণে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল খ্যাত বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ জেলায় দেশের সপ্তম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত অনুমোদন কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ নিউফিল্ডে বিশাল জনসভায় জেলাবাসীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট ৪টি বড় দাবি উপস্থাপন করেছিলেন জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি। দাবিগুলো ছিল -হবিগঞ্জে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, শায়েস্তাগঞ্জকে উপজেলা বাস্তবায়ন ও বাল্লা স্থলবন্দর স্থাপন। অন্যান্য দাবিগুলো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হওয়ার আগেই বাস্তবায়িত হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হয় ‘হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিল-২০২০’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার কৃষিখাত সমৃদ্ধকরণে তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা হবিগঞ্জে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই প্রসংশনীয়। হবিগঞ্জের উন্নয়নের রূপকার অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি’র সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠায় হবিগঞ্জে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আলোর মুখ দেখেছে। 

হবিগঞ্জ জেলায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় স্থান নিয়ে যাতে কোনো জটিলতা না হয় সে জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাস হওয়ার সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘এই আইনের বিধান অনুযায়ী হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হইবে’। বিল পাস হওয়ার পর কেউ কেউ বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে স্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাব নাকি ছিলোÑএটি হবে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার নাগুড়ায় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাশে। যেখানে আইনের বিধানে পরিস্কারভাবে ‘সদর উপজেলায়’ লেখা সেখানে আইন পাস হওয়ার পর ‘স্থান নিয়ে জটিলতা’র কোনো সুযোগই থাকে না। স্মর্তব্য, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। এই ইনস্টিটিউটে নানা জাতের ধানের ফলন, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষি যে শুধুই ধানচাষ নয় তা আগেই বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও প্রচলিত অন্যান্য বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে কাজ করবে। এজন্য পাস হওয়া বিলে উল্লেখ রয়েছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক পর্যায়েই ৪টি অনুষদ থাকবে। যথা- ১. কৃষি অনষদ ২.মৎস্য অনুষদ ৩. প্রাণিচিকিৎসা ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞান অনুষদ এবং ৪. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদ। পরবর্তীতে আরও অনুষদ যুক্ত হবে আর বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চায় এটাই স্বাভাবিক। অনুষদের অধীনে থাকবে কয়েকটি স্বতন্ত্র বিভাগ আর প্রতিটি বিভাগের জন্য থাকবে প্রয়োজনীয় গবেষণাগার। সর্বোপরি একটা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যা যা দরকার তার সবকিছুই এ বিশ্ববিদ্যালয়েও থাকবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বুঝায় বিশ্বের বিদ্যালয়। এটা দেশিয় কোনো বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান নয়, আন্তর্জাতিক মানের একটা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে পাঠদানের সাথে মূল কাজ গবেষণা চলবে এবং প্রতিনিয়ত নতুন উদ্ভাবন ঘটবে। দেশের বিভিন্ন জায়গা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ালেখা করতে আসবে। এজন্য হবিগঞ্জের সদর উপজেলার ভালো ও সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পন্ন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত। হাওর জনপদের উচ্চশিক্ষার জন্য এটি সুবর্ণ সুযোগ। আর্থিক সমস্যার কারণে অনেকেই তাঁদের মেধাবী সন্তানকে দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না পাঠানোয় উচ্চশিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহীদের ক্ষেত্রে এর অবসান ঘটবে। এটাও মনে রাখতে হবে, হবিগঞ্জে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত বলে চাইলেই যে কেউ ভর্তি হতে পারবে নাÑকেবল যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীরাই এখানে ভর্তি হতে পারবে। স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-কানুন মেনেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

জাতীয় সংসদে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়েছে। এখন হবিগঞ্জবাসীর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কীভাবে সুন্দরভাবে গড়ে তুলা যায় সেজন্য সরকারের নীতিনির্ধারকদের সহযোগিতার লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে। নানামুখী সহযোগিতার মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান যেন গড়ে ওঠে সেদিকে নজর রাখাও জরুরি। দেশের সপ্তম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বলে হবিগঞ্জবাসী ‘লাকি সেভেন’ও ভাবতে পারেন। এই ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করতে হবে। একথাও মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হবিগঞ্জ হলেও এটা বাংলাদেশের জনগণের। নির্দিষ্ট যোগ্যতা সাপেক্ষে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সকল শিক্ষার্থীর জন্য এটি উন্মুক্ত।

নতুন নতুন উদ্ভাবনে অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি গঠন সম্ভব হলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন তা অচিরেই বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় নদ-নদী রক্ষায়, নদীর জল বিশুদ্ধ রাখতে সরকারকে কঠোর হতে হবে এবং একই সাথে জনগণকেও নদী বিষয়ে অধিক সচেতন হতে হবে। নদী রক্ষা ও বাঁচিয়ে রাখতে আমি তাই বলি, নিরবধি বহে যাক নদীভরা জল। নদী ও চাষ কৃষির বৃহৎ অংশ। নদী ভালো রাখলে নদীর জলেই চাষের কাজ অধিকাংশই সম্পন্ন করা সম্ভব। আর, কৃষিকে জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ডও বলা হয়ে থাকে। তাই, শিক্ষা ও গবেষণায় সফল হয়ে কৃষিক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখতে এবং অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী হয়ে ওঠবে এ প্রত্যাশা জনগণের। যে স্বপ্ন নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু তা যেন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী হয়। আর, এভাবেই এ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার অনন্য বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে উঠবে।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন