শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

শেষ পাতা

প্রাথমিক শিক্ষা

অটোপ্রমোশনের পক্ষে মত নেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের

সাইফ সুজন

করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই শেষ হতে চলেছে একটি শিক্ষাবর্ষ। মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ঘোষণা হলেও এখন পর্যন্ত বার্ষিক মূল্যায়নের কোনো নির্দেশনা পাননি প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে এ বিষয়ে শিক্ষক ও মাঠ পর্যায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে মতামত সংগ্রহ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এতে দেখা গেছে, অটোপ্রমোশনের মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করার পক্ষে মত নেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের। 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে কীভাবে চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষ করে পরবর্তী বর্ষে পদার্পণ করা হবে—এ বিষয়ে মতামত জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) মাধ্যমে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফায় ভার্চুয়াল ও সীমিত পরিসরে সশরীরে সভা করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। 

এসব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পদ্ধতিগত মতপার্থক্য থাকলেও প্রায় সব শিক্ষক-কর্মকর্তাই মূল্যায়নের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে কিনা, মূল্যায়ন হলে সেটি কী উপায়ে করা হবে—এসব বিষয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত সংগ্রহ করেছি। তাদের মতামতের আলোকে একটি নির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে। শিগগিরই মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তা জানিয়ে দেয়া হবে। আসলে আমরা একটি বিশেষ পরিস্থিতি পার করছি। এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে যত কম ঝুঁকির মাধ্যমে বড় উপযোগিতা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই দেখা হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলবে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমরা নেব না। 

‘করোনা মহামারীতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ: বাংলা বিষয়ের শিখনফল পর্যালোচনা এবং বিষয়বস্তু নির্ধারণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নেপ। এ গবেষণায় সহায়তা করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ও রুম টু রিড। গবেষণার প্রকৃতি ও পদ্ধতি বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি একটি পদ্ধতিগত ও গুণগত অনুসন্ধান। এতে প্রধানত বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরের বাংলা বিষয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাঠ পর্যায়ের ও কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজন বিশেষ করে পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর, ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর, শ্রেণীশিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামত সংগ্রহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে শিখন কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে অধিকাংশ শিক্ষক অবশিষ্ট কার্যদিবস বিবেচনা করে পাঠ্যক্রম কমিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে অটোপ্রমোশনের ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করার বিষয়ে শিক্ষকরা নেতিবাচক মতামত জ্ঞাপন করেছেন। 

এ প্রসঙ্গে খুলনা সদর থানা রিসোর্স সেন্টারের ইনস্ট্রাক্টর জগজ্জীবন বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, আসলে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের চলমান মূল্যায়ন পদ্ধতি বলতে টার্ম ও ফাইনাল পরীক্ষা। এ আনুষ্ঠানিক পদ্ধতির পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মূল্যায়ন নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে। তবে মূল্যায়ন ছাড়া কাউকে পরের শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করাও তাদের জন্য ইতিবাচক নয়। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা কিছু না পড়ে বা না বুঝে একটি নতুন শ্রেণীতে না উঠুক। এর প্রভাব খুব বেশি ইতিবাচক হবে না। এক্ষেত্রে স্বল্প পরিসরে কিংবা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে হলেও শিক্ষার্থীদের একটি মূল্যায়ন করতে হবে। এ মূল্যায়নটা শ্রেণীশিক্ষকের পাঠদানের ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে। 

নেপের ওই প্রতিবেদনে শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে করোনা-প্রকোপ পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি ও ঘাটতির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, প্রথম শ্রেণীর ২৫ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি (লার্নিং লস) হয়েছে। একই মত দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ; তৃতীয় শ্রেণীর ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণীর ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ শিক্ষকের। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে ৮৩ শতাংশ মনে করেন কিছু শিক্ষার্থীর শিখন অর্জন হয়েছে।

শিখন ঘাটতির কারণ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিক্ষক মনে করেন বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি হয়েছে, তারা এর কারণ বিষয়েও মতামত দেন। তাদের মতে, শিক্ষক ও অভিভাবকের টেলিভিশন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, গৃহশিক্ষকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ফলোআপ বা সহায়তা না পাওয়ার কারণে করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি হয়েছে। অন্যদিকে যেসব শিক্ষকের মতে শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি হয়েছে তারাও নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তাদের মতে, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকের অনলাইনে যোগাযোগের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন