মঙ্গলবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

শেষ পাতা

বণিক বার্তা ও এএলআরডির অনলাইন বৈঠক

সমবায়ের বিকাশে আইন সংশোধন জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত ১০০ বছরের কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল স্রোতধারার অনুষঙ্গ ছিল সমবায়। যদিও সময়ের পরিক্রমায় সমবায়ের অবস্থান অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। তবে অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমবায়কে নতুন করে ধারণ করে এর বিকাশের সুযোগ এসেছে। এক্ষেত্রে প্রচলিত আমলানির্ভর ও দুর্নীতিপরায়ণ আইনের সংশোধন জরুরি। আর আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। 

গতকাল ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন: দারিদ্র্য বিমোচন ও কৃষির টেকসই উন্নয়নে সমবায়’ শীর্ষক অনলাইন বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ‘বণিক বার্তা’ ও বেসরকারি সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি)’ যৌথভাবে এ আয়োজন করে। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রাশেদ খান মেনন, এমপি। সূচনা বক্তব্য দেন বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রিজওয়ানুল ইসলাম ও এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি। নিজেরা করি সমন্বয়ক ও এএলআরডি চেয়ারপারসন খুশী কবিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে আলোচক হিসেবে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. সীমা জামান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, সিডিএ পরিচালক শাহ-ই-মবিন জিন্নাহ, ইনসিডিন-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক একেএম মাসুদ আলী। 

অনলাইনের বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ খান মেনন বলেন, সমবায় আকস্মিক কোনো বিষয় নয়। এটি ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলেও ছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর সমবায়ের বিষয়টি আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কারণে সমবায় একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও বিষয়। বঙ্গবন্ধুর সংবিধানবিষয়ক আলোচনায় রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রের বিষয়টি উঠে আসে। আর সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সমবায়ের লক্ষ্যটি সেখানে ছিল। শুধু সমাজতন্ত্র নয়; সমবায়ের আলোচনায় গণতন্ত্রের বিষয়টিও ছিল। সেজন্যই সদস্যদের মাধ্যমে সমবায় পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এখন সমবায়ের বিকাশে আইনের যে সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। কেননা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে দেখা যাবে সংশোধনের পরও আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা থেকে যাবে। 

সভাপতির বক্তব্যে নিজেরা করির সমন্বয়ক ও এলএআরডির সভাপতি খুশী কবির বলেন, এক সময় সমবায়ের একটি বিশাল জায়গা ছিল। সমবায়ের অনেকগুলো দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আইনের কাঠিন্য। একজন সাধারণ কৃষক বা খেতমজুরদের জন্য এসব আইন অনুসরণ করা কঠিন। বাহাত্তরে বঙ্গবন্ধু যখন ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি দেয়া শুরু করলেন, সেটি ছিল সমবায় ও গুচ্ছগ্রামভিত্তিক। সমবায় নিয়ে ওনার অনেকগুলো লেখাও রয়েছে। এগুলো পড়লে সমবায় বিষয়ে অনেক ইতিবাচক ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা জানতে পারব। 

সূচনা বক্তব্যে বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, আমাদের গত ১০০ বছরের কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল স্রোতধারার অনুষঙ্গ ছিল সমবায়। যদিও ক্রমবিবর্তনে সমবায় কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেছে। তবে আকারের দিক থেকে সমবায় এখনো অনেক বড়। প্রায় দুই লাখের মতো নিবন্ধিত সমবায় সংস্থার সঙ্গে এক কোটির বেশি মানুষ জড়িত রয়েছে। দেশের অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমবায়কে নতুন করে ধারণ করে আলোচনায় এনে সেটিকে বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। করোনা সে সুযোগটি করে দিয়েছে। করোনার কারণে বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাদের আয় ও জীবিকা হারিয়েছে। এছাড়া কৃষির ক্ষেত্রে খামারের আকার ক্রমান্বয়ে ছোট হওয়ার কারণে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যাচ্ছে না। তাই বাজারজাতসহ কৃষি খাতে সমবায়ের বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া যেসব গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে, সেগুলোর বিকাশের ক্ষেত্রেও সমবায় ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাবন্ধিক আলোচনায় ড. মো. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, দেশের সংবিধানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুসহ অন্য সংবিধানপ্রণেতাদের সমবায় বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। তারা সংবিধানের ১৩ নং অনুচ্ছেদে সম্পদের ধরনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি সমবায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে সমবায়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সংবিধানের দেয়া গুরুত্বের প্রকাশ সমবায় আইনে ঘটেনি। এজন্য এ আইন সংশোধন প্রয়োজন। বর্তমানে উত্তরাধিকার আইন প্রয়োগে জমির প্লটের আকার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হওয়ার কারণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যাচ্ছে না। অথচ প্রকৃত কৃষকদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংগ্রহ, গুদামজাত ও বাজারজাতের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কৃষক অনেক বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধু কৃষক নয়; মত্স্যজীবীসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমবায়ের মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ করে তাদের সামষ্টিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। এজন্য আইনি কাঠামোর সহজীকরণের মাধ্যমে সমবায়কে উৎসাহিত করতে হবে। বর্তমান সমবায় আইন সংশোধনের মাধ্যমে সমবায়ীদের আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে প্রকৃত সম্ভাবনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। 

রওশন জাহান মনি বলেন, আইন ঠিক করলেই সমবায় উঠে দাঁড়াবে বিষয়টি তেমন নয়। তবে সমবায়বান্ধব আইন থাকাটা এটি ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সমবায়ের আলোচনা করতে গেলে কৃষির বিষয়টি সামনে আসে। জিডিপিতে কৃষির অবস্থান এখন তৃতীয় হলেও জনশক্তির দিক থেকে এখনো অর্ধেক শ্রমশক্তি কৃষি খাতের। এখন বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যাবে জমি খণ্ডিত থেকে আরো খণ্ডিত হচ্ছে। পাশাপাশি ভূমিহীনতা ও বাণিজ্যিক আগ্রাসন অনেক বড় সমস্যা। এসব সমস্যার কারণে অনেকে কৃষি পেশা ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এএলআরডির সহযোগিতায় ১০টি উপজেলায় ১০৫টি ভূমিহীন ও প্রান্তিক নারী-পুরুষের দল গঠন করা হয়েছে। তারা যৌথ উদ্যোগে কৃষি চর্চা করছেন। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে এমএম আকাশ বলেন, সময়োচিত বিষয়টি সামনে আনার জন্য আয়োজকদের বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। বঙ্গবন্ধুর জনশতবার্ষিকীর সঙ্গে যুক্ত করে এ আলোচনার আয়োজন, এটিও বেশ যুক্তিযুক্ত। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমবায়ের সম্পর্ক কতটুকু, সেটি বিতর্কিত থেকে যায়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের মূলনীতির ক্ষেত্রে যে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন, তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে যে রাষ্ট্র চালাচ্ছেন, সেটির আদর্শ সমাজতন্ত্র বলে আমি মনে করি না। এ রাষ্ট্রের আদর্শ মুক্তবাজার। মুক্তবাজারের মধ্যেও সমবায়ের একটা স্থান রয়েছে, তবে সেক্ষেত্রে লক্ষ্য থাকতে হবে আমরা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করব জনকল্যাণের জন্য। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ছোটদের বেশি সুযোগ দেয়ার বিষয়ে শক্ত আইন করতে হবে। 

মার্কেটিং কো-অপরারেটিভ পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আমরা যদি স্কেলিং আপ করতে যাই, সেক্ষেত্রে মার্কেটিং স্কেলিং আপ সবচেয়ে কার্যকর। আপনি যদি ধনী-গরিব-মধ্যবিত্ত—সব কৃষককে গিয়ে বলেন, তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন, গুদামজাত ও বাজারজাত করো, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফাব্যবসা করতে পারবেন না। পাইকারি ব্যবসাটা নিজেদের হাতে নিলে ভোক্তারাও অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পণ্য পাবেন। এ লজিকটা সহজে বোঝানো যায়। 

ড. সীমা জামান বলেন, কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়নই একমাত্র সমাধান নয়। সেটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সদিচ্ছা খুবই জরুরি। পাশাপাশি যাদের জন্য আইন করা হয়েছে তাদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে, এলাকা পর্যায়ে যারা জলাশয় লিজ পাচ্ছে, তারা আসলে জেলে বা জেলের পরিবারের কেউ না। এলাকায় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাধররাই এসব জলাশয় লিজ নেয়। লিজ নেয়ার পর জেলে বা কৃষকদের সাবলিজ দিয়ে সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। এ ঘটনায় দেখা যায় প্রকৃত জেলে জলাশয় লিজ না পেয়ে অন্য কেউ পাচ্ছে। এর আইনি দিক দেখতে গেলে দেখা যাবে জেলেদের নিবন্ধিত সমবায় না থাকায় তারা লিজ পাচ্ছেন না। এজন্য আমার মতে, একটি সমবায়বান্ধব আইন থাকা খুব জরুরি। 

শামসুল হুদা বলেন, সমাজে একটা মিথ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে সমবায় সফল হয় না। সমবায় আন্দোলনকে যারা পিছিয়ে রাখতে চায়, তারাই এ কথা ছড়িয়েছে। তবে আমার মতে, সমবায় পৃথিবীব্যাপী একটি সফল আন্দোলন। সমবায় আইন ব্রিটিশ আমল থেকেই বিদ্যমান। সময়ের পরিক্রমায় এতে কিছু সংস্কার আনা হলেও এর মূল প্রকৃতিতে আমলানির্ভরতা ও দুর্নীতিপরায়ণতা আগে থেকেই রয়েছে। তাই বিদ্যমান আইনে বেশকিছু সংস্কার আনা প্রয়োজন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সহজ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সমবায় নিবন্ধনের সুযোগ দিতে হবে। সমবায়ীদের পরামর্শ প্রদান, নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী করে সমবায় আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য সবার অংশীজনকে নিয়ে কমিশন রাখতে হবে। 

শাহ-ই-মবিন জিন্নাহ বলেন, আবহমান কাল থেকে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামীণনির্ভর। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ গরিব। তার মানে গরিবরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে এ জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনতে পারলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। করোনার মতো সংকটেও গ্রামীণ অর্থনীতিই আমাদের উজ্জীবিত করে রেখেছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি মেধা ও শ্রম দেয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃজনশীলতাও রয়েছে। তাদের ব্যক্তি পর্যায়ের এসব উদ্যোগকে সমন্বিত করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সমবায়। 

একেএম মাসুদ আলী বলেন, সমবায় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যে আইন বা সংস্থার কথা বলছি, সেখানে আমার মত কিছুটা ভিন্ন। আমার মতে, সমবায় নিয়ন্ত্রণ না বলে সমবায় উন্নয়ন সংস্থা বা আইন করা দরকার। কেননা ভাষা ও প্রকাশ অনেক সময় বিকাশকে সীমিত করে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিধিকে পুনর্নির্মাণ করা দরকার। 

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন বণিক বার্তার উপব্যবস্থাপনা সম্পাদক এমএম মুসা। সমবায়ের বিকাশকে ত্বরান্বিত করার পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও তা দূরীকরণের বিষয়ে এ অনলাইন বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন