রবিবার | নভেম্বর ২৯, ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পর্যালোচনা

অমর্ত্য সেন: অর্থনীতিবিদ নাকি দার্শনিক

জঁ দ্রেজ

অনুবাদ: আহমেদ জাভেদ

অমর্ত্য সেনকে লোকে যতটা না দার্শনিক হিসেবে জানে, তার চেয়ে অনেক বেশি জানে অর্থনীতিবিদ হিসেবে। তিনি অর্থশাস্ত্রী বটে, কিন্তু তার দার্শনিক সত্তাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে অ্যাডাম স্মিথের সঙ্গে তার বেশ মিল। তিনি যে শুধু স্মিথের অত্যন্ত গুণগ্রাহী তাই নয়, তাদের দুজনের নামের আদ্যক্ষর (‘এ’ ও ‘এস’) পর্যন্ত এক! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অমর্ত্য সেনের দার্শনিক ভিত্তিই তাকে অর্থনীতির প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করার জোর দিয়েছে। এ প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তার কৃতিগুলো অর্থনীতির প্রচলিত ধ্যান-ধারণাগুলোকে পাল্টে দিয়েছে। আমি তার লেখা প্রথম পড়ি ১৯৮০-এর দশকে। তখনই অর্থনীতির কিছু পুরনো সমস্যাকে নতুন দৃষ্টিতে হাজির করার সুবাদে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর প্রায় ৪০ বছর কেটে গেছে, আর এই কালপর্বে অমর্ত্য সেনের অসামান্য কৃতিগুলো বিদ্যাচর্চা, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগের মতো বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রগুলোর ওপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা বইটি পাঠককে অমর্ত্য সেনের মৌলিক ভাবনাগুলোর সঙ্গে খুব সুন্দরভাবে পরিচয় করিয়ে দেবে। বইটি পড়ার আগে আমার ধারণা ছিল অমর্ত্য সেনের বৈচিত্র্যময় বিশাল কাজের ভাণ্ডার কোনো একজনের পক্ষে তুলে ধরা হয়তো সম্ভব না-ও হতে পারে। বস্তুত, লরেন্স হ্যামিল্টনের বইটিতে অমর্ত্য সেনের চিন্তা ও চর্চার সব দিক তুলে ধরা হয়নি; বরং তার চিন্তার একটি বড় অংশই—স্পষ্টভাবে হোক বা অস্পষ্টভাবে—এ বইয়ে আলোচনার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এটি একটি দারুণ কাজ, যেখানে হ্যামিল্টন অমর্ত্য সেনের মৌলিক চিন্তাগুলোকে তুলে ধরেছেন এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।  

বইটিতে আলোচিত ধারণাগুলো কোনো কোনো পাঠকের কাছে কিছুটা বিমূর্ত ঠেকতে পারে। এর কারণ হলো, অমর্ত্য সেন শুধু একজন বিরাট চিন্তাবিদ হিসেবেই খ্যাত নন, সেই সঙ্গে লোকে তাকে চেনে পৃথিবীর বাস্তব পরিবর্তন ঘটানোর জন্য ভীষণ রকম উৎসাহী একজন মানুষ হিসেবে। বস্তুত, তিনি বাস্তব কাজের মানুষ। অবশ্য কাজ হিসেবে তিনি কেবল ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল করা কিংবা শুধু প্রেসনোট লিখে যাওয়ার মতো পথ বেছে নেননি। পন্থা হিসেবে তিনি জোর দেন প্রকাশ্য আলোচনার ওপর। তার সম্মানে কৌশিক বসু ও রবিও কানবুর যথার্থভাবেই তাদের সম্পাদিত গ্রন্থের নাম রেখেছেন ‘আর্গুমেন্টস ফর এ বেটার ওয়ার্ল্ড’, কারণ অমর্ত্য সেনের প্রকাশ্য বিতর্কগুলো হচ্ছে ‘একটি উত্কৃষ্টতর বিশ্বের জন্য। অমর্ত্য সেন একজন সর্বাগ্রগণ্য এক তার্কিক ভারতীয়। যতই বিমূর্ত মনে হোক না কেন, তার চিন্তাগুলো গণসক্রিয়তার প্রসার ঘটানোর জন্য এগুলো নিরন্তর তাগিদ জুগিয়ে চলেছে।   

উন্নয়ন চিন্তায় অমর্ত্য সেনের ধারণাগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্য আলোচনার যে নিবিড় সম্পর্ক, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। বইটির ভূমিকায় লরেন্স হ্যামিল্টন খুব সুন্দরভাবে বিষয়টি আলোচনা করেছেন। অমর্ত্য সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উন্নয়নকে মানব স্ব-ক্ষমতা (ফ্রিডম) বা সক্ষমতার (ক্যাপাবিলিটিস) প্রসার হিসেবে দেখা।

নব্য ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রে যেভাবে দেখা হয়, তাতে পণ্য হচ্ছে ‘তৃপ্তি’র (‘ইউটিলিটি’) উৎস। এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে অমর্ত্য আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সক্ষমতা কেবল পণ্যের ব্যাপার মাত্র নয়। উদাহরণস্বরূপ, বন্ধুত্ব আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। বন্ধুত্ব নিজগুণেই মূল্যবান, কিন্তু পাশাপাশি বিশেষ করে আমরা যেসব কাজকে মূল্যবান বলে মনে করি, সেইসব কাজ করার স্ব-ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারেও তার ভূমিকা থাকে। কিন্তু বন্ধুত্ব কোনো পণ্য নয়।

মানুষের স্ব-ক্ষমতা যে কেবল পণ্যের ব্যাপার নয়, সেটা তো স্রেফ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যাওয়ার কথা। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা যেসব মডেল নির্মাণে আচ্ছন্ন থাকেন, সেগুলোয় তৃপ্তিযোগকে জীবনকুশলতা বা ভালো থাকার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, আর তৃপ্তিযোগকে দেখা হয় পণ্যের একটি করণভবন (ফাংশনিং) হিসেবে। ফলে স্ব-ক্ষমতা যে কেবল পণ্যের ব্যাপার নয়, এই সাধারণ অন্তর্দৃষ্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই চিন্তা বিশেষ করে প্রকাশ্য যুক্তিতর্কের দুয়ার খুলে দেয় এবং এর ক্ষেত্রকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে।

একটু খোলাসা করে বলা যাক। কল্যাণ অর্থনীতির ধারণামতে, প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রধানত দুটি বিবেচনা ভিত্তি কাজ করে। একটি হলো বাজার যদি ব্যর্থ হয়, আর অন্যটি হলো যদি বণ্টনবৈষম্যের আশঙ্কা থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি কল্যাণ অর্থনীতির বিখ্যাত ফার্স্ট ফান্ডামেন্টাল থিওরেম (প্রথম মৌলিক উপপাদ্য) থেকে নেয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে কিছু নির্দিষ্ট অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতিতে সীমিতসংখ্যক সামাজিক কাম্যাবস্থা বিরাজ করে, যেটি প্যারেটো কাম্যাবস্থা (প্যারেটো অপটিমালিটি) কিংবা প্যারেটো-দক্ষ (প্যারেটো এফিসিয়েন্সি) অবস্থা নামে পরিচিত। এর অর্থ হলো, সমাজে কোনো একজনের উন্নতি করতে হলে অন্তত একজনের অবস্থার অবনতি ঘটতেই হবে।  

এই শর্তগুলোর কোনো কোনোটা যখন ভঙ্গ হয় তখনই বাজার ব্যর্থতা (মার্কেট ফেইলিওর) দেখা দেয়। শর্তভঙ্গের উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, তথ্যের অসম প্রবাহ (ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি) কিংবা অতিরেক (এক্সটার্নালিটিস)—শর্তাধীন ব্যাপারগুলোর বাইরের কিছু জিনিসের প্রভাব। বাস্তব দুনিয়ায় বাজার ব্যর্থতা এতটাই ব্যাপক আকারে দেখা দেয় যে এটা প্রায়ই ব্যতিক্রম না হয়ে নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সেগুলোকে শনাক্ত করার কাজটাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ  কখন, কোথায় ও কীভাবে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন—এর থেকে সেগুলো জানা যাবে। বাজার ব্যর্থতার পাশাপাশি বণ্টনবৈষম্যের কারণেও হস্তক্ষেপের যথার্থতা প্রমাণিত হয়—যেহেতু অসাম্যের সঙ্গে প্যারেটো দক্ষতা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অর্থশাস্ত্রে পণ্য হচ্ছে উৎপাদন ও বিনিময়ের বস্তু। এবারে উল্লিখিত সম্পর্কের যুক্তিটা দাঁড়িয়ে আছে একটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে: মানুষের জীবনকুশলতার (ওয়েল বিয়িং) উৎস হচ্ছে পণ্য, যেটি উৎপাদন ও বিনিময়ের বস্তু। বস্তুত, অমর্ত্য সেন এ যুক্তিটাকে খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে জীবনকুশলতা ও পণ্যের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দৃষ্টিভঙ্গি চয়নের বিভিন্নতা ও তার অগ্রাধিকার, তৃপ্তিযোগ এবং জীবনকুশলতার ভেতর আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারে নানা বিভ্রান্তি তৈরি করে। অমর্ত্য সেনের সক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গি এই বিভ্রান্তিগুলোকে দূর করে, লরেন্স হ্যামিল্টন তার বইটিতে কিছুটা বিস্তারিতভাবে এ দিকটি আলোচনা করেছেন। শুধু তাই নয়, অমর্ত্যের জীবনকুশলতার আলোচনা আমাদের অনুধাবনকে পণ্যজগতের সীমা অতিক্রম করে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়।

অমর্ত্য সেনের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা যা পাই তা হলো, আলোচনাভিত্তিক জন-উদ্যোগের (পাবলিক অ্যাকশন) প্রকৃত ক্ষেত্রটি কেবল বাজার ব্যর্থতা ও বণ্টনবৈষম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি খুলে বলা যায়। যেমন সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি কিন্তু বাজার ব্যর্থতা নয়। অর্থনীতির কোনো তত্ত্বই আমাদের একথা বলে না যে বাজার ভালোভাবে কাজ করলেই সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি এড়ানো যাবে। সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি মানুষে মানুষে সম্পর্কের একেবারে গোড়ার বিষয়। বাজারের বিনিময় সম্পর্কের ভেতর এটি হয়তো থাকতে পারে; কিন্তু তা কঠোরভাবে এর মধ্যেই সীমিত থাকতে পারবে না। এই সাম্প্রদায়িকতার প্রতিরোধের জন্য বাজার ব্যর্থতার ভুল শোধরানোর বাইরে গিয়ে জন-উদ্যোগের প্রয়োজন পড়বে।

আমার একথা শুনে গোঁড়া নব্য ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা বলতে পারেন যে সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয় এবং কল্যাণ অর্থনীতির মৌল উপপাদ্যগুলোর সবারই কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনীতি। এটি বুঝতে কোনো সমস্যা হয় না যে তারা এটি কেন বলবেন। প্রকৃতপক্ষে আর্থিক কাজকর্মের বাইরেও সামাজিক জীবন রয়েছে। যাই হোক, আর্থিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক জীবনের মধ্যে টানা বিভাজক রেখাটা আসলে কৃত্রিম, কারণ এ দুটো একে অন্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ও দৃঢ়ভাবে যুক্ত। এটি মেনে নেয়া দরকার যে কল্যাণ অর্থনীতির মৌল উপপাদ্যগুলো বেশকিছু বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

এই দৃষ্টিতে দেখলে আলোচনাভিত্তিক গণ-উদ্যোগের ক্ষেত্রটি যে অত্যন্ত প্রশস্ত, তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। বাজার ব্যর্থতা ও বণ্টনবৈষম্যের মতো নানা বিষয়, বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো প্রকট বৈষম্যপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো এর মধ্যে ভালোভাবেই অন্তর্ভুক্ত হয়, পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থা একেবারে ত্রুটিহীনভাবে চললেও যেসব সমস্যার সমাধান করা যায় না, সেগুলোও এর আওতার মধ্যে চলে আসে। এই দ্বিতীয় ধরনের সমস্যাগুলোর মধ্যে কয়েকটি উদাহরণ হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, যোগদানভিত্তিক গণতন্ত্র নির্মাণ করা, সমাজে অধিকতর সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রতিরোধ, জাতপাতের বিভেদের বিলোপ, পিতৃতন্ত্রের অবসান, পরিবেশের উন্নতীকরণ, নাগরিক স্বাধিকারের বিস্তৃতি এবং সামাজিক আচরণের উন্নয়ন ইত্যাদি। জীবনের গুণগত মান উন্নয়নে এগুলো এবং এদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সক্ষমতা অর্জন হলো মৌলিক ব্যাপার।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এ ব্যাপারগুলো আসল জিনিসটা থেকে আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমি খুবই আশা করি যে এগুলো এ বইতে আলোচিত তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে অমর্ত্য সেনের কাজের বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে খুবই সাহায্য করবে। বইটিতে লেখক মূলত মনোযোগ দিয়েছেন নৈর্ব্যক্তিকতা (অবজেক্টিভিটি), বিচারশীলতা (রেশনালিটি), জীবনকুশলতা (ওয়েল-বিয়িং), স্ব-ক্ষমতা (ফ্রিডম), ন্যায্যতা (জাস্টিস) এবং গণতন্ত্র বিষয়ে অমর্ত্য সেনের চিন্তার ওপর। এই ধারণাগত আলোচনাটি অমর্ত্য সেনের মানুষের বাস্তব জীবনে ঘটে চলা বৈষম্য ও বঞ্চনা নিয়ে উদ্বেগটাকে কিছুটা আড়াল করে দিতে পারে বটে, কিন্তু কার্যত তার তত্ত্ব ও প্রায়োগিক আগ্রহ—এ দুটো ব্যাপারই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

উন্নত জীবনমান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পণ্যের চেয়ে সক্ষমতার মূল্যটা যে কত অধিক, অমর্ত্য সেনের নিজের জীবন থেকেও এ দিকটি খানিকটা অনুধাবন করা যায়। অমর্ত্য সেন মৌলিক স্বাচ্ছন্দ্যগুলোকে গুরুত্ব দেন, হয়তোবা একটু বেশি করেই দেন। কিন্তু কোনো অর্থেই তাকে ভোগী বলা যাবে না। মাঝে মাঝে তাকে বড় হোটেলে থাকতে হয়, কিন্তু সেটি বিলাসের জন্য নয়, কিছু অহেতুক ঝামেলা এড়ানোর জন্য। এখানে একটি কথা বলি, তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একেবারেই পছন্দ করেন না। আর ভারতে এলে শান্তিনিকেতনে তার পৈতৃক বাড়িতেই তিনি থাকেন। এই বাড়িটি তার ছোটবেলায় যেমনটি ছিল, এখনো ঠিক তেমনটিই আছে—কোনো পরিবর্তন তিনি করেননি। নিজের বাড়িতে থাকার স্বাচ্ছন্দ্য তিনি এ বাড়িতেই খুঁজে পান।

শান্তিনিকেতনে বরাবরই তার সকালের নাশতা হচ্ছে মুড়ি। অন্তত আমি যতদিন ধরে তাকে চিনি-জানি, শান্তিনিকেতনে সকালের নাশতায় এটিই দেখেছি। অমর্ত্য মননে ডুবে থাকেন: বই পড়ছেন, চিন্তা করছেন, লিখছেন, কখনো তর্ক জুড়ে দিচ্ছেন এবং অবশ্যই আড্ডা দিচ্ছেন—সব বাঙালি বুদ্ধিজীবীর যা অসম্ভব প্রিয়। এর সঙ্গে আমাকে তার হূদয়ের দিকটার কথাও বলতে হবে: তিনি কার্ল মার্ক্সেরও খুব গুণগ্রাহী এবং মার্ক্স যেমন কেবল ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বসেই কাটিয়ে দেননি, জীবনের অন্য ক্ষেত্রগুলোকেও গুরুত্ব দিয়েছেন, অমর্ত্যও তেমনি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং পরিবারের জন্যও প্রশস্ত জায়গা রেখেছেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি ভোগের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনের পরিপূর্ণতা খোঁজেন না। কিন্তু তিনি যেটি বেশি মূল্যবান মনে করেন, সেই স্ব-ক্ষমতা অর্জনের জন্য যেটুকু পণ্য প্রয়োজন, তা তিনি গ্রহণ করেন।  

লরেন্স হ্যামিল্টন অমর্ত্য সেনের প্রাক্তন ছাত্র। হ্যামিল্টন সেনের ধারণাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও তার বেশির ভাগ চিন্তাগুলোকে নিজের ভেতর লালন করেন। তা সত্ত্বেও হ্যামিল্টন সমালোচনাবিমুখ নন। অমর্ত্য সেনের কিছু চিন্তা তার কাছে অতটা জোরালো মনে হয়নি এবং তিনি সেগুলো তুলেও ধরেছেন। যেমন জন স্টুয়ার্ট মিলের লেখা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ‘আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনা’র যে ধারণার কথা অমর্ত্য বলেন, হ্যামিল্টন সেটি নিয়ে যথাযথভাবে প্রশ্ন তুলেছেন এবং তার বাস্তব কার্যকারিতার ওপর সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিশেষত বিদ্যমান অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে একটি মুক্ত, অবাধ, সমদর্শী ও যোগদানের সমান সুযোগের ভিত্তিতে আলোচনা বাস্তবে কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে হ্যামিল্টন সন্দিহান।

আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকারের দেশ পরিচালনা করার ধারণাটি প্রকাশ্য বিতর্কের পক্ষধর একজন তার্কিক মেধাজীবীর কাছে নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ (কিন্তু হ্যামিল্টন একে ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘পরিষ্কারভাবে সেমিনারে আলোচনার বিষয় এটি’)। কিন্তু সর্বদাই কেবল আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বাধার পাহাড়গুলো দূর করা যায় না। যেমন, যদি সব ক্ষমতা দাপুটে জমিদারের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে তার সঙ্গে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের আলোচনা থেকে কোনো লাভ হওয়াটা কঠিন।

এক্ষেত্রে অমর্ত্য সেন হয়তো বলবেন, ‘আলোচনা’র পদ্ধতিটি এমন হতে হবে যেন মিছিল-মিটিং ও হরতালের মতো বিষয়কে এর ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অথবা তিনি প্রশ্ন তুলতে পারেন—কীভাবে সমতাধর্মী ক্ষমতা-সম্পর্কগুলোকে ‘আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনার’ আদর্শটির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ করে তুলে একে আরো বেশি কার্যকর করে তোলা যায়। অমর্ত্য সেনের চিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তার ভাবনাগুলো সময়ের পরিক্রমায় গঠনমূলকভাবে জন্ম নিয়েছে। যেমন তার স্বত্বাধিকারের ধারণা থেকে এসেছে সক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গি, পরবর্তীকালে এ দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি কখনই তার পূর্ববর্তী ধারণাগুলোকে খারিজ করে দেননি, বরং সেগুলোকে কিছুটা রূপান্তরের মাধ্যমে আরো ধারালো করে তুলেছেন। গণতন্ত্রের প্রশ্নটি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নীতিগুলোর অতি দ্রুত অবনমন ঘটে চলেছে। এখনো গণতন্ত্র নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি, এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো কথা বলার সময় আসেনি।  

আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে ভারতের পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউজ লরেন্স হ্যামিল্টনের এ বই প্রকাশ করেছে। ফলে ভারতীয় পাঠকদের জন্য তা সুলভ হবে বলে আশা করছি। অমর্ত্য সেনের বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান সারা দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে কুৎসা প্রচার করার ফলে ভারতে তার কাজের মূল্য কিছুটা ঢাকা পড়ে গেছে।  

এমনকি একজন প্রধানমন্ত্রী তার প্রতি কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘হার্ভার্ডের চেয়ে হার্ডওয়ার্ক বা কঠোর পরিশ্রমের ক্ষমতা অনেক বেশি’, যদিও তিনি বোধ হয় এটা জানেন না যে বস্তুত খুব কম লোকই আছেন, যারা অমর্ত্য সেনের চেয়েও কঠোর পরিশ্রমী। সুতরাং সেদিক থেকে এ বইটির একটি বিশেষ মূল্য রয়েছে। বিশেষত অমর্ত্য সেনের লেখা না পড়েই মরিয়া হয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণের প্রেক্ষাপটে বইটি বেশ ভালো অবদানই রাখবে বলে মনে করি। এর চেয়েও জরুরি বিষয় হলো, বইটি অমর্ত্য নিজে যেমনটা করে থাকেন, সে রকমই ব্যাপক পাঠককে উদ্দেশ করে লেখা। আর এ বই যদি পাঠককে অমর্ত্য সেনের মূল লেখাগুলো অন্তত কিছুটা পড়তে উৎসাহ দেয়, তবে তো আর কথাই নেই।

(এ লেখায় জঁ দ্রেজ দেখাচ্ছেন কীভাবে চিন্তার মৌলিকতার জোরে অমর্ত্য সেন হয়ে উঠেছেন সর্বাগ্রগণ্য এক তার্কিক ভারতীয়। যতই বিমূর্ত মনে হোক না কেন, তার চিন্তাগুলো গণসক্রিয়তার প্রসার ঘটানোর জন্য এগুলো নিরন্তর তাগিদ জুগিয়ে চলেছে।)

[লরেন্স হ্যামিল্টনের ‘হাউ টু রিড অমর্ত্য সেন’ বইটির মুখবন্ধের নির্বাচিত অংশ প্রথম প্রকাশিত হয় ওয়েব ম্যাগাজিন স্ক্রলে। লেখকের অনুমতিক্রমে এর বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে।]

জঁ দ্রেজ: রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অতিথি অধ্যাপক

আহমেদ জাভেদ: দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন