রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

শেষ পাতা

লাভ বেশি সাধারণ বীমা ও পাট খাতের শেয়ারে

মেহেদী হাসান রাহাত

দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে উৎপাদন ও সেবা খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩২৫টি। ব্যবসার ধরন অনুসারে স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিগুলোকে ১৮টি খাতে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে। খাতভিত্তিক এসব কোম্পানির গত পাঁচ বছরের রিটার্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন এসেছে সাধারণ বীমা ও পাট খাতের শেয়ারে। অর্থাৎ স্বল্পমূলধনি এসব কোম্পানির শেয়ারেই বিনিয়োগকারীদের লাভ হয়েছে বেশি। অন্যদিকে মুদ্রণ ও প্রকাশনা, সিমেন্ট, চামড়া, সেবা ও আবাসন, সিরামিকস এবং বস্ত্র খাতের মতো ভারী শিল্প খাতের কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিপরীতে লোকসান গুনতে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে ১৮টি খাতে শ্রেণীকরণ করা হলেও ব্যবসার ধরনে ভিন্নতা থাকায় বীমা কোম্পানিগুলোকে সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা খাত হিসেবে শ্রেণীকরণ করেছে বণিক বার্তা। ফলে সব মিলিয়ে খাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯টিতে। খাতভিত্তিক এ কোম্পানিগুলোর গত পাঁচ বছরের রিটার্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ২৪৮ শতাংশ রিটার্ন এসেছে সাধারণ বীমা খাতের শেয়ারে। মূলত তৃতীয় পক্ষের বীমা বাধ্যতামূলক করাসংক্রান্ত গুজবের ভিত্তিতে এ বছর বীমা খাতের শেয়ারে দামের উল্লম্ফন ঘটে। যার প্রভাবে এ খাতের কোম্পানিগুলোর সার্বিক রিটার্নের হারও বেড়ে গেছে।

পাঁচ বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ রিটার্ন এসেছে পাট খাতের শেয়ার থেকে। এ খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা তিনটি। এ কোম্পানিগুলোর সবগুলোই স্বল্পমূলধনি। কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্স আকর্ষণীয় না হলেও এসব শেয়ারের রিটার্ন অনেক বেশি। যদিও এর পেছনে কারসাজি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার কম হওয়ায় এতে কারসাজির সুযোগ পেয়েছে দুষ্টচক্র। 

টেলিযোগাযোগ খাত থেকে গত পাঁচ বছরে ৭২ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। এ খাতে গ্রামীণফোন ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল তালিকাভুক্ত রয়েছে। বকেয়া কর নিয়ে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে গ্রামীণফোনের শেয়ারে দরপতন হয়েছে। এ কারণে এ খাতের রিটার্নও কমে গেছে।

ব্যাংক খাতের শেয়ারে গত পাঁচ বছরে বিনিয়োগকারীরা ৬২ দশমিক ৪০ শতাংশ রিটার্ন পেয়েছেন। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে এ সময়ে ব্যাংক খাত বারবারই আলোচিত হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে। যদিও বেশকিছু ভালো ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। বাজার মূলধনের দিক দিয়ে শীর্ষ ব্যাংক ব্র্যাকের শেয়ারের দরপতনও এ খাতের সার্বিক রিটার্ন কম হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

করোনাকালে অন্যান্য খাতের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে ছিল ওষুধ খাত। যদিও গত পাঁচ বছরে ওষুধ ও রসায়ন খাত থেকে ৩৭ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। মূলত শীর্ষ ওষুধ কোম্পানিগুলো ভালো করলেও এ খাতের অন্য কোম্পানিগুলোর নেতিবাচক পারফরম্যান্সের কারণে সার্বিকভাবে খাতের রিটার্ন আশানুরূপ হয়নি। বাজার মূলধনে ওষুধ খাতের শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারের দরপতন খাতের রিটার্নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারের দর বৃদ্ধি রিটার্ন বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা পাঁচটি। গত পাঁচ বছরে এ খাত থেকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। সাধারণ বীমা খাত রিটার্নে শীর্ষে থাকলেও গত পাঁচ বছরে জীবন বীমা খাতের কোম্পানিগুলো থেকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ রিটার্ন এসেছে।

বিবিধ খাতের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ১৩টি। গত পাঁচ বছরে এ খাত থেকে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। এ খাতের কোম্পানি বার্জার পেইন্টসের শেয়ার দর কমার প্রভাবে খাতভিত্তিক রিটার্নের হারও কমেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে গত পাঁচ বছরে বিনিয়োগকারীরা ২৮ দশমিক ৭০ শতাংশ রিটার্ন পেয়েছেন। এ খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ইউপিজিডিসিএল) ও সামিট পাওয়ারের পারফরম্যান্স ভালো থাকলেও অন্য কোম্পানিগুলোর মিশ্র পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়েছে শেয়ার দরে। এতে সার্বিকভাবে এ খাতে বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন আসেনি।

তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবসা নিয়ে বরাবরই অসম প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তার ওপর পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন এবং আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে না পারার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এ খাতের শেয়ারে। পুঁজিবাজারের নিম্নমুখিতাও এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ পি কে হালদার কর্তৃক কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুট করার কারণে খাতটির অবস্থা আরো সঙ্গিন হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত থেকেও প্রত্যাশিত রিটার্ন আসেনি। গত পাঁচ বছরে এ খাতের শেয়ারে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ রিটার্ন পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

গত পাঁচ বছরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতের শেয়ারে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। এ খাতের ৪০টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বিএসআরএম লিমিটেড, বিএসআরএম স্টিল, জিপিএইচ ইস্পাত, ইফাদ অটোজ, আরএসআরএম স্টিল, রানার অটোমোবাইলস, সিঙ্গার বাংলাদেশ এবং ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের মতো কোম্পানি রয়েছে। শীর্ষ এ কোম্পানিগুলোর কেউ কেউ ভালো পারফরম্যান্স করেছে, আবার এ সময়ে কারো কারো পারফরম্যান্স ছিল নিম্নমুখী। যার প্রভাব পড়েছে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে। আবার খাতভুক্ত অন্যান্য কোম্পানির নিম্নমুখী পারফরম্যান্সও রিটার্ন কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের শেয়ারে পাঁচ বছরে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ রিটার্ন এসেছে। এ খাতের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (বিএটিবিসি), গোল্ডেন হার্ভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ এবং অলিম্পিক লিমিটেডের মতো কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। বিএটিবিসি ও অলিম্পিকের শেয়ার দর কমার পাশাপাশি এ খাতের অন্য কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হওয়ায় সার্বিকভাবে রিটার্নও কম এসেছে।

খাতভিত্তিক রিটার্নের বিষয়ে ডিএসইর সাবেক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক এবং বিএলআই সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই এটা ধরে নেয়া হয় যে দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য খাতের তুলনায় পুঁজিবাজার থেকে বেশি রিটার্ন আসবে। আর এ কারণেই কিন্তু মানুষ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে আসে। কিন্তু আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের খাতভিত্তিক কোম্পানিগুলোর রিটার্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বহুজাতিকসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশীয় কোম্পানি বাদে অধিকাংশ কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদেও কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন আসছে না। এর কারণ আইপিওতে আসার সময় কোম্পানিগুলো তাদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক তথ্য ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখায়। পুঁজিবাজারে আসার কয়েক বছরের মধ্যে এ কোম্পানিগুলোর আসল চিত্র বেরিয়ে আসে। সার্বিক সুশাসনের অভাবের পাশাপাশি আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর মূলধন গঠন প্রক্রিয়া এবং ব্যালান্স শিটের তথ্যের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। দেশে অনেক শীর্ষস্থানীয় ও স্বনামধন্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিরীক্ষক থাকলেও দেখা যাচ্ছে যে আইপিওতে আসা অধিকাংশ কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করছেন হাতেগোনা কয়েকজন নিরীক্ষক। মূলত এসব কারণেই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো থেকে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত রিটার্ন পাচ্ছেন না।

খাতভিত্তিক রিটার্ন পর্যালোচনায় আরো দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বস্ত্র খাতে ৪ দশমিক ৩, সিরামিকস খাতে ১৮, সেবা ও আবাসন খাতে ৩৩ দশমিক ১০, চামড়া খাতে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, সিমেন্ট খাতে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কাগজ ও প্রকাশনা খাতে ৫৩ দশমিক ২০ শতাংশ ঋণাত্মক রিটার্ন এসেছে। অর্থাৎ এ খাতের কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের লোকসান গুনতে হয়েছে। অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে বস্ত্র ও সিমেন্ট খাতের মুনাফা মার্জিন কমে গেছে। এর প্রভাবে কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরও কমেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই রিটার্নও কমেছে। চামড়া রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে এ খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে। 

দীর্ঘমেয়াদে ভারী শিল্পকেন্দ্রিক এ খাতগুলোর নেতিবাচক রিটার্নের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, গত পাঁচ বছরে প্রত্যেকটি খাতের কোম্পানিগুলোর উত্থান-পতনের বেশকিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। যেমন বস্ত্র ও সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে পণ্যের দাম কমে গেছে এবং এতে কোম্পানিগুলোর মুনাফা মার্জিনও কমেছে। আবার এসব খাতে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভালো পরিমাণ শেয়ার ছিল। গত দুই বছর ধরেই পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এ কারণেও কিন্তু এসব খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর কমেছে। সার্বিকভাবে যা কোম্পানিগুলোর রিটার্নকে ঋণাত্মক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন