শনিবার | জানুয়ারি ২৩, ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

শেষ পাতা

পিপিআরসির ‘আজকের এজেন্ডা’

উন্নয়নকে প্রতীকায়ন করার প্রবণতা বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

সূচকের মাধ্যমে সমাজের অবস্থা জানার প্রবণতা কম-বেশি ২০০ বছর ধরে চলে আসছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে সমাজকে নিরীক্ষণ করাও শুরু হয়েছে অন্তত শত বছর আগে। আর গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে সূচককে অর্থনীতির বাইরে নিয়ে গিয়ে শুরু হয়েছে সামগ্রিকভাবে দেখার প্রবণতা। তবে উন্নয়নকে সামগ্রিকভাবে দেখাতে গিয়ে উন্নয়ন সূচকের রাজনীতিকীকরণ হচ্ছে। সামগ্রিক উন্নয়নের বদলে কেবল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে এগিয়ে থাকার প্রবণতা বাড়ছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) আয়োজনে ‘আজকের এজেন্ডা’ শীর্ষক আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে এসব কথা বলেন বক্তারা। এ পর্বের বিষয় ছিল ‘উন্নয়ন সূচকের রাজনীতি’। ধারাবাহিক এ আয়োজনের গণমাধ্যম সহযোগী হিসেবে রয়েছে বণিক বার্তা।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে উন্নয়ন সূচকের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট ড. সৈয়দ আখতার মাহমুদ। তিনি বলেন, উন্নয়ন সূচকের ভালো এবং মন্দ দুটো দিক আছে। এটা একদিকে যেমন ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবহার করা যায়, তেমনি এ সূচক অপব্যবহারেরও সুযোগ কিন্তু থেকে যাচ্ছে। অপব্যবহার বিষয়ে দুটি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলব। প্রথমত, যে পদ্ধতিতে সূচকের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেখানে কোনো ধরনের প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা পরিসংখ্যান তৈরি করার একটা প্রবণতা থাকতে পারে। এটাকে সরাসরি কারচুপিও বলা যায়। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি কিছুটা ভিন্ন। ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ইন্ডিকেটরে ১০ থেকে ১২টি সূচক আছে। প্রত্যেকটি দেশই চায়, সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে তাদের স্থান যেন ওপরের দিকে থাকে। ধরা যাক, এর মধ্যে একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের চেয়ে সামান্য ব্যবধানে বিভিন্ন দেশ এগিয়ে আছে। সেই ইন্ডিকেটরটিতে সামান্য কিছু উদ্যোগ নিলেই সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোকে টপকে যাওয়া সম্ভব। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার ইন্ডিকেটরটির উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিল ও সূচকে এগিয়ে গেল। কিন্তু এমনও হতে পারে, সরকার যে সূচকটি এগিয়ে নিল, তা ব্যবসায়ীদের তেমন কোনো কাজে আসছে না। তাদের জন্য হয়তো অন্য একটা দিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সরকার দেখল, ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকটিতে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। বিপরীতে সামান্য ব্যবধানে যে সূচকটিতে দেশ পিছিয়ে আছে এবং যেটার উন্নয়নে কাজের পরিমাণ অল্প, সেই সূচকটিই এগিয়ে নিল সরকার। এক্ষেত্রে সূচকে দেশ এগিয়ে গেলেও তা ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

উন্নয়ন সূচকে নারীর অবস্থান নিয়ে কথা বলেন, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। তিনি বলেন, উন্নয়ন সূচকে আমরা এখনো মনে করি লিঙ্গ সমতার অভাব রয়েছে। একজন নারী তার পরিবারে সারা দিনে যা কাজ করেন, তা একই পরিবারের একজন পুরুষের চেয়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা বেশি। কিন্তু নারী তার পরিবারে এই যে শ্রম দিচ্ছেন, তার মূল্যায়ন যেমন পরিবার দেয় না, তেমনি রাষ্ট্রীয়ভাবেও কিন্তু এর স্বীকৃতি ছিল না। জিডিপিতে নারীদের গৃহস্থালি কাজকে অন্তর্ভুক্ত করা ও নারীর কাজ স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছি। সরকারের যেসব বৃহৎ পরিকল্পনা, সেগুলোতে কিন্তু এখনো এ নারীরা অন্তর্ভুক্ত নন। বাজেট কিংবা সরকারি বিনিয়োগে এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় না। এগুলো সামনে এগিয়ে নিতে আমাদের আরো কাজ করে যেতে হবে।

ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব ইউএসএর অধ্যাপক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমের নির্বাহী পরিচালক ড. আদনান মোর্শেদ বলেন, উন্নয়নকে প্রতীকায়ন করতে আমাদের উৎসাহ বেশি। উন্নয়নের গাণিতিক যে একটা ব্যাপার, সেখানে রাজনীতিকীকরণ করা হচ্ছে। উন্নয়নকে চাক্ষুষ করার প্রবণতা আমাদের বেশি। আমরা যদি বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার কথা বলি, তাহলে সেখানে গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল শহর বা নগরে মানুষ কতটা স্বস্তি নিয়ে চলাচল করতে পারছে। শিক্ষার্থী সহজে স্কুলে যেতে পারছে কিনা কিংবা রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে কিনা, যৌন হয়রানি ছাড়া কর্মজীবী নারীরা গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারছে কিনা ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে যারা আমাদের নগর অভিভাবক আছেন, তাদের দিক থেকে ফ্লাইওভারকে নগর স্বাস্থ্যের প্রধান সূচক হিসেবে দেখানো হয়। ফ্লাইওভারকে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখানো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নগর স্বাস্থ্যের উন্নয়নে তা কতটা প্রভাব ফেলছে সেটা বিবেচনায় রাখা দরকার। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন