বুধবার | আগস্ট ০৪, ২০২১ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

গ্রামীণ রূপান্তর || সমাজ

পুরনোর বিদায় নতুনের সমাবেশ

ড. হাসান মাহমুদ

১.

‘কার্তিকের শেষ অগ্রহায়ণের শুরু। ঘরে ঘরে ধান উঠছে। অনেক রাত পর্যন্ত কারো চোখে ঘুম থাকে না। কাজ আর কাজ। সারা দিন ধান কেটে এনে পালা দিয়ে রাখে। রাতে গরু দিয়ে মাড়ায়। তারপর ঝেড়েমুছে সব পরিষ্কার করে রাখতে রাখতে অনেক রাত গড়িয়ে পড়ে। হাট থেকে বাড়ি ফিরে এসে মন্তু দেখে, উঠোনে আসর জমিয়ে বসে পুঁথি পড়ছে সুরত আলীর বড় ছেলেটা। মৃত বাবার এ গুণটি সুন্দরভাবে আয়ত্ত করেছে সে। দূর থেকে শুনলে অনেক সময় বোঝাই যায় না। মনে হয় সুরত আলী বুঝি বসে বসে পুঁথি পড়ছে।’ 

এটি জহির রায়হানের বিখ্যাত ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে বর্ণিত নাম না জানা একটা গ্রাম। প্রথম অধ্যায়ে সেই গ্রামের পরিচয় দিতে গিয়ে জহির রায়হান লিখেছেন: ‘দীঘিকে কেন্দ্র করে এই গ্রাম। 

কখন কোন যুগে পত্তন হয়েছিল এ গ্রামের, কেউ বলতে পারে না। কিন্তু এই বাড়ির পত্তন বেশি দিন আগে নয়। আশি কি খুব জোর নব্বই বছর হবে।’ —এরপর নানান চরিত্র ও তাদের যাপিত জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের চিত্তাকর্ষক বর্ণনার মধ্য দিয়ে জহির রায়হান এ উপন্যাস আমাদের সামনে একটা গ্রামীণ জীবনের ছবি তুলে ধরেছেন। সেই সমাজে সবকিছুই যেন চক্রাকারে আবর্তিত হয় গ্রামের মধ্যে পরিবার, আর পরিবারের মধ্যে ব্যক্তির জীবনকে কেন্দ্র করে। কয়েক ঘর মানুষ নিয়ে একটা বাড়ি, একজন পুরুষ প্রধান আর তার অধীনস্থ আরো কিছু পুরুষ ও নারী, কৃষিনির্ভর জীবনের টানাপড়েন, ঝড়-বাদল, রোগ-শোক, হাসি-কান্না। চরিত্রগুলো একই রকম, শুধু সেইসব চরিত্রের মধ্যে জীবনযাপন করে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ—মকবুল, টুনি বিবি, মন্তু, আম্বিয়া, সুরত আলী প্রমুখ। দিন কেটে যায় আপন গতিতে। রাতগুলোও। হাজার বছর ধরে, একইভাবে।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে এ উপন্যাসে বর্ণিত গ্রামবাংলা জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় পাঠকের চিত্তে। কৃষিভিত্তিক সমাজে অধিকাংশ মানুষই এ উপন্যাসের নানান কাহিনী প্রত্যক্ষ করেন তাদের নিজ নিজ জীবনছবি আর কল্পনায়। হয়তো এজন্যই ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। 

কিন্তু বর্তমান বাস্তবে উপন্যাসে বর্ণিত সেই গ্রামবাংলা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। কৃষিতে লাঙ্গলের বদলে ট্রাক্টর এসেছে, মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হওয়া থেমে গেছে নানা রকম ভ্যাকসিন আর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার প্রভাবে, যাতায়াতের বাহন হিসেবে নৌকার স্থলে এসেছে নানা রকম যন্ত্রচালিত বাহন, বিনোদনের জন্য পুঁথির স্থলে টেলিভিশন, সিনেমা। একইভাবে গ্রামের চেহারাও বদলে গেছে দ্রুতই। এখন বংশ পরম্পরায় একই বাড়িতে থেকে একই জমিতে আবাদ করে আর জীবন চলছে না। গ্রামের মানুষ এখন পরিবার থেকে, গ্রাম থেকে বহির্মুখী। বাচ্চারা স্কুলে-কলেজে যায়। সেখান থেকে আরো দূর-দূরান্তরে চলে যায় জীবিকার সন্ধানে। গ্রাম থেকে শহরে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায়, এমনকি অন্য দেশেও। কখনো পরিবারের পুরুষ প্রধান একাকী, কখনো পুরো পরিবারই বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে বেরিয়ে পরে নতুন গন্তব্যে।

অর্থাৎ ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে গ্রামবাংলার স্থায়ী, অনড়, অচল যে কল্পচিত্র দেখি, বাস্তবে সেই গ্রাম এখন পরিবর্তিত, যার সর্বত্র দেখা যায় সচলতা। সমাজবিজ্ঞানীরা সাধারণত গ্রামবাংলার পরিবর্তনকে বিশ্বায়নের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ঠিক কীভাবে বিশ্বায়ন বাংলাদেশের গ্রামসমাজকে বদলে দিয়েছে? এ নিবন্ধে প্রশ্নটির উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব উন্নয়নের সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে। 

বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার সময় গ্রামবাংলা ছিল সমাজের ভিত্তি—সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সব দিক থেকেই। জীবিকা উপার্জনের মূল ক্ষেত্র ছিল কৃষি। জাতীয় অর্থনীতির শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশি আসত কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক পেশা থেকে। সমাজ ছিল পরিবার ও গ্রামভিত্তিক যেখানে স্থানীয় নেতৃত্ব পরিচালনা করত সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিজীবন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল গ্রামভিত্তিক যেখানে প্রধান উপাদান ছিল গ্রাম্য মেলা, যাত্রা-সার্কাস, কাবাডি-গোল্লাছুট খেলা, ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া-জারি-সারি গান, পালা-পার্বন ইত্যাদি। 

স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সমাজে প্রথম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ঢেউ আসে সবুজ বিপ্লবের নামে, যেখানে শতবছরের পুরনো কৃষি ব্যবস্থার বদলে আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রচলন ঘটানো হয়। দেশীয় ধানের স্থলে আসে বিদেশী গবেষণাগারে উদ্ভাবিত নানা ধরনের উচ্চফলনশীল জাতের ধান। সেসবকে যথাযথভাবে ফলাতে অনিবার্যভাবে আসে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। বেড়ে যায় ধানের ফলন। কৃষকের গোলা উপচে পড়ে সোনালি ধানে। উদ্বৃত্ত সেই ধান স্থানীয় হাটবাজারে ওঠে, সেখান থেকে যায় শহরে। কৃষকের হাতে আসে কাঁচা টাকা। শ্রমিকের আয়-রোজগারও বেড়ে যায়। গ্রামে যাতায়াত ব্যবস্থার সংস্কার হয়। এক গ্রামের সঙ্গে অন্যান্য গ্রামের এবং শহরের সংযোগ বিস্তার লাভ করে। পুরনো পায়ে চলা রাস্তায় হেঁটে, খালে-বিলে নৌকায় চড়ে যাতায়াতের বদলে মানুষ নানা যন্ত্রচালিত যানবাহনে চলাচল শুরু করে। ফলে আগের গ্রাম সমাজে যেখানে মানুষের যাতায়াত ছিল মূলত নিজ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটা গ্রামে, বর্তমানে তার বিস্তার গ্রামের প্রান্ত ছাড়িয়ে শহর, এমনকি বিদেশ পর্যন্ত। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে টুনি বিবির মতো আমার দাদির সারা জীবন যেখানে সীমিত ছিল তার বাবার বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির গ্রামের মধ্যে, সেখানে এখনকার নারী অবাধে যাতায়াত করে দেশের সর্বত্র, এমনকি বিদেশেও। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখন নিজ গ্রাম ছাড়িয়ে আরো অসংখ্য গ্রাম, শহর এবং কেউ কেউ বিদেশেও পৌঁছে গেছে। 

গ্রামবাংলার এ রূপান্তর কি কোনো দৈব্য ঘটনা? 

গ্রামীণ জীবনের এ পরিবর্তন ঘটেছে মূলত গ্রামের বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তারকারী সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে, বিশেষ করে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। এর একটা প্রমাণ হলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার। সবুজ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কৃষিতে উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্কুল, জেলা-উপজেলা সদরে কলেজ। কৃষকের সন্তানদের অনেকেই মাঠে না গিয়ে যায় স্কুল-কলেজে। পড়াশোনা শেষ করে তারা চাকরি নিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়।

গ্রামের পরিবর্তন তথা উন্নয়নে রাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণের আরেকটি ক্ষেত্র হলো গণস্বাস্থ্য, যার ব্যাপক উন্নতি গ্রাম সমাজের পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। খাবার স্যালাইনের উদ্ভাবন ও বিস্তার গ্রাম থেকে কলেরা ও ডায়রিয়ার মহামারী থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। প্রাণঘাতী অন্যান্য রোগের প্রতিষেধক শিশুমৃত্যু ও প্রসূতিমৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। সেই সঙ্গে নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা ও সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা গ্রামাঞ্চল থেকে অতীতের মহামারীগুলোকে সমূলে উচ্ছেদ করে পারিবারিক জীবনে নিয়ে এসেছে স্বস্তি। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পরিবার-পরিকল্পনা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ১৯৮০-এর দশকে জন্মহার এবং সেইসঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। 

এখানে লক্ষণীয়, গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় আমি বিশেষ করে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করছি। এর কারণ হলো, সেই সময়টা ছিল সমগ্র তৃতীয় বিশ্বের জন্য উন্নয়নের যুগ। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া এসব জাতিরাষ্ট্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল—এরা সবাই অনুন্নত। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো সব ক্ষেত্রেই এসব রাষ্ট্র পশ্চিমের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর থেকে পিছিয়ে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ কতগুলো ইউরোপীয় রাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের জন্য সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নামের দুটো প্রতিষ্ঠান গঠন করে। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থসহায়তা, প্রযুক্তি এবং পরামর্শ বিদেশ থেকে এলেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করে জাতীয় সরকার। 

১৯৮০-এর দশকে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন প্রকল্পে একটা ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। মেক্সিকো থেকে শুরু করে একের পর এক উন্নয়নশীল দেশ উন্নত বিশ্ব থেকে গ্রহণ করা ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। এহেন অর্থনৈতিক দুরবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে আইএমএফ। কিন্তু সেই সহায়তা পাওয়ার জন্য আইএমএফ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়, যা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসি নামে পরিচিত। এসবের মধ্যে ছিল সরকার নানা রকম উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করবে, বিদেশে রফতানিযোগ্য কৃষিপণ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের উৎপাদনে জোর দেবে এবং সরকারের যাবতীয় ব্যয়ভার কমিয়ে আনবে। এসবের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের হাতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় নিশ্চিত করা, যা দিয়ে আইএমএফ এবং অন্যান্য বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গৃহীত ঋণ পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের উন্নয়ন (তথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো) যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল, তার স্থলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে নিয়ে আসা হলো। আইএমএফের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিশ্বব্যাংকও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে ঋণসহায়তার ক্ষেত্রে অনুরূপ শর্ত আরোপ শুরু করল, যেগুলোকে বলা হয় স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট লোন। এ দুইয়ের প্রভাবে পুরো উন্নয়ন চিন্তার মধ্যেই এ ধারণা প্রতিষ্ঠা পেল যে, উন্নয়নশীল দেশের সরকার তাদের নিজেদের জাতীয় উন্নয়ন পরিচালনায় অক্ষম এবং এজন্য বাইরে থেকে তাদের সরাসরি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করতে হবে। উন্নত দেশ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো (যথা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ) তৃতীয় বিশ্বে মাঠ পর্যায়ে নানা রকম এনজিও প্রতিষ্ঠা ও সরাসরি তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেল। ফলে দেশের সর্বত্র হাজার হাজার এনজিওর মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আবাসন ইত্যাদি উন্নয়নের কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ল। উল্লেখ্য, এসব এনজিওর মূল কর্মকাণ্ড ছিল প্রধানত গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় সরকারের কর্মসূচি বিস্তার লাভ করেনি। জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত এনজিওগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছিল ব্র্যাক, নিজেরা করি, প্রশিকা ইত্যাদি। 

১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা ঘটে সুদীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতি ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের মধ্য দিয়ে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিসরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বলয়ের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধও সমাপ্ত হলো। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করা হলো। আরো কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশকে ‘ইমার্জিং টাইগার’ বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা দেখা গেল। আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৮০-এর দশকে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটানোর ফলে একদিকে যেমন উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সঙ্গে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এক গ্রামের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গ্রামের এবং দূর-দূরান্তরে শহরের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনায়ও এসেছে মৌলিক পরিবর্তন। আর তা হলো, অর্থনৈতিক বিষয়াদির ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের তুলনায় ব্যক্তি উদ্যোক্তা অধিক কার্যকরী ও ফলপ্রসূ। 

১৯৭০ আর ১৯৮০-এর দশকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় উন্নয়ন কর্মসূচির পর্যালোচনা করে উন্নয়ন-গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা লক্ষ করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার জাতীয় স্বার্থের বদলে ক্ষমতাসীন দল/ব্যক্তির স্বার্থের প্রতি বেশ মনোযোগী। ফলে তারা নিজ নিজ দলীয়/গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক স্বার্থকে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের উপরে স্থান দেয়ায় জাতীয় উন্নয়ন বিঘ্নিত হয়। অতএব, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরকারকে শুধু সহযোগীর ভূমিকায় রেখে মূল দায়িত্ব পালনে ব্যক্তি উদ্যোক্তাকে নিয়ে আসতে হবে। এ পরিবর্তনকে মাঠ পর্যায়ে লক্ষ করা যায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যেমন সবুজ বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামাঞ্চলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কৃষকদের সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে সংগঠিত করা হতো। সমবায় সমিতির মাধ্যমে উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তার, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাপনা করা হতো। গ্রামীণ জীবনের মূল ধারাটি ছিল পারস্পরিক সহযোগিতামূলক। পাঠ্যপুস্তকে ‘দশের লাঠি, একের বোঝা’, ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’ ধরনের গল্প, প্রবন্ধ, স্লোগান ইত্যাদির প্রাধান্য ছিল।

১৯৯০ গণতন্ত্রের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গ্রহণ করা হয় নব্য-উদারনৈতিক (নিওলিবারেল) পদ্ধতি যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল নিম্নরূপ: 

ক। ব্যক্তিমালিকানা (প্রাইভেটাইজেশন): আমরা জানি স্বাধীনতার পর অনেক শিল্প-কারখানা এবং প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের মালিকানায় নেয়া হয়েছিল, যাকে জাতীয়করণ বলে অভিহিত করা হতো। এ পর্যায়ে ঘটে তার উল্টোটি, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানার শিল্প-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থা, এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয় এ বিশ্বাস থেকে যে, ব্যক্তি-মালিক সেসব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে লাভজনক করবে, ব্যক্তি-পরিচালক সেসব সংস্থাকে অধিক কার্যকরী হিসেবে পরিচালনা করবে, ব্যক্তি-মালিক প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। কারণ আমরা সবাই পরিচিত একটা কথার সঙ্গে যে, ‘সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল’। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকা কোনো কিছুর প্রতি আমরা উদাসীন। কাজেই সেসবকে ব্যক্তিমালিকানায় দিলে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে আমরা সেসবের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে আগ্রহী হব। 

খ। অর্থনীতির উদারীকরণ (ডি-রেগুলেশন): আগে জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে আর্থিক ব্যবস্থায় সরকারি এবং নানা সামাজিক নিয়মনীতি কার্যকর ছিল। যেমন সরকার জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রা বিনিময় হার, নানা রকম ট্যাক্স ইত্যাদি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত। একইভাবে স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের সমবায় ও পেশাভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থা পরিচালিত হতো। ১৯৯০ সালের পর আর্থিক ক্ষেত্রে মৌলিক কয়েকটি বিষয় রাষ্ট্রের অধীনে রেখে অধিকাংশকেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করা হয় এ বিশ্বাস থেকে যে, কোনো বাইরের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মুক্তবাজারে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর্থিক খাতের সর্বোত্কৃষ্ট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে। কারণ বাজারে পণ্য সরবরাহকারী যেমন সর্বোচ্চ মূল্য পেতে চাইবে, একইভাবে ভোক্তাও সর্বনিম্ন দামে পণ্য কিনতে চাইবে। ফলে সরকার বা অন্য কোনো কায়েমি স্বার্থের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মুক্তবাজার ব্যক্তি উদ্যোক্তা এবং ব্যক্তি-ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। 

গ। অবাধ/মুক্ত বাণিজ্য (ফ্রি ট্রেড): মুক্তবাজার নীতি গ্রহণের ফলে একদিকে যেমন চাহিদা-জোগানের প্রক্রিয়াকে সরকার ও অন্যান্য স্বার্থগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করা হয়, একই সঙ্গে ব্যক্তি উদ্যোক্তাকেও নিজ নিজ সামর্থ্য ও ইচ্ছা অনুযায়ী উৎপাদনে আগ্রহী করা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ দান করা হয়। ফলে বাণিজ্য তথা পণ্যের উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন ও ভোগ নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যক্তির স্বার্থ অনুযায়ী। যে ব্যক্তি যে পণ্য উৎপাদনে দক্ষ, যে অঞ্চল বা দেশ যে পণ্য উৎপাদনে দক্ষ, সে সেই পণ্যের উৎপাদনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। বাজার মুক্ত থাকায় তারা নিজ নিজ পণ্য ব্যাজারে বিক্রি করে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে নিতে পারে। এভাবে মুক্তবাজার ব্যক্তির সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগ, প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক কার্যকরী পরিচালনা নিশ্চিত করে।

ঘ। সরকারি খাতে ব্যয়সংকোচন (রিডিউসিং পাবলিক এক্সপেনডিচার): নানান সরকারি খাতে ক্রমাগতভাবে বাজেট কমিয়ে একদিকে সরকারের ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে বিদেশী ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং আরেকদিকে সরকারের বদলে ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের সেসব খাতে পরিচালনার আসনে বসানো হলো এই বিশ্বাস থেকে যে, তারা আধিক্য ফলপ্রসূভাবে পরিচালনা করবে। যেমন শিক্ষা খাতে সরকারের পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে নানান এনজিওর মাধ্যমে নন-ফরমাল শিক্ষার প্রচলন করা হয়, যেগুলো ‘ব্যাক স্কুল’ নামে পরিচিতি পায়। শিক্ষার উচ্চস্তরে দেখা যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। এর ফলে সেবার মান ও বণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও বেসরকারি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা আর সব খাতের পরিষেবা পাওয়ার জন্য জনগণকে অধিক দাম পরিশোধ করতে হয়, যা বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন হয়ে অনেক সময় তাদের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে যায়। 

ঙ। জনসেবার সংকোচন (ইলিমিনেশন অব দ্য পাবলিক গুড): নব্য উদারনীতি আর্থিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণকে কমিয়ে ব্যয়সংকোচন এবং সেইসঙ্গে ব্যক্তি উদ্যোগকে উৎসাহী করার প্রক্রিয়ায় নানা রকম জনসেবাকে কমাতে কমাতে নির্মূল করে ফেলে সেখানে ব্যক্তিমালিকানার প্রতিষ্ঠা করে। যেমন স্বাস্থ্য খাতে সরকারি হাসপাতালগুলোয় বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকমুখী করে, সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষাসেবার মানোন্নয়ন না করে এবং পরিসর অপ্রতুল করে বেসরকারি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারের বিকাশে সহায়তা করে। একইভাবে অন্যান্য জনসেবা খাতেও অনুরূপ পরিবর্তন লক্ষণীয়।

বিশ্বায়ন এবং তার ফলে বাংলার গ্রামীণ জনজীবন কীভাবে বদলে গেল, তা বুঝতে হলে উপরে উল্লিখিত নব্য উদারনৈতিক (নিওলিবারেল) বিশ্বব্যবস্থার মূলনীতিগুলো এবং জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাবের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিজীবনের পরিবর্তনগুলো পাঠ করতে হবে।

১৯৯০ সালে গ্রামীণ জীবনে সূচিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে নারীশিক্ষা এবং গ্রাম থেকে শহরে নারীদের অভিবাসনের মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিবর্তনের রূপরেখা অবলোকন করা যায়। জাতীয় উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল স্টাইপেন্ড প্রজেক্ট শুরু করা হয়েছিল। এ প্রকল্পের আওতায় স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের নগদ আর্থিক সহায়তা দেয়া হতো। বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণকে সফল উন্নয়নের জন্য আবশ্যিক হিসেবে চিহ্নিত করার তাত্ত্বিক ভিতের ওপর এ প্রকল্প চালু করা হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশগুলোয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের পিছিয়ে থাকার জন্য দারিদ্র্য, অশিক্ষা, পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, বাল্যবিবাহ প্রভৃতিকে চিহ্নিত করা হয়। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নারীশিক্ষাকে যথাযথ উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয় এ বিশ্বাস থেকে যে, এর ফলে একদিকে প্রধানত দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বোঝা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজ প্রথমত মেয়েদের শিক্ষিত করবে, বাল্যবিয়ে পরিত্যাগ করবে এবং মেয়েদের ঘরের বাইরে আয়-উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার সুযোগ দেবে। ফলে নারী সমাজের ক্ষমতায়ন ঘটবে এবং তারা নিজ নিজ সম্ভাবনা ও সক্ষমতা অনুযায়ী সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। 

১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এই ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল স্টাইপেন্ড প্রজেক্ট আরো বিস্তৃত আকারে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি এ উদ্যোগের পাশাপাশি এনজিওগুলোর মাধ্যমে বিদেশী দাতা সংস্থাগুলোর আর্থিক সহায়তায় প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হয় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম, যেখানে শিশুরা প্রাথমিক পাঠাদান সম্পন্ন করে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। শিক্ষায় নারীকে প্রাধান্য দেয়ার এ প্রকল্পের প্রধানতম ফলাফল দেখা যায় অধিক হারে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি ও উপস্থিতির মধ্যে। ১৯৮০-এর দশকে যেখানে গ্রামের স্কুলগুলোয় শতকরা ২০ ভাগেরও কম ছিল ছাত্রীদের সংখ্যা, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি তা প্রায় পুরুষদের সমান হয়ে দাঁড়ায়। নারীশিক্ষার অন্যান্য সুফল দেখা যায় পরিবার পরিকল্পনার বিস্তার, গণস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি, রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীর ক্রমবর্ধমান হারে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যে। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে বর্ণিত অবলা-অশিক্ষিত-পুরুষ শাসিত পল্লীবধূ পরিবর্তিত হয়ে গড়ে ওঠে শিক্ষিত নারী—মা, কন্যা, স্ত্রী হিসেবে। তবে আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে পরিবারের দারিদ্র্য কমানো এবং স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করতে সফল হলেও এ প্রকল্পে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে না পারায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে না পারায় অধিকাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে অংশ নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায় গ্রামাঞ্চল থেকে নারীদের শহরাঞ্চল অভিমুখে যাত্রায়। 

উল্লিখিত উপন্যাসে টুনি বিবির মতো বা আমার দাদি-নানিদের সময়কার গ্রামীণ সমাজের নারীদের জীবন সাধারণত কেটে যেত নিজ গ্রাম এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের চৌহদ্দিতে। কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করা আধুনিক নারীদের জীবন নানা আর্থিক ও সামাজিক কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হয়েছে। একদিকে শিক্ষিত নারী নিজের সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হয়েছে, আরেকদিকে আর্থিক উপার্জন ক্ষমতা এবং তার মাধ্যমে পরিবারের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত হওয়ার জ্ঞান ও উৎসাহ পেয়েছে। ফলে তারা গ্রাম ছেড়ে মূলত শহরাঞ্চলে চলে যায় জীবিকার সন্ধানে। এ প্রবণতা সব থেকে বেশি লক্ষণীয় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা গার্মেন্ট শিল্পে। 

১৯৭০-এর দশকে শুরু হলেও ১৯৯০-এর দশকে সে গার্মেন্ট শিল্প বিকশিত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুসারে, বর্তমানে এ শিল্পে কর্মরত আছে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যার ৮৫ শতাংশই নারী শ্রমিক। বাংলাদেশের জাতীয় রফতানি আয়ের প্রধান খাত এ গার্মেন্ট শিল্প, যেখানে গত বছর আয় হয়েছে ৩০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, জাতীয় আয়ের ৫৬ শতাংশ আসে সেবা খাত থেকে, ২৮ শতাংশ আসে শিল্প খাত থেকে আর মাত্র ১৫ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। আবার এ শিল্প খাতের সিংহ ভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অর্থাৎ বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া কীভাবে বাংলাদেশে শিল্পোন্নয়নে, তথা জাতীয় উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে, তা বাংলাদেশে নারীশিক্ষার প্রসার এবং গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। 

গার্মেন্ট খাতসহ অন্যান্য শিল্প এবং সেবা খাতের উন্নয়ন বাংলাদেশে সামগ্রিক উন্নয়নের বাস্তবিক প্রমাণ। সাধারণভাবে উন্নয়নকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করি। তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও জাতীয় উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। এক্ষেত্রে সরকার যেমন বিদেশী দাতা সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সহায়তা পেয়ে থাকে, একই সঙ্গে এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। আবার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে নির্বাচনে জেতার পর সেসব বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে জনসমর্থন হারিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। মোট কথা, উন্নয়নের ডামাডোলের মধ্য দিয়ে আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। 

৫ 

গ্রামীণ সমাজ বদলে গেছে এবং এ পরিবর্তনের ধারা গ্রামাঞ্চলের ক্রমাগত নানা ক্ষেত্রে পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুনের সমাবেশ ঘটাচ্ছে। জীবিকার প্রধান উপায় এখনো কৃষিকাজ এবং এ-সংশ্লিষ্ট পেশাগুলো থাকলেও পাশাপাশি নানা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে, সেসবে উল্লেখযোগ্য হারে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জন্মহার ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে এবং পরিবারের আকার ছোট হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কগুলোতেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। আগের মতো কয়েক প্রজন্মের সম্মিলনে যৌথ পরিবারের স্থলে স্বামী-স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে একক পরিবারের প্রসার ঘটছে। একইভাবে দেখা যাচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন ইত্যাদিতে আগের মতো যৌথ কাঠামো ও অংশগ্রহণের স্থলে এখন ব্যক্তি উদ্যোগের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের কাঁধ থেকে দায়দায়িত্ব নেমে গিয়ে পরিবার ও ব্যক্তির ওপর পড়ছে। পরিবর্তনের এ ধারা সাধারণভাবে জনগণের সাগ্রহ অংশগ্রহণের মূলে রয়েছে জীবনযাত্রার মানের উন্নতির আকাঙ্ক্ষা। কাজেই গ্রামাঞ্চলের পরিবর্তন ভালো কি মন্দ সেই বিচার করতে গেলে আমাদের শুধু জিডিপির আকার দেখলে চলবে না। বরং আমাদেরকে ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনে সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে কিনা তা জানতে হবে। 

বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারায় চলছে যা, ক্রমবর্ধমান জিডিপি হারের মধ্যে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। কিন্তু সম্প্রতি একটি সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের প্রকৃত গড় মাথাপিছু আয় ও খাবার গ্রহণের পরিমাণ দুই-ই কমেছে। আর নির্দিষ্ট খাতের লোকজনের অবস্থা বিবেচনা করলে তো উন্নয়নের বাস্তবতার আরো ভয়াবহ করুণ রূপ দেখা যায়। যেমন পোশাক শিল্পের দেড় হাজার কারখানার শ্রমিকের ওপর জরিপ চালিয়ে অক্সফাম দেখতে পেয়েছে, প্রত্যেক শ্রমিকের আয় তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত। অর্থের অভাবে প্রায়ই আধপেটা খেয়ে, স্বল্প মূল্যের অপথ্য-কুপথ্য খেয়ে দিন গুজরান করতে হয় বিধায় তৈরি পোশাক কর্মী নারীদের শতকরা আশি ভাগই অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভোগেন বলে আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় দেখা গেছে। অথচ এ তৈরি পোশাক শিল্প দেশের উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তার দাবির ভিত্তিতে সরকার তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের জন্য রফতানিতে ভর্তুকি বাবদ চলতি বাজেটে বরাদ্দ দিয়েছে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, যা দিয়ে সব তৈরি পোশাক কর্মীর জন্য বছরব্যাপী পর্যাপ্ত পুষ্টি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব। অর্থাৎ গার্মেন্ট শিল্প বিকাশের মাধ্যমে যে আর্থিক উন্নতি হয়েছে, তা থেকে মালিকপক্ষের প্রভূত সম্পদবৃদ্ধি হলেও শ্রমিকের কপালে ন্যায্য হিস্যা জোটেনি। ফলে তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন অধরাই থেকে গেছে। 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনগুলোর পেছনে মূল কারণ বিশ্বব্যাপী চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে তার নব্য উদারনৈতিক ব্যবস্থা, গন্তব্য যেখানে সামাজিক গোষ্ঠীর বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। উন্নয়ন কর্মসূচির প্রত্যক্ষ প্রভাবেই গ্রামাঞ্চলে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যেমন নারীশিক্ষার প্রসার, কৃষিনির্ভরতা হ্রাস এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যান্য খাতের বিকাশ, জনসংখ্যাবৃদ্ধি হ্রাস এবং পরিবার কাঠামোয় পরিবর্তন, গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর এবং ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর ইত্যাদি। এসব পরিবর্তনকে মোটা দাগে উন্নয়ন সূচকের মধ্যে বিবেচনা করে গ্রামীণ সমাজের সার্বিক উন্নতি হয়েছে দাবি করা হলেও মানুষের যাপিত জীবনের বাস্তবতায় এ দাবির পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ব্যক্তি ও পরিবারের দিকে তাকালে দেখা যায় জীবনযাত্রার মানের স্থবিরতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রমাবনতি। 

কোনো ব্যক্তি উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জন করলে আমরা তাকে যেমন প্রশংসায় ভাসিয়ে দিই, আবার সে ব্যর্থ হলেও তাকেই দোষারোপ করি। একইভাবে সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে কোনো পেশা, গোষ্ঠী বা দলের মধ্যে সাফল্য লক্ষ করে আমরা তাদের যেমন প্রশংসা করি, আবার তাদের মধ্যে ব্যর্থতা লক্ষ করে সমালোচনাও করি। কিন্তু এই যে সাফল্য আর ব্যর্থতা, এর মধ্যে ব্যক্তিগত প্রয়াসের পাশাপাশি সমাজের ভূমিকাও লক্ষণীয়। ফলে গ্রামীণ সামাজিক পরিবর্তনগুলোর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর স্বীকৃতি এবং নেতিবাচক পরিবর্তনগুরোর দায় ব্যক্তির সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের। 

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ক্রমে বদলে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনগুলো কোনো অমোঘ শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিছু নয়। বরং রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃস্থানীয়দের মাধ্যমে পরিচালিত জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ফল।


ড. হাসান মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন