বুধবার | নভেম্বর ২৫, ২০২০ | ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

এসআইবিএল গ্রাহকদের সর্বাধুনিক সেবা দিতে চাই

২৫ পেরিয়ে ২৬ বছরে পা রাখল দ্বিতীয় প্রজন্মের সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)। দীর্ঘ এ পথচলা নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী ওসমান আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান

রজতজয়ন্তীর বছর কীভাবে পার করলেন?

সফলতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পার করা যেকোনো ব্যাংকের জন্যই গৌরবের। রজতজয়ন্তীর বছরটি উদযাপনের জন্য আমরা বেশকিছু কর্মসূচি নিয়েছিলাম। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের মতো মহামারী আমাদের গৃহীত কর্মসূচিগুলো পালনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তার পরও আমরা সীমিত পরিসরে কিছু কর্মসূচি পালন করেছি। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা বছরটিতে গ্রাহক সেবা উন্নয়নেই বেশি নজর দিয়েছি। ব্যাংকের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মহামারীর মধ্যে আমাদের কর্মীরা নিজেদের জীবনের কথা না ভেবে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়েছে। 

২৬ বছরে পদার্পণ করল সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। দীর্ঘ এ পথযাত্রায় আপনাদের অজর্নগুলো কী?

এসআইবিএলের দীর্ঘ পথযাত্রার প্রতিটি মুহূর্তই ছিল সমৃদ্ধির। দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হয়েও এটি প্রথম প্রজন্মের অনেক ব্যাংককে পেছনে ফেলেছে। এসআইবিএল এখন প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা সম্পদের একটি ব্যাংক। আমাদের কাছে আমানত হিসেবে জমা আছে গ্রাহকদের প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। আমরা প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা গ্রাহকদের মাঝে বিনিয়োগ করেছি। বস্ত্র, তৈরি পোশাক, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ভারী শিল্প, কৃষি, এসএমইসহ দেশের প্রত্যেকটি সম্ভাবনাময় শিল্পে এসআইবিএল বিনিয়োগ করেছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এসআইবিএল। 

সারা দেশে ১৬১টি শাখা, ৫৪টি উপশাখা, ১৩৩টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট, ১৪০টি এটিএম বুথসহ ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপসহ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছি। দুটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি এ ব্যাংককে সমৃদ্ধ করেছে। গণমুখী ব্যাংকিংয়ের ফলে এসআইবিএলের গ্রাহকসংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এ বিপুলসংখ্যক গ্রাহকই আমাদের মূল শক্তি। তাদের সন্তুষ্টিই আমাদের বড় অর্জন। এ দীর্ঘযাত্রায় দেশীয় শিল্প বিকাশ, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার, এসএমই উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্সসহ সব ক্ষেত্রে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের গ্রাহকরা ঘরে বসেই সেবা নিতে পারছে। 

তিন বছর আগে এসআইবিএলের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এ সময়ে ব্যাংকে মৌলিক কী পরিবর্তন এসেছে?

গত তিন বছরে এ ব্যাংকের প্রতিটি সূচক সমৃদ্ধ হয়েছে। এ সময়ে যুগোপযোগী বিভিন্ন ব্যাংকিং প্রডাক্টের মাধ্যমে এসআইবিএল সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ব্যাংকের শাখা ও গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক রেটিং প্রতিষ্ঠান মুডি’স আমাদের ব্যাংকের রেটিং করেছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাংকের ভাবমূর্তি বেড়েছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে করেসপন্ডেন্ট রিলেশন স্থাপনসহ বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য ১০ কোটি ডলার তহবিলের চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের সৌদি আরবে শাখা খোলার অনুমতি দিয়েছে। এখন সৌদি আরবের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। জেদ্দা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক পরিচালিত আওকাফ প্রোপার্টিজে আমরা ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছি। দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের সুকুক ইস্যু নিয়ে কাজ করছি। সব মিলিয়ে গত তিন বছরে এসআইবিএলের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো।

প্রযুক্তির দিক থেকে উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো বেশ পিছিয়ে ছিল। কয়েক বছর ধরে দেশের প্রায় সব ব্যাংকই প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে এসআইবিএলের অবস্থান কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন যেকোনো ব্যাংকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের দাবি পূরণ করতেই দেশের ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এসআইবিএল এক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। পেপারলেস ব্যাংকিংকে উৎসাহিত করতে আমরা শাখা পর্যায় থেকে সব প্রস্তাব অনলাইনে প্রেরণ এবং অনলাইনেই অনুমোদন দিচ্ছি।

এজন্য বিদ্যমান ‘ডকুমেন্টস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’কে শক্তিশালী করা হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকিং সেবা দেয়ার জন্য আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ কল সেন্টার চালু করেছি। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপের সুবিধা যুগোপযোগী করার পাশাপাশি সেবাগুলোর আওতা বাড়ানো হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা ই-অ্যাকাউন্ট সেবা চালু করেছি। এ সেবার মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি ঘরে বসেই মোবাইলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন। হিসাব খোলার জন্য এখন আর গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় আসার প্রয়োজন হচ্ছে না। আমাদের মোবাইল অ্যাপ ‘এসআইবিএল নাউ’-এর মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা খুব সহজেই করা যাচ্ছে।

ই-অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রাহকরা ডিপিএস হিসাবও খুলতে পারছেন এবং টাকা জমা দিচ্ছেন। এছাড়া আগামী মাসেই চালু করা হচ্ছে ‘কিউআর কোড’ দিয়ে শাখা থেকে টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা। ফলে গ্রাহকদের সঙ্গে করে চেকবই বহন করতে হবে না। ‘এসআইবিএল নাউ’ অ্যাপ দিয়ে প্রবাসীরাও আমাদের ব্যাংকের হিসাব খুলতে পারবেন। ফলে ব্যাংকে প্রবাসীদের হিসাব ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে। সব মিলিয়ে এসআইবিএলকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।

এসআইবিএলের ইসলামিক মাইক্রো ফাইন্যান্স কর্মসূচির অবস্থা কী?

সমাজের বিত্তহীন, নিম্ন ও মাঝারি আয়ের মানুষকে সংগঠিত করে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য আমরা ‘ফ্যামিলি এমপাওয়ারমেন্ট ইসলামিক মাইক্রো ফাইন্যান্স’ কর্মসূচি চালু করেছিলাম। এ কর্মসূচিতে আমরা বিপুল সাফল্য পেয়েছি। কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রান্তিক চাষী, ক্ষুদ্র কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিক্ষিত বেকারদের অর্থায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা এ কর্মসূচির আওতায় ৩৫ হাজার গ্রাহককে ২০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। আশার কথা হচ্ছে, এ প্রকল্পে আদায়ের হার ৯৯ শতাংশেরও বেশি। এ কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়। বর্তমানে ব্যাংকের ৭০টি শাখায় ১০৮ জন সোস্যাল অফিসার মাঠ পর্যায়ে ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়োজিত আছেন।

এসআইবিএলের গ্রাহক, কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর এসআইবিএলের যাত্রা হয়েছিল। দীর্ঘ এ পথচলার প্রত্যেকটি সঙ্গীকে আমি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। চলমান মহামারীতে আমাদের বহু কর্মী করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে এবং একজন কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। কর্মীদের ত্যাগের ফলেই মহামারীর মধ্যেও ব্যাংকের সব কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলেছে। এরই মধ্যে আমরা সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থের বেশির ভাগ বিতরণ করেছি। এসআইবিএলের গ্রাহক ও দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান হলো, আপনাদের প্রতিটি অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদের কাছে আপনাদের প্রতিটি অর্থই নিরাপদ। আমানতদারিতা রক্ষায় আমরা সর্বদাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন