শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

করোনাবিশ্ব

বিবর্তনে ভাইরাস কম মরণঘাতী?

বণিক বার্তা ডেস্ক

কোনো মরণঘাতী মহামারী সারা জীবন টিকে থাকে না। উদাহরণস্বরূপ ১৯১৮ সালের ফ্লু মহামারীও বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব চালিয়েছে এবং ১০ মিলিয়ন মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। তার পরও ১৯২০ সালে গিয়ে এ ভাইরাস সামান্যই মরণঘাতী রূপ ধরে রাখতে পারে। তখন এটি কেবল মৌসুমি ফ্লু হিসেবেই থেকে যায়। কোনো কোনো মহামারী আবার দীর্ঘস্থায়ী হয়। যেমন ব্ল্যাক ডেথ, যা ১৩৪৬ সালে মধ্য এশিয়া থেকে বেরিয়ে এসেছিল। এরপর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অংশে এক-তৃতীয়াংশ লোককে হত্যা করে। সেই মহামারীও একপর্যায়ে শেষ হয়েছিল, শুরু হওয়ার প্রায় সাত বছর পর।

যতদূর বিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকরা বলতে পারেন, যে ব্যাকটেরিয়া ব্ল্যাক ডেথের জন্য দায়ী তারা কখনই তদের তীব্রতা ও মরণঘাতী হওয়ার ক্ষমতা হারায় না। কিন্তু ১৯১৮ সালের সেই ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর জন্য দায়ী রোগজীবাণু এখনো মৌসুমি ফ্লুর একটি স্ট্রেইন হিসেবে থেকে গেছে, যা আরো কম মরণঘাতী হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। একই ঘটনা সম্ভবত ২০০৯ সালের এইচ১এন১ মহামারীর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সার্স-কোভ-২ যা কিনা কভিড-১৯-এর কারণ তাও কি একই পদাঙ্ক অনুসরণ করবে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন, ভাইরাসটি এরই মধ্যে এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যার ফলে এর স্থানান্তর আরো সহজ হয়েছে। কিন্তু তীব্রতা কখন হ্রাস পাবে, সেটি জানতে চাইলে বেশির ভাগই বলেছেন, এখনো সময় আসেনি। অতীতের দিকে চোখ রাখলে অবশ্য কিছু সূত্র পাওয়া যাবে।

সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে ভাইরাসের তীব্রতা হ্রাস পাওয়ার ধারণাটি বেশ পুরনো। উনিশ শতকের ডাক্তারদের লেখাতেই এ ধারণার উদ্ভব। থিওবাল্ড স্মিথ, যিনি প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন যে হোস্ট ও পরজীবীর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে। পাশাপাশি তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সময়ের সঙ্গে যেকোনো জীবাণুর তীব্রতা হ্রাস পাওয়া উচিত, কারণ সত্যিকার অর্থে কোনো জীবাণুরই তার হোস্টকে হত্যা করার আগ্রহ থাকে না। এ ধারণা প্রচলিত জ্ঞান হিসেবে অনেক দিন ধরেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে গিয়ে গবেষকরা এ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেন। দশকের শুরুর দিকে ম্যাথমেটিক্যাল বায়োলজিস্ট রয় অ্যান্ডারসন ও রবার্ট মে প্রস্তাব করে বলেন, জীবাণু তখনই সর্বাধিক সংক্রমণ ঘটায় যখন হোস্ট অনেক জীবাণুকে ছড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ আপনি যদি সত্যিই অসুস্থ থাকেন, তবে যুক্তি অনুসারে প্রচুর ভাইরাস ছড়াবে। পরবর্তী হোস্টের সংস্পর্শে আসা অনেক সহজ হয়ে যায়। ফলে জীবাণু অতিরিক্ত মরণঘাতী না হওয়া পর্যন্ত, তীব্রতা ও সংক্রামকতা হাতে হাত রেখে চলে। কারণ অতি মারণঘাতী হওয়ার কারণে এটি দ্রুত হোস্টকে হত্যা করে এবং সেজন্য এটি ছড়াতে পারে না। এটা মূলত ট্রান্সমিশন-ভায়রুলেন্স ট্রেড-অফ হিসেবে পরিচিত। এর পরিচিত উদাহরণ হচ্ছে দ্য মায়োক্সোমা ভাইরাস। এটি ১৯৫০ দশকে খরগোশের মধ্যে ছড়িয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এ ভাইরাস সংক্রমিত খরগোশের ৯০ শতাংশকে হত্যা করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এক ধরনের বিরতি নেমে আসে, খরগোশের মধ্যে প্রতিরোধ তৈরি হয়। মায়োক্সোমা জীবাণুর তীব্রতা হ্রাস পায় এবং কিছু সময়ের জন্য খরগোশ ও জীবাণুর মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি হয়।

দ্বিতীয় তত্ত্বটি বিকশিত হয়েছিল বিবর্তনবাদী এপিডেমিওলজিস্ট পল ইউয়াল্ড দ্বারা। যাকে তিনি বলেছিলেন ‘থিয়োরি অব ভিরুলেন্স’। যেখানে নিয়ম হিসেবে একটি পরামর্শে বলা হয়, মরণঘাতী জীবাণুর বিস্তৃতির সম্ভাবনা কম। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত চলনক্ষম হয়ে পড়ে (যেমনটা ইবোলার ক্ষেত্রে হয়েছিল), তাহলে তারা আর দ্রুত সংক্রমণের বিস্তৃতি ঘটাতে পারে না। এ চিন্তা অনুসারে যদি বিস্তৃতির জন্য জীবাণুর মোবাইল হোস্ট প্রয়োজন হয়, এর তীব্রতার হ্রাস পাওয়া জরুরি। প্রাচীন প্রচলিত জ্ঞানের মতো থিয়োরি অব ভিরুলেন্সও স্বীকৃতি দেয় যে মানুষের মধ্যে পরিচালিত ও মানিয়ে নেয়ার সঙ্গে অনেক জীবাণুর তীব্রতা হ্রাস পায়। কিন্তু ইউয়াল্ডের থিয়োরি এটাও প্রস্তাব করে যে বিস্তৃতির জন্য জীবাণুর নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং সেই কৌশলগুলো জীবাণুকে অনুমতি দেয় তীব্রতা ও সংক্রামকতা বজায় রাখতে।

স্থায়িত্ব তেমন একটি কৌশল হতে পারে। ভারিওলা ভাইরাস, যা গুটিবসন্তের কারণ সেটি বাইরের পরিবেশে খুবই টেকসই। এতে মৃত্যুহার ১০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ইউয়াল্ড এটি এবং অন্য স্থায়ী জীবাণুকে ‘সিট অ্যান্ড ওয়েট’ জীবাণু বলে উল্লেখ করেন। কিছু মারাত্মক সংক্রমণ ভেক্টর দ্বারা খুবই অসুস্থ হোস্ট থেকে ছড়িয়ে পড়ে: মাছি, উকুন কিংবা মশা। অন্যগুলো যেমন কলেরা ছড়ায় পানির মাধ্যমে।

এছাড়া যেসব ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে সেখানে ভাইরাস ছড়াতে পারে, যারা আক্রান্তের সেবা করে তাদের মাধ্যমে। এটা ঘটেছিল উনিশ শতকে নারী হাসপাতালে। যখন চিকিৎসকরা প্রসবোত্তর নারীদের কাছ থেকে পিউরপার্ল কিংবা চাইল্ডবেড অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।

ইউয়াল্ডের মতে, এসব কৌশল হয়তো জীবাণু প্রতিরোধ করতে পারে। অন্যথায় তীব্রতাকে হ্রাস করতে পারে। তাহলে এ বিবর্তনবাদী তত্ত্বগুলো সার্স-কোভ-২ সম্পর্কে কী বলে? বিশ্বজুড়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে চালিত হওয়ার চক্রের মাধ্যমে এর তীব্রতা কি হ্রাস পাবে?

করোনাভাইরাসের আরেকটি মারাত্মক প্রাদুর্ভাব সার্স কিন্তু আমাদের ভিন্ন চিত্র দেখায়। যারা খুব অসুস্থ তাদের সংক্রমণ চলাকালে দেরিতে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হয়। শেষ পর্যন্ত এটি আট হাজার মানুষকে আক্রান্ত করে এবং ৭৭৪ জনকে হত্যা করে। বৈশ্বিকভাবে অসুস্থদের আইসোলেট করার মাধ্যমে এটিকে থামানো হয়। কিন্তু সার্স-কোভ-২-এর ক্ষেত্রে সংক্রমণের শুরুর দিকেই এর বিস্তৃতি ঘটে। এখানে স্থানান্তরতা ও তীব্রতার মধ্যে কোনো প্রয়োজনীয় সম্পর্ক নেই। এমনকি উপসর্গহীন সংক্রমণেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণের ভাইরাস ছড়াতে পারে। পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শতা বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে না।

তার পরও এটা অসম্ভব মনে হচ্ছে যে সার্স-কোভ-২-এর বিবর্তন অ্যান্ডারসন ও মের ট্রান্সমিশন-ভায়রুলেন্স ট্রেড-অফ মডেলকে কঠোরভাবে প্রতিফলিত করেছে। সার্স-কোভ-২-এর বিবর্তনীয় পদছাপের ভবিষ্যদ্বাণী করতে ইউয়াল্ড বরং ভাইরাসের স্থায়িত্বের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। তার মতে, ভাইরাসে সংক্রমিত কণা পৃষ্ঠে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে, যা তাকে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো স্থায়িত্ব বলে প্রমাণ করে। তার পরও এখনো কোনো কিছু সুনিশ্চিত নয়। এমনকি বর্তমান মৃত্যুহারও অনিশ্চিত, কারণ দেশে দেশে টেস্টিংয়ের ভিন্নতা।

বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে ভাইরাসের মধ্যে বিবর্তনীয় পরিবর্তন লক্ষ করেছেন। যদিও এটি স্পষ্টত বাড়তি সংক্রামকতা দেখায়। যেমন একটি গবেষণা দেখিয়েছে, ডি৬১৪জি নামে মিউটেশনটি মূলটির চেয়ে অধিক সংক্রামক। এমনকি এ স্ট্রেইন এখন আসল মহামারীতে পরিণত হয়েছে। তবে ইউয়াল্ডের বিশ্লেষণ অনুসারে উচ্চ সংক্রামকতা প্রায়ই কম তীব্রতার সঙ্গে যুক্ত। তিনি আশা করছেন, সার্স-কোভ-২ বিবর্তনও একইভাবে ঘটবে।  

মেডেস্কেপ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন