বুধবার | নভেম্বর ২৫, ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

টেলিকম ও প্রযুক্তি

অবাস্তব ভার্চুয়াল হিরোরা যখন বাস্তব অর্থ উপার্জনের মেশিন

বণিক বার্তা অনলাইন

সেরাফিনের গোলাপী চুল আর বিড়াল-থিমযুক্ত ইনস্টাগ্রাম পোস্টগুলো লাখ লাখ অনুসারীকে আকৃষ্ট করে। লিগ অব লিজেন্ড গেমসের নির্মাতা স্টুডিও রায়ট গেমস ইনকরপোরেশনের তৈরি এই সেরাফিন নামের চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় যে কয়েকদিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীদের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ হয়ে যায়। মহামারী সেরাফিনের জন্য যে বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার রোধে রক্ত-মাংসের অনলাইন তারকারা যখন ঘরে বসে অলস সময় পার করছেন, সেখানে বিশ্বজুড়ে রাজত্ব করছে সেরাফিন। বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও তিনি মাঝেমধ্যে মাস্ক পরছেন। এসব কিছুই ঘটে ভার্চুয়ালি। সেরাফিন এক ভার্চুয়াল তরুণী!

মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ যখন বিধিনিষেধের মধ্যে পড়ে গেছে, তখন ডিজিটাল মুখপাত্রদের চাহিদা বাড়বে- এটাই তো স্বাভাবিক। বিজনেস ইনসাইডার ইন্টেলিজেন্সের হিসাব অনুসারে, ২০২২ সালের মধ্যে বিপণনের পেছনে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার ব্যয় করার প্রত্যাশা করছে ব্র্যান্ডগুলো। এই অর্থের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েঞ্চারদের দখলে চলে যাচ্ছে। আর এ কারণে ঐতিহ্যবাহী বিপণন পদ্ধতি মারাত্মকভাবে ধাক্কা খাচ্ছে। 

ভার্চুয়াল হিউম্যানস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার ট্র্যাভার্স বলেন, ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েঞ্চাররা বাস্তব দুনিয়ার কেউ না হলেও তাদের মাধ্যমে আসল ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের তুলনায় এগুলো দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ীভাবে কাজে লাগানো যায়, এগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য, একসঙ্গে অনেক জায়গায় উপস্থিত হতে পারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের কখনোই বয়স বাড়ে না বা তারা মারা যায় না!

ট্র্যাভার্সের মতে, দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ ব্যবহারকারীর লিগ অব লিজেন্ডসের অভিনয় শিল্পী হিসেবে গত ১৩ অক্টোবর সেরাফিন আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে গেমটির ১২৫ জন সক্রিয় ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েঞ্চারের মধ্যে সেরাফিন একজন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৫০ জনেরও অধিক ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েঞ্চারের আবির্ভাব ঘটেছে। ইউটিউবে ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েঞ্চারদের সংখ্যা এখন ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

সৃজনশীল সংস্থাগুলোর নির্মিত ডিজিটাল অবতারগুলো বড় বড় ব্র্যান্ডের অংশীদারিত্ব ও অন্যান্য লাভজনক ব্যবসাকে আকর্ষণ করছে। যুক্তরাজ্যের অনলাইন মার্কেটপ্লেস অনবে-এর মতে, ক্যালভিন ক্লাইন, প্রাডা ও অন্যান্য ফ্যাশন ব্রান্ডের প্রচার চালানো মডেল লিল মিকাইলার সোস্যাল মিডিয়ায় প্রায় ২৮ লাখ অনুসারী রয়েছে। তার প্রতিটি স্পনসরড পোস্টের ফি ৮ হাজার ৫০০ ডলার। অনবের অনুমান, লিল মিকাইলা এ বছর তার নির্মাতার জন্য প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ডলার উপার্জন করবে। 

কভিড-১৯ মহামারী আঘাত হানার আগেই বিশ্বজুড়ে ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েঞ্চারদের আধিপত্য বাড়ছিল। আর করোনাভাইরাস লকডাউনে মানব হিরোরা ঘরে বন্দি হয়ে পড়ায় এগুলোর সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই ট্রেন্ডের আসল চমক হলো জেন জেড সংস্থা। এই দলটি এ বছরের শেষ নাগাদ তাদের সদস্য সংখ্যা ২৫৬ কোটিরও বেশি হওয়ার আশা করছে। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে পুরনো সদস্যরা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপর্জন বাড়তে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বিপণনকারীদের কাছে তারা নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিপণনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পাশাপাশি এটি বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহের অন্যতম একটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। 

আপনার ফোন স্ক্রলিং করার সময় উজ্জ্বল গোলাপী চুল, বোকা বোকা হাবভাব ও স্টাইলিশ পোশাকের এমাকে দেখে আপনি সত্যিকারের মানবী ভাবতে পারেন। এর জন্য আপনাকে দায়ী করাও অনুচিত হবে। কারণ তাকে প্রকৃতপক্ষেই বাস্তবিক করে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে এডব্লিওডব্লিও-এর সৃষ্টি এমার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। স্যালভাদোর ফেরাগামো এসপিএর মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে এমার অংশীদারিত্ব, ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোর সঙ্গে সম্পাদকীয়, টিকটকের ভাইরাল চ্যালেঞ্জগুলোতে অংশ নেয়া তাকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে।

এডব্লিওডব্লিওর পরিচালক ইয়ামি অন আনজাই বলেন, আমরা যখন এমাকে তৈরি করি, তখন আমরা জাপানিদের নিয়ে বিদেশীরা যেভাবে চিন্তা করে তেমনটা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। সুতরাং এটাই ছিল তাকে তৈরির মূল ধারণা। এমা মূলত মার্কেটিং টুলের চেয়ে বরং আর্ট প্রকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল এবং স্পন্সরশিপ আকর্ষণ করার জন্যই এটা করা হয়েছিল। মার্কেটিং পরিকল্পনা বা অন্য কিছু অর্জন করতে আমরা তাকে তৈরি করিনি। আমরা কেবল ভবিষ্যতের সম্ভবনাগুলোতে বিশ্বাস করি এবং তারপর বাজারই সেটা অনুসরণ করে। 

সুপারপ্লাস্টিকের প্রতিষ্ঠাতা পল বুডনিজ বলেন, যেহেতু তারা শারীরিক ও ডিজিটাল উভয় জগতেই বাস করে, সেহেতু তাদের জগতের সীমা নেই। আমাদের সমস্ত চরিত্র সত্যিকারের পোশাক পরে, সত্যিকারের খাবার খায় ও আসল গাড়ি চালায়। সুতরাং এটা বাস্তবতা ও অতিবাস্তবতার মিশ্রণ। 

এই মিশ্রণ মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। আর এ জন্যই এগুলো অর্থোপার্জনের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ ধরনের চরিত্র সৃষ্টির জন্য সীমাহীন সম্ভাবনা রয়েছে। সৃজনশীল এই কাজের সুযোগ কেবল কম্পিউটারের সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 

ব্লুমবার্গ অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন