রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

জনতা ব্যাংকে ঋণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি

২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর জনতা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ। ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা এ ব্যাংকার একজন মুক্তিযোদ্ধাও। শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে মেয়াদ পূর্ণ করার দ্বারপ্রান্তে এসে নিজের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান

জনতা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে তিন বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে যাচ্ছেন। এ সময়ে নিজের কর্মতত্পরতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে তিন বছর হলেও জনতা ব্যাংকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ৩৭ বছরের। আমার কর্মজীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই এ ব্যাংকে কেটেছে। সে হিসেবে আমি জনতা ব্যাংক পরিবারের প্রবীণতম সদস্য। ব্যাংকার হিসেবে আমার কর্মতত্পরতার প্রতিটি মুহূর্তই এ ব্যাংকের কল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করেছি। এজন্য শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ বুঝে নিতে আমার দেরি হয়নি। কারণ এ ব্যাংকের প্রতিটি কার্যক্রম ও কর্মীর সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য হলো শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে প্রতিটি দিনই আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। পথ চলতে হয়েছে পূর্বসূরিদের দ্বারা সৃষ্ট বড় দুটি ঋণ কেলেঙ্কারির বোঝা বয়ে নিয়ে। স্কুলজীবনে বই-খাতা ছুড়ে ফেলে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। যৌবনের প্রারম্ভে যুদ্ধ করার সেই সুখস্মৃতি আমাকে কণ্টকাকীর্ণ এ পথ চলতে সাহস জুগিয়েছে। অন্যথায় এত বেশি নেতিবাচক সংবাদের ভিড়ে আমার হারিয়ে যাওয়ার কথা। প্রতিনিয়ত আমি নেতিবাচক সংবাদের মধ্যদিয়ে পার করেছি। আশার কথা হলো, মুক্তিযুদ্ধের মতোই আমি এ যুদ্ধে অনেকটাই জয়ী হয়েছি। জনতা ব্যাংকের ঋণ বিতরণ, আদায়, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলা ফিরেছে।

যুদ্ধে কীভাবে জয়ী হলেন, যখন দেখা যাচ্ছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে?

একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আমি জনতা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব নিয়েছিলাম। দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই এননটেক্স গ্রুপের ঋণ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। গ্রুপটিকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম হয়েছিল, তা উদ্ঘাটনের ফলে জনতা ব্যাংক ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। এরপর জনতা ব্যাংকের ক্রিসেন্ট গ্রুপের বড় অনিয়ম ধরা পড়ে। এ দুটি গ্রুপের কাছেই আটকা পড়েছে ব্যাংকের প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ। বিপুল অংকের এ ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়াটি জনতা ব্যাংকের জন্য বড় দুর্ঘটনা। ২০১৮ সালে আমাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গণমাধ্যমে জনতা ব্যাংক সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ হতে থাকে। ব্যাংকের কর্মীরাও মনোবল হারাতে থাকে। ওই অবস্থা থেকে জনতা ব্যাংককে টেনে তোলাটি ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমরা এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছি। চলতি বছরের অক্টোবর শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৩ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নগদ আদায় ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বহুমুখী কর্মতত্পরতা চলছে। কর্মীদের হারানো মনোবল ফিরে এসেছে। মহামারীর মধ্যেও ব্যাংকের প্রতিটি সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এটিকে আমরা বড় অর্জন হিসেবে দেখছি।

ব্যাংকের কোন কোন সূচকে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে?

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জনতা ব্যাংকের আমানত ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের অক্টোবরে আমানতের পরিমাণ ৭৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এত নেতিবাচক সংবাদ সত্ত্বেও গত তিন বছরে জনতা ব্যাংকের আমানতে ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলমান মহামারীর মধ্যে আমাদের ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয়। গত তিন বছরে জনতা ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬ শতাংশ। আশার কথা হলো, এ সময়ে বিতরণকৃত কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। কঠোর ঋণ শৃঙ্খলা মেনে আমরা ঋণ বিতরণ করেছি। বিশেষ পুনঃতফসিলের প্রজ্ঞাপনের আওতায় আমরা ৮৬৮টি আবেদন নিষ্পত্তি করে ১৪৩ কোটি টাকা নগদ আদায় করতে পেরেছি। এর মাধ্যমে ৫ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। গত তিন বছরে আমরা ১০ লাখ নতুন আমানত হিসাব খুলেছি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জনতা ব্যাংকের আমদানি বাণিজ্যে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলমান মহামারীতেও আমাদের ব্যাংকের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। জনতা ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য এর আগে প্রায়ই অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করতে হতো। বর্তমানে আমরা অন্য ব্যাংকগুলোকে অর্থ ধার দিচ্ছি। আমরা প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ট্রেজারি ইনভেস্টমেন্ট করেছি। চলমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে জনতা ব্যাংক শতভাগ ঘুরে দাঁড়াতে খুব বেশি সময় নেবে না।

এননটেক্স গ্রুপের ঋণ অনিয়মে আপনারও সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়। এ অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করি। ওই সময় পর্যন্ত গ্রুপটির আটটি প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ ছিল ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ঋণের পুরো অর্থই নিয়মিত রেখে আমি প্রধান কার্যালয়ে বদলি হই। কিন্তু বর্তমানে এননটেক্সের কাছে জনতা ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আমার পর আরো ছয়জন জিএম শাখাটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। শাখা ব্যবস্থাপক কোনো ঋণের অনুমোদন দিতে পারেন না। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ নির্বাহীসহ সব কমিটি ও প্রক্রিয়া শেষেই গ্রুপটিকে ঋণ দেয়া হয়েছে। করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক পদ থেকে আমি বদলি হওয়ার পর এননটেক্সকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার দায়ভার ওই সময় দায়িত্ব পালনকারী নীতিনির্ধারকদের। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এননটেক্সকে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছে, তাতে কোনো অনিয়ম খুঁজে পাওয়া যায়নি। শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার নেতৃত্বেই ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ অনিয়ম ধরা পড়েছে। এননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের জালিয়াতি ধরা পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা গ্রুপ দুটিকে ১ টাকাও নতুন ঋণ দিইনি। বরং তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে আইনানুগ সব পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে গত তিন বছরে জনতা ব্যাংকের নতুন ঋণ বিতরণ যৎসামান্য। এটি কেন?

শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনতা ব্যাংকে ঋণ শৃঙ্খলা ফেরাতেই আমাদের বেশি সময় দিতে হয়েছে। এজন্য গত তিন বছরে আমাদের নতুন ঋণ বিতরণে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। তিন বছরে আমরা নতুন প্রজেক্টে ২০০ কোটি টাকার ঋণও বিতরণ করিনি। যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই এসএমই খাতের ছোট ঋণ। এ সময়ে আমরা দেশের বড় কিছু শিল্প গ্রুপের ঋণসীমা বাড়িয়েছি। সব মিলিয়ে আমরা গত তিন বছরে ৭০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করিনি। ঋণের যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা এননটেক্স, ক্রিসেন্ট গ্রুপসহ কয়েকটি গ্রুপের কাছ থেকে অনাদায়ী সুদ যুক্ত হওয়ার কারণে হয়েছে। গত তিন বছরে বড় কোনো ঋণ বিতরণ করা হয়নি, ফলে এসব ঋণ বিতরণে কমিশন গ্রহণ বা অনিয়মের সুযোগও নেই।

দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো বেড়ে ওঠার পেছনে জনতা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ঋণ বিতরণ সীমিত হওয়ায় এ মুহূর্তে তা রুদ্ধ হয়ে গেল কি?

বাংলাদেশ ও জনতা ব্যাংকের জন্ম সমসাময়িক সময়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে শিল্পায়ন বলতে তেমন কিছুই ছিল না। দেশের শিল্পায়নের বর্তমান পরিস্থিতিতে আসার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। নামকরা বেশির ভাগ শিল্প গ্রুপই জনতা ব্যাংকের হাত ধরে আজকের অবস্থানে এসেছে। এখনো দেশের শীর্ষ করপোরেটরা আমাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তবে এ মুহূর্তে আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ায় বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। জন্মলগ্নেই জনতা ব্যাংকে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। এজন্য বঙ্গবন্ধু এ ব্যাংকের নাম জনতা রেখেছিলেন। আমরা প্রকৃত অর্থেই দেশের আমজনতার ব্যাংক হতে চাই।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার দিক থেকে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেশ পিছিয়ে। এক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের অবস্থা কেমন?

ব্যাংকের সব সেবায় প্রযুুক্তির সংমিশ্রণকে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। গত কয়েক বছরে প্রযুক্তি খাতে জনতা ব্যাংকের ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো, আমরা নিজেদের উদ্ভাবিত সফটওয়্যার দিয়ে কাজ করছি। এরই মধ্যে জনতা ব্যাংকের কর্মীরা ৬০টি সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছে। ব্যাংকের সবকটি শাখা কোর ব্যাংকিং সলিউশনের আওতায় আনা হয়েছে। পুরনো ধ্যান-ধারণা পাল্টে জনতা ব্যাংক এখন আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ একটি ব্যাংক।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আপনি কোন কাজটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

১৯৭১ সালে আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। ওই বয়সেই জাতির পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশান্তরী হয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। ওই সময় ভবিষ্যতের কোনো প্রত্যাশা আমাদের সামনে ছিল না। দেশের স্বাধীনতায় কিশোর বয়সে রক্ত ঝরিয়েছিলাম, এটিই আমার সবচেয়ে বড় অহংকার। স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতা দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে আমি একজন। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন