বুধবার | আগস্ট ০৪, ২০২১ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

গ্রামীণ রূপান্তর || সমাজ

গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো: সম্পদভিত্তিক স্তরবিন্যাস

ড. আবুল হোসেন

বাংলাদেশের গ্রাম ও গ্রামীণ সমাজকে বোঝার জন্য গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো ‘ক্ষমতা’র প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় ধারণার ওপরই প্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতা কিংবা ক্ষমতাকাঠামো কোনো স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় প্রত্যয় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজকে ক্ষমতার কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা সমস্যাজনক। মোগল ও নবাবি আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশেও গত অর্ধশতকে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চর্চা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়েছে। এ লেখায় গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো, ক্ষমতার উপাদান, বৈশিষ্ট্য ও অনুশীলনের রূপান্তরকে প্রাক-ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধারাবাহিক পরিক্রমায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। 

‘ক্ষমতা’ এমন একটি প্রত্যয়, যেটি ধারণাগতভাবে যেমন পরিবর্তিত হয়, তেমনি ব্যবহারিকভাবেও প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। ক্ষমতা প্রত্যয়টি দ্বারা খুব সাধারণ অর্থে কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সামর্থ্যকে বোঝায়। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানে বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানে বিভিন্ন তাত্ত্বিকরা ক্ষমতাকে অনেকভাবে উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে প্রভাবশালী দুটি ধারা আমরা এখানে উল্লেখ করছি। একটি ধারায় ক্ষমতাকে দেখা হয় সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার দমনমূলক, নিপীড়নমূলক ও শোষণমূলক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। এটা ক্ষমতার আধিপত্যশীল ধারণা। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজে প্রভাবশালী শ্রেণী (ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান) দুর্বলদের ওপরে আধিপত্য টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়ার নাম ক্ষমতা। এটি ক্ষমতার মার্ক্সীয় ধারা হিসেবে পরিচিত। অন্য ধারায় ক্ষমতাকে দেখা হয় কর্তৃত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে। এখানে ক্ষমতাকে অনেকটা বৈধতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখা হয়। যে বৈধতা তৈরি হয় ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, সামাজিক মর্যাদা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও পদের ক্রমোচ্চতার মতো বহুমুখী বিষয়ের ওপর। এটা ক্ষমতার ওয়েবারীয় ধারা। ক্ষমতা ও ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কিত এ দুটি প্রভাবশালী ধারা অনুসরণে এ লেখায় আমরা বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর রূপান্তরকে ব্যাখ্যা করেছি।

ব্রিটিশ আমল

১৭৬৩ সালে মীর কাশেমের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা অঞ্চলে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত হয়। গ্রামীণ পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকার কারণে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রশাসক ও প্রতিনিধিদের প্রভাব বিস্তৃত ছিল না। কিন্তু ১৭৯০ সাল থেকে ১৭৯৩ সময়ে লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে কাঠামোগতভাবে গ্রামীণ সমাজে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও আধিপত্য কেন্দ্রীয়ভাবে পাকাপোক্ত হয়। গ্রামীণ এলাকা পর্যন্ত তাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এ সংস্কারের দুটি প্রধান দিকের একটি ছিল ১৭৯২ সালে দারোগা পদ্ধতির প্রবর্তন, অন্যটি ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা ব্রিটিশ শাসকদের আদলে জমিদারি ব্যবস্থার গোড়াপত্তন। দারোগা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে মোগল আমলের চৌকিদারদের স্বাধীন সত্তা থেকে দারোগাদের অধীন করে দেয়া হয়। চৌকিদাররা হয়ে পড়ে দারোগাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম। মূলত স্থানীয় পর্যায়ে খাজনা আদায়, ব্রিটিশদের প্রবর্তিত বিভিন্ন নিয়মের বাস্তবায়ন, জমিদারদের স্বার্থ সুরক্ষায় দারোগারা ব্যবহূত হতো। অন্যদিকে জমিদাররাও যদি ব্রিটিশ স্বার্থবিরোধী কোনো উদ্যোগ নিত বা ব্রিটিশদের কোনো নিয়ম পালনে অনাগ্রহ দেখাত, তখন দারোগারা তাদের ওপরেও নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করত। সর্বোপরি বলা যায়, দারোগা ব্যবস্থা ব্রিটিশ শাসন পাকাপোক্ত রাখার স্থানীয় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরোনো জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে দেয়া হয়। শুরু হয় ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন এক ধরনের জমিদার শ্রেণী তৈরির প্রক্রিয়া। যাদের মাধ্যমে ব্রিটিশদের খাজনা আদায় নিশ্চিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ মোগল আমলে জমিদার ও গ্রামীণ সমাজ যেভাবে একসঙ্গে পরস্পরের সহযোগী হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল, তার বিপরীতে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি ব্যবস্থা স্থানীয় মানুষদের নিয়ন্ত্রণ ও দমনে একটা নতুন শ্রেণী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এ সময় পর্যন্ত গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় স্থানিক মানুষদের ভূমিকাকে গৌণ করে রাখা হয়। যদিও ১৮৭০ সালে চৌকিদারি অ্যাক্ট নামে পুরোনো পঞ্চায়েত প্রথাকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। কিন্তু নতুন এ পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল ব্রিটিশ প্রশাসকদের আরোপিত। এ সময় সমাজের মানুষেরা মিলেমিশে পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে পারত না। ব্রিটিশ প্রশাসকদের মনোনয়নের মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন এ পঞ্চায়েত গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় ব্রিটিশ আশীর্বাদপুষ্ট একটা শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেল। ১৮৮২ সালে লর্ড রিপন স্থানিক ক্ষমতা কাঠামোয় ব্রিটিশ মনোনীত পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করলেন। তিনি পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সংস্কার করে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের স্থানীয় পর্যায়ে ‘লোকাল বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তাদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নির্ধারণ শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে এখনো লর্ড রিপন প্রবর্তিত স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে। 

পাকিস্তান আমল

পাকিস্তান আমলের শুরু থেকে ব্রিটিশ প্রভাবিত ব্যবস্থায়ই স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো চলমান ছিল। ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ জারি করেন। এ আদেশের অধীনে ১৯৬০ সালে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ কাঠামোর সবচেয়ে নিচের স্তর ছিল ইউনিয়ন। প্রতিটি ইউনিয়নে নয়জন মৌলিক গণতন্ত্রী জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতো। পাশাপাশি মনোনীত হতো চারজন। এ নির্বাচিত নয়জন ও মনোনীত চারজন ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচন করত। গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রভাবক হিসেবে টাকাপয়সা ও পেশিশক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। যার বেশি টাকা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল তারাই নির্বাচিত হতো। এর পাশাপাশি মুসলিম লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল। কেননা তখন মৌলিক গণতন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত অধিকাংশই মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। আইয়ুব খানের উন্নয়ন মডেলের অংশ হিসেবে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ এরা নিজেরা ভোগ করত বলে প্রচলিত আছে। অর্থাৎ মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় কেন্দ্রীয় রাজনীতিকে সম্পৃক্ত করে দেয়। গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর স্বাধীন ও স্থানিক সৌন্দর্য কেন্দ্রীয় রাজনীতি প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো

যদিও এ লেখাটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর রূপান্তর বিষয়ে। কিন্তু শুধু ১৯৭১ সাল-পরবর্তী আলোচনা বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো বোঝার জন্য খণ্ডিত হয়ে যেত। সংগত কারণেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর রূপান্তর প্রক্রিয়া আলোচনার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পর্বকে এ লেখায় উল্লেখ করা হচ্ছে। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ এ যুদ্ধে গ্রামীণ অর্থনীতি ও অবকাঠামো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানিক ক্ষমতাকাঠামোয় আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। কেননা তখন বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অনেক স্থানে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম লীগের অনুসারীরা ক্ষমতাবান ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এদের অনেকেই চূড়ান্তভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে, অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউ কেউ নিজ এলাকা থেকে পলায়ন করে অন্য এলাকায় আশ্রয় নেয় আবার অনেকে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আপসের মাধ্যমে কোনোভাবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় দাপট দেখাতে শুরু করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশে পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশ ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে সাহায্য আসতে শুরু করে। গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ সহযোগিতা পৌঁছে দেয়ার জন্য ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক মনোনীত স্থানিক পর্যায়ে ‘রিলিফ চেয়ারম্যান’ নিয়োগ দেয়া হয়। ক্ষমতার ছায়াতলে বসে এদের অনেকেই ত্রাণসামগ্রী আত্মসাতের মাধ্যমে নিজেরা অর্থনৈতিকভাবে ফুলেফেঁপে ওঠে। তৈরি হয় রাজনৈতিক আশ্রয়ে স্থানিক ক্ষমতাকাঠামোর নতুন শ্রেণী। এদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষের সমর্থন থেকে দূরে ছিল। একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এসব রিলিফ চেয়ারম্যানের প্রায় সবাই অংশগ্রহণ করে অধিকাংশ পরাজিত হয়। রিলিফ চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার বিচার-সালিস, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততাই মুখ্য হয়ে ওঠে।

১৯৭০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে এ ধারায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় ভূমির মালিকানা, বংশীয় পরিচিতি, জ্ঞাতিসম্পর্ক, পারিবারিক ঐতিহ্য প্রভৃতি নির্ধারক আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। সারা দেশে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে স্থানিকভাবে বড় বড় জমি মালিকের কদর বেড়ে যায়। গ্রামের সব মানুষই তাদের সম্মান করত। তুলনামূলকভাবে কম জমির মালিক ও ভূমিহীন মানুষরা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ওপর নির্ভর করত। অর্থাৎ এ সময়ে জমির মালিকানা ক্ষমতাকাঠামোয় সবচেয়ে প্রভাবশালী অনুষঙ্গ হয়ে যায়। স্থানিক দরিদ্র মানুষের একটা বড় অংশ নিজেদের জীবন ধারণের নিশ্চয়তা বিধানে এসব ভূমি মালিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। 

১৯৮০-এর দশকে এসে গ্রামীণ ক্ষমতার নির্ধারক হিসেবে ভূমি মালিকানার পাশাপাশি শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান, নগদ অর্থ, কৃষির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয় সামনে চলে আসে। এ সময় গ্রামীণ সমাজে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের পাশাপাশি মসজিদের ইমামরা অনেক বেশি সম্মানিত ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রক্রিয়াও আশির দশকে গতি পায়। যে পরিবারগুলোর কোনো সদস্য বিদেশে অবস্থান করত, তারাও তখন স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার নিয়ামক হয়ে ওঠে। কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের কারণে কৃষি প্রযুক্তির মালিকানা, সার ও উচ্চফলনশীল বীজের ডিলার, সেচের ওপর নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোও এ সময়ে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। যদিও নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ক্ষমতাকাঠামোয় এসব উপাদানের গুরুত্ব কমতে থাকে। উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১৯৮২ সালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়। ১৯৮৪ সালে উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯০ সালকে অনেকেই বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এ সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও ক্ষমতাবান ছিল বলেও অনেকে মনে করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারার কারণে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এর সুফল তখন বিস্তৃত ছিল। 

সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে দাতা দেশ ও সংস্থার কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধীরগতির পরিপ্রেক্ষিতে আশির দশকে বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রভৃতি বিষয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা তথা এনজিওর ভূমিকা বিস্তৃত হতে থাকে। এ সময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক এনজিও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত তাদের কাজ বিস্তৃত করে। অনেক এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। নারীদের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার প্রতি গুরুত্বারোপের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নের পথকে এ সময় সুগম করা হয়। এসব ধারাবাহিক উদ্যোগের সফলতা সামনে আসতে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকে। এনজিওর সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্থানীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ১৯৯৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারীরা সরাসরি অংশ নেয়। 

১৯৯০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, সরকারি চাকরি, ব্যাংকে চাকরি, ওকালতি, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অভিবাসন, পাকা বাড়ি প্রভৃতি বিষয় গ্রামীণ ক্ষমতার নির্ধারক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে সত্তর ও আশির দশকে অনেকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শহরে নতুন নতুন ব্যবসার উদ্যোগ নিয়েছিল। এদের অনেকেই নব্বইয়ের দশকে নিজেদের ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ধনিক শ্রেণীতে পরিণত হয়। যাদের প্রভাব গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় এ সময়ে দৃশ্যমান হয়।

২০০০ সালের শুরু থেকে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোতে ক্ষমতার প্রভাবক হিসেবে জমির মালিকানার গুরুত্ব কমতে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য, নগদ অর্থ, সামাজিক পুঁজি, শহরে বাড়ির মালিকানা বা স্থায়ী নিবাস, অনুদান প্রদানের সক্ষমতা প্রভৃতি বিষয় গ্রামীণ ক্ষমতার উপাদান হিসেবে এ সময় ক্রিয়াশীল ছিল। পাশাপাশি টেলিভিশন, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ডিভাইসের মালিকানা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিও স্থানিক পর্যায়ে প্রভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখত। এ সময় গ্রাম ও শহরের মধ্যে দূরত্ব ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় কেন্দ্রের প্রভাব পড়তে শুরু করলেও গ্রামীণ পর্যায়ে বিচার-সালিস, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান, স্থানীয়ভাবে মানুষের নিরাপত্তা বিধান প্রভৃতি বিষয়ে গ্রাম-সমাজ যথেষ্টই ক্রিয়াশীল ছিল। প্রায় দুই দশকে এনজিওগুলোর ব্যাপক কার্যক্রমের সুফল হিসেবে এ সময় নারীসহ নতুন এক শ্রেণীর মানুষের ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে পারিবারিক ঐতিহ্য, জমির মালিকানা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বিবেচনায় যারা কয়েক বছর আগেও গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় পিছিয়ে ছিল, তারা এ সময়ে ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হিসেবে ক্রিয়াশীল হয়। ২০০০ সালের পর থেকে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় অপেক্ষাকৃত তরুণ ও যুবক বয়সীদের নেতৃত্বে আসার প্রবণতাও শুরু হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময় (ডিসেম্বর ২০০৮) পর্যন্ত গ্রামীণ বাংলাদেশ ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে ক্ষমতাকাঠামোর এ ধারা মোটামুটি চলমান ছিল। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা মানুষের সেবক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে অধিক মনোযোগী থাকত। অর্থাৎ নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করত যেন বিশেষ কোনো ব্যক্তি, দল বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সবার কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক কর্মকাণ্ডে সব সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করত যেন পরবর্তী নির্বাচনে সাধারণ মানুষের আস্থা তাদের ওপর থাকে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সামগ্রিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ও তাদের কর্মকাণ্ড গত দশকেও অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল। অর্থাৎ ২০০৮ সালের শেষ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো অনেকটা স্বাধীন ও কেন্দ্রীয় প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করেছে। গ্রাম পর্যায়ে ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ, চর্চা ও অনুশীলনে গ্রাম সমাজের প্রভাব দৃশ্যমান ছিল।

২০০৯ সাল থেকে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোয় কেন্দ্রীয় রাজনীতি ও শাসনের প্রভাব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ততা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সখ্যতা, সন্ত্রাস সৃষ্টির সামর্থ্য, পেশিশক্তি, পরিবারের কোনো সদস্যের পুলিশ বা প্রশাসনিক ক্যাডারে চাকরি প্রভৃতি বিষয় গ্রামীণ সমাজে ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাবক হিসেবে সামনে চলে আসে। গ্রামের সাধারণ বাসিন্দাদের মতামত, ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও সম্পৃক্ততার বিষয়টি গৌণ হতে শুরু করে। 

২০১৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো তাদের স্থানীয় সাংসদ বা সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ঠিক করা শুরু করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দলগুলোর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের অনেক নেতাও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণে যুক্ত হয়। এসব নেতার কাছে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও জনগণের পছন্দের মানুষের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তি আনুগত্য গুরুত্ব পেতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত দলীয় নেতার ব্যক্তিগত ‘পছন্দ-অপছন্দ’। বিভিন্ন স্থানে দলীয় ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে যারা সর্বমহলে জনপ্রিয় ও ক্ষমতাবান ছিল, তারা ক্রমান্বয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে থাকে। ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ামক হয়ে ওঠে। প্রার্থীরা জনগণের প্রার্থীর পরিবর্তে হয়ে ওঠেন দলীয় প্রার্থী। গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। গ্রাম-সমাজের দীর্ঘ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে শুরু হয়। মানুষের প্রয়োজন, সেবা ও উন্নয়নের চেয়ে দলীয় আনুগত্য, দলের গুণগান, দলীয় নেতাদের প্রশংসার স্তুতি হয়ে পড়ে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় ক্ষমতাবান হওয়ার নিয়ামক। স্থানীয় মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিস্থাপিত হয়ে পড়ে দলের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশের ‘অদৃশ্য’ প্রতিযোগিতায়। 

বর্তমান বাংলাদেশে চলছে ‘দ্বি-দলীয়’ রাজনৈতিক মেরুকরণ। এ দুই মেরুর যেকোনো একটির সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা সম্পৃক্ততার বাইরে মনে হয় আজকে গ্রাম সমাজ বা আলাদা করে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো বলতে কিছু নেই। সর্বোপরি বলা যায়, ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো ছিল অনেক বেশি স্থানিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও প্রথম চার দশকে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোতে জমির মালিকানা, বংশগত ধারা, শিক্ষা, ধর্ম, পেশা, জ্ঞাতিসম্পর্ক প্রভৃতি বিষয় নিয়ামক ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে যা পরিবর্তিত হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদভিত্তিক বিভিন্ন স্তরবিন্যাসের আলোকে ক্রিয়াশীল রয়েছে।


ড. আবুল হোসেন: গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন