বুধবার | আগস্ট ০৪, ২০২১ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

গ্রামীণ রূপান্তর || সমাজ

রদ বদলের শেকড়

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

তত্ত্বকথা থেকে কল্পলোক আর বাস্তব জীবনের অনুরণনে মিলেমিশে একাকার একটি শব্দবন্ধ ‘সংস্কৃতি’। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক, নৃবিজ্ঞানী কিংবা ইতিহাসবিদ প্রত্যেকের কাছে এর রয়েছে আলাদা ভাবার্থ। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক লুই বিনফোর্ডের দেয়া চিরচেনা সেই তত্ত্বচিন্তার বাস্তব প্রয়োগ আমরা খুঁজে পাই বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির রূপান্তরে। ‘সংস্কৃতি যেখানে অভিযোজনের দেহাতিরিক্ত মাধ্যম’ বাংলাদেশের গ্রামগুলোর অভিযোজনে পরিবেশ, জীবনযাত্রা আর রেমিট্যান্সের অর্থযোগ প্রতি পদে জোগান দিচ্ছে স্বতন্ত্র এক সত্তার। 

সাংস্কৃতিক বিকাশে একেবারে শুরুর গল্পটার সঙ্গে মেলানো যায় আমাদের গ্রামকে। যেখানে গ্রামের এ সংস্কৃতি তার পরিবেশে প্রাপ্ত সব সুবিধাকে সামনে রেখে লভ্য উপরিগুলোর যোগসাজশে সাজিয়েছে পরিবর্তনের পসরা। পাথর যুগে বাংলার মানুষের কাছে পাহাড়ই যেখানে ছিল না, সেখানে তাদের করণীয় কী? তারা কি থেমে থেকেছে? অবশ্যই না। তাদের সংস্কৃতির প্রথম ও প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যকে এজন্যই গতিশীলতা বলে চিহ্নিত করা যায়। কারণ তারা পাথরের বিকল্প হিসেবে তুলে নিয়েছিল ফসিল কাঠ। 

অশ্মীভূত কাঠের ‘সিলফিকেশন প্রসেস’ শুনতে যতটা না কাঠখোট্টা লাগে তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হয়তো তার থেকেও ঢের কঠিন। তবে গত চার দশকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস বদলে আমাদের গ্রামগুলোর অবস্থান নিয়ে পর্যালোচনা করতে গেলে বিস্ময়ের পারদ তার থেকেও কিছুটা উপরে উঠে জ্বরে ডিগ্রিতে একশ চার ছুঁইছুঁই।

শিল্প বাণিজ্য আর অর্থনীতি। সব রদবদলের শেকড় তবে কি এ তিনটি পদের গহিনে গ্রথিত? নাকি অন্য কোথাও? যদি হয় সেটাই না কী? এমন অতশত প্রশ্ন না ঠুকে সহজভাবে একটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক। আমাদের দেখা গ্রাম সত্যিই তেমনটি নেই, কারণ অভিযোজনের নামে সংস্কৃতি হয়ে সেখানে ঢুকে গেছে অনেক অনেক কিছু। তালিকা ধরে নাম বলাটা কঠিন। তবে বর্ণনা করতে শুরু করলে পাতার পর পাতা ছড়িয়ে বিস্তৃত একটা খেরোখাতার জন্ম দেবে নিঃসন্দেহে। 

গ্রামবাংলার বদলের শেকড় সন্ধান করতে গেলে শুরুটা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময়। এর ফলে তখনকার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যে প্রকাশ্য ফাটল সৃষ্টি হয় তার ধারাবাহিকতা লক্ষ করা গিয়েছে গত চার দশকেও। সরাসরি উদাহরণ দেয়া কষ্টকর হলেও গভীর পর্যবেক্ষণে এই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার দাবি রাখে। 

একপেশে ইতিহাস হয়তো দুই-চার লাইনে একটা কথা লিখেই তার দায় শেষ করবে যে ‘পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বাংলার ভদ্রলোকগণ বঙ্গভঙ্গের কারণে অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ বঙ্গভঙ্গ তাদের অর্থনৈতিক ও পেশাভিত্তিক স্বার্থের পরিপন্থী ছিল’। তবে এ কথাটি নিয়ে দুবার ভাবনার আগেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে কারা এই কথিত ভদ্রলোক যাদের এতটা দায় ঠেকে গেল যে তাদের নেতৃত্বেই স্বদেশী আন্দোলন পরিচালিত হবে। 

নিজ দেশের নয় বরং প্রতিবেশী দেশের বাংলা চ্যানেলে প্রদর্শিত সিরিয়াল অভিনেত্রীর পরনের পোশাকে নিজেকে সাজাতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন এ দেশের অনেক তরুণী, সংসার ভেঙেছে অনেকের, এমনকি কেউ কেউ হারিয়েছেন বাসার কাজের বুয়া। চিল কিংবা কাক বাংলার অনেক পরিচিত পাখি হলেও এখনকার সংস্কৃতিতে কাকে কী করতে গিয়ে কাক হারিয়েছে কে জানে। থেকে গেছে একা চিল তার সঙ্গে হ্যাং আউট, রুম ডেট, ক্রাশ, আউটিং আর পার্টির মতো বিষয় ঢুকে গেছে কোনো এক ফাঁকফোকরে। কারো কারো পরিবারের ক্ষেত্রে যে পার্টি বিয়ে, জন্মদিন আর শ্রাদ্ধতেই থেমে থাকেনি। সন্তান আগমন-পূর্ব শুদ্ধতার প্রয়াসে ‘ব্রাইডাল শাওয়ার’ আর বিয়ের ‘ব্যাচেলর পার্টিতে’ গিয়েও ঠেকেছে।

স্মৃতির পুকুরে ঢিল ছুড়ে কেউ আর স্কুলমাঠের ডিল প্যারেড কিংবা পিটি স্যারের ধোলাইয়ের কথা মনে করবে না। চার দশকের রূপান্তরে ‘এ দেশের যে ছেলেমেয়েরা আগে পড়ার মান জানতে পরীক্ষা দিত, তারাই এখন পড়ছে শুধু পরীক্ষা দেয়ার জন্যই’। যে শিক্ষা একটা সময় জীবন গঠনের উপলক্ষ ছিল তা বদলে গিয়ে কেবলই ‘এ প্লাস তথা জিপিএ ফাইভের বাম্পার ফলনে সীমাবদ্ধ’। অন্তত শিক্ষার উন্নয়ন, উত্কর্ষ আর দিগন্তজোড়া বিস্তৃতি নিয়ে যে যত কথাই বলুক এখনকার গ্রামগুলোতেও বাস্তবতা এমনই।

কাকডাকা ভোরে গ্রাম আর শহরের চিত্র অভিন্ন হলেও সেখানে ভিন্নতা ছিল কিছুটা। গ্রামের মানুষ স্ব স্ব ধর্মানুযায়ী সকাল হতে না হতেই হয়তো ফজরের নামাজ পড়ে কিংবা দিন শুরুর সূর্য নমস্কার করে রওনা দিত কৃষিকাজের মাঠে। তাদের সামনে থাকত হালের গরু, হাতে একটা লাঠি।  

আর শহর! সেখানে গরু নেই তো কী হয়েছে অবোধ কিছু শিশু তো ছিল। মায়েরা তাদের জীবনের স্বপ্ন পূরণের নতুন পথ খুঁজে ফিরেছেন এসব অবলা শিশুর মাঝে। কৃষক যেমন তার কৃষি উৎপাদনের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে গরু খেদাতে খেদাতে মাঠে নিয়ে যায়। তেমনি শিশুকাল কিংবা কৈশোরের অনেক না পাওয়ার ব্যথায় ব্যথাতুর মায়েদের সব ক্ষতের একমাত্র মলম ছিল ‘ভালো ফলাফল অর্জনের ঘোড়দৌড়ে নামিয়ে শিশুসন্তানকে নির্যাতন করা’। 

আপাতদৃষ্টিতে শহর আর গ্রামের তখনকার পার্থক্য ছিল এটুকুই। আর এখন গ্রামের মাঠের দিকে গরু যায় না। পাওয়ার ট্রিলার কিংবা ট্র্যাক্টর চাষের বিকল্প মাধ্যম হয়ে ওঠার পর গরুর বিকল্প হিসেবে এখন গ্রামেও চলছে ‘নির্বিকার শিশু খ্যাদানো’। আর এর সুন্দর নামও দেয়া হয়েছে ‘কিন্ডারগার্টেন’। 

পলিমাটির মতো অনেক মায়াময় আর নরম ছিল গ্রামের মানুষের বিনোদন। প্রচলিত লোককথা থেকে বললে যেমন বলতে হয় ‘কেউ তার ভাশুরের নাম নেয় না’, তেমনি গ্রামের মানুষের সরল বিনোদনে অকথ্য কোনো কথার ঠাঁই মেলেনি। বাংলা চলচ্চিত্রের জনৈক খল অভিনেতার উক্তিবিশেষের পর থেকে গ্রামবাংলার সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন ক্ষেত্র তথা ‘পাটক্ষেত’ শব্দটাকেও তারা মনে করত অনেক ‘অশ্লীল’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’।

ঈদ, পূজা, ছাব্বিশে মার্চ, একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা ষোলই ডিসেম্বর যেদিনই হোক গ্রামের মানুষ সেটাকে উদযাপন করেছে একান্ত তাদের মতো করে। একটা মাইক ভাড়া করার পর স্থানীয় অধিবাসীদের পক্ষ থেকে হেঁড়ে গলায় গাওয়া গান কিংবা উদ্দাম নাচও ছিল তাদের নির্মল ও উপভোগ্য বিনোদনের অংশ। যুগের বাঁকবদলে এখনকার গ্রামগুলোতে ঈদ, পূজা, বিয়ে কিংবা জাতীয় উৎসব যা-ই হোক একটা সাউন্ড বক্স আনতে পারলে সেখানে আর কেউ গান গায় না। গান শোনার মতো কেউ থাকে না বলেই হয়তো শহুরে যান্ত্রিকতায় হারিয়ে যাওয়া কর্কশ বিনোদন সবাইকে বিব্রত করে যায় ‘হিন্দি বাংলা র্যাপ গানের কর্কশ উচ্চারণে’। 

সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। এ ব্যস্ততা কারো জীবন গুছিয়ে নেয়ার জন্য, কেউবা ব্যস্ত হয়েছে অন্য কোনো দৌড়ে। যে দৌড় হয়তো জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচার দৌড়। তাই গ্রামের মধ্যেও কারো জন্মদিন হলেও সাতসকালে উঠে মায়েরা এখন আর খেজুরের গুড়ের পায়েস রান্নার ফুরসত পান না। এমনকি কারো জন্মদিনের আয়োজনে কোনো পিঠাপুলির আয়োজনও নেই। কেউ কেউ যেমন রান্নাবান্না থেকে টিভি সিরিয়ালে ডুবে থাকাটাকেই মনে করেন ধ্যান, জ্ঞান আর প্রেম। 

কারো কারো (কু) সন্তানরা মায়েদের এসব রান্নাকে মনে করে বড্ড সেকেলে আর ছুড়ে দেয় তির্যক মন্তব্য। এর থেকে কথিত ট্রেন্ড ফলো করতে গিয়ে তারা বাপের পকেট থেকে টাকা চুরি করে। কেউ কেউ চান্সে সরিয়ে দেয় মায়ের কলাটা-মুলোটা কিংবা ডিম বিক্রির খুচরা টাকাপয়সা। মারধর কিংবা গালাগাল অনেক পরের প্রশ্ন; সিরিয়াল দেখতে থাকা মায়েরা কিংবা পাশের বাসার ভাবির ‘মেকআপচর্চিত রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ’ বাবার সময় কোথায় তার সন্তান কী করে বেড়াচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখার!

এই তো সেদিন। কোনো একটা বাংলা চলচ্চিত্রে গাওয়া লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের সেই ‘মঙ্গল দীপ জ্বেলে/ অন্ধকারে দু’চোখ আলোয় ভরো, প্রভু/ তবু যারা বিশ্বাস করে না তুমি আছ/ তাদের মার্জনা করো প্রভু’ মুখে মুখে ফিরত মায়েদের। কিংবা ‘আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সাথে কইব কথা, নাইবা তুমি এলে’, ‘নীল আকাশের নিচে আমি’, ‘এই বৃষ্টি ভেজা রাতে’, ‘আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’ ধাঁচের গানগুলোও মুখে মুখে ফিরত সবার। একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে একবার শোনার পর থেকে ‘আমার একটা নদী ছিল জানল না তো কেউ’ গানটা প্রায় বছরখানেক বেঁচে ছিল কেবল সবার মুখে মুখে। 

পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে প্রায় পুরোটাই। মুখে মুখে গাওয়ার মতো গানের জন্য সবার হূদয়ছোঁয়া গানের গলি। তাই তো শুনতে অবাক শোনা গেলেও শ্রোতারা এখন আর গান শোনে না, তারা ‘ইউটিউবে গান দেখে’। আর হূদয়ের প্রশান্তির জন্য গাওয়া কিংবা শোনার উপকরণ গানকে যখন কতিপয় দোপেয়ে দেখতে চায়, সেখানে তারা কী দেখে সেটা সহজেই অনুমেয়।  

বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তীকালে ধর্মভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংঘাতের যে বিষবৃক্ষটি রোপণ করা হয়েছিল তা সার, পানি ও প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপকরণ পেয়ে এখন বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ধর্ম বনাম ধর্ম আর ধর্ম বনাম কথিত অধর্মের লড়াইটা বেশ জমছে। 

শহরের মতো গ্রামেও এখন বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস এ দুয়ের নামান্তরে বাড়ছে উগ্রবাদ। কেউ কেউ নিজ নিজ ব্যবসার খাতিরে গ্রামবাংলার মানুষের চিরায়ত আচারানুষ্ঠানগুলোর মূলে কুঠারাঘাত করছে, কেউবা বাইরের দেশের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার লোভে কটাক্ষ করছে নিজ জাতি, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে। তাই তো পবিত্র রমজান এলে সবাই যখন ইফতার আর সাহিরর আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত সেখানে তর্ক উঠছে তারাবিহ বিশ নাকি আট রাকাত পড়তে হবে তাই নিয়ে। কোরবানির পশুর মাংস তিন ভাগ থেকে গরিব-অসহায়ের মাঝে বণ্টন করা লাগবে কি না, গরু জবাইয়ের আগে দোয়ার মাঝে সাতজনের নাম বলা লাগবে কিনা এগুলো নিয়েও এখন তর্ক হয়। যাকে সরাসরি তর্ক না বলে বাগ্যুদ্ধ কিংবা কথার খুনোখুনি বলা যেতেই পারে।

গত চার দশকে শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামেও হয়তো শিক্ষা, চাকরি ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে গতিশীলতা এসেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের উপযুক্ত অংশগ্রহণও বেশ চোখে পড়ার মতো। খাদ্যাভ্যাসের মতো যুক্ত হয়েছে নিত্যনতুন বদভ্যাসও। যে গ্রামের মানুষ এক থালায় লবণ মরিচ দিয়ে মাখানো মুড়ি দশজন মিলে খাওয়ায় অভ্যস্ত তাদের মধ্যেও জন্ম নিয়েছে শহুরে মধ্যবিত্তের চিরচেনা কঞ্জুস আচরণ। 

গ্রামের মধ্যে নব্য ধনীদের বাড়িতে এখন কোরবানি হয় যেখানে ‘পশু মাটিতে শোয়ার পর পরই গরিবের জন্য সব মাংস দেয়া শেষ’। হিন্দু বাড়ি থেকে হরিলুটের বাতাসারও দেখা মেলে না তাদের। ‘শবে বরাত’ কিংবা তার থেকেও বড় ‘হালুয়া রুটির উৎসব’ এখন উপেক্ষিত। হয়তো ‘নব্য বাঙালি সংস্কৃতির ব্রাইডাল শাওয়ার’ থেকে ধেয়ে আসা পানির তীব্র স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রচলিত সংস্কৃতির সব খেয়ানৌকোকে। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যা মনে করা হোক, গ্রামগুলোর পরিবর্তন তো হয়েছেই। একে সাংস্কৃতিক ইতিহাস বলাটাও বোধকরি ভুল নয়।


ড. মো. আদনান আরিফ সালিম: সহকারী অধ্যাপক বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন