বুধবার | আগস্ট ০৪, ২০২১ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

গ্রামীণ রূপান্তর || সমাজ

কিন্ডারগার্টেন: শিশু শিক্ষালয়ের বাণিজ্যিক রূপ

মাছুম বিল্লাহ

জার্মান শিশু শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবেল ১৮৩৭ সালে ব্যাড ব্ল্যাংকেনবার্গে শিশুদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত গমন এবং খেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের ধারণাকে কেন্দ্র করে কিন্ডারগার্টেন নামক বিদ্যালয়-পূর্ব উপযোগী এক ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রবর্তন করেন। জার্মানির কোগেল শহরে কিন্তারগার্টেনের অপূর্ব চিত্র বিশ্বের অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ফুলের বাগানে যেমন মালি ফুলের, ফুলগাছের পরম যত্ন ও পরিচর্যা করেন ঠিক তেমনি কিন্ডারগার্টেন নামক শিশুদের বাগানে শিশুরা যাতে সঠিকভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারে তারই প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয় এখানে। তারও আগে অবশ্য ১৮১৬ সালে স্কটল্যান্ডে রবার্ট ওয়েন নামক একজন দার্শনিক ও শিশু শিক্ষাবিদ নিউ ল্যানার্কে ‘ইনফ্যান্ট স্কুল’ খোলেন। আমাদের দেশে ১৯৭৪ সালের কুদরাত-ই-খুদা এবং ১৯৮৮ সালের মফিজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা কমিশন থেকে সর্বশেষ শিক্ষানীতি ২০০৯সহ প্রায় সব কমিশন ও শিক্ষানীতির আলোকে বর্তমানে পাঁচ বছর ও তার কম বয়সী শিশুদের জন্য দুই বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রস্তাব করা হয়। এগুলোই মূলত কিন্ডারগার্টেন তথা কেজি স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থার আদি চিত্র। শিক্ষা কমিশনে থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব পায়নি, এর কারণ হচ্ছে বিশাল অংকের শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই বঞ্চিত ছিল। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু এখনো শতভাগ শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। প্রাক-প্রাথমিক তো পরের কথা। তবে প্রাক-প্রাথমিক কিন্ডারগার্টেন রূপে ব্যক্তি ও বেসরকারি পর্যায়ে চালু ছিল। সেটিও তেমন ব্যাপক আকারে ছিল না এখন যেমনটি দেখা যায় অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো। 

স্বাধীনতার পর পরই এ জাতীয় বিদ্যালয়ের তেমন কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কেউ কেউ হয়তো নিজ বাসায় বা বারান্দায় আশপাশের শিশুদের ক, খ কিংবা আদর্শলিপির বই নিজ দায়িত্বে পড়াতেন। কোনো কোনো অভিভাবক হয়তো তাদের কিছু কিছু দিতেন, সবাই তাও নয়। যেহেতু বাসার কাছে এবং সকাল বেলা এসব পড়াশোনার বিষয়টি মূর্খ হলেও আশপাশের অভিভাবকদের আকৃষ্ট করত। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বাড়ি থেকে দূরে হওয়ায় অনেক অভিভাবক তার প্রতি খুব একটা আকৃষ্ট ছিলেন না। বারান্দা ও নিজ গৃহের পড়াটাই প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক রূপ লাভ করতে শুরু করল। আশির দশকে দ্রুত এগুলো প্রসার লাভ করে। তখন থেকেই গৃহবধূ, বেকার ছেলেমেয়ে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিষয়টিকে মূলধন করে শুরু করে দেয় কিন্ডারগার্টেন ব্যবসা। এখন এ সংখ্যা সত্তর হাজারের মতো। তবে কেউ কেউ বলে এ সংখ্যা এর চেয়েও বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন নিবন্ধন বিধিমালা-২০১১ প্রণয়ন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের আগস্টে ওই নীতিমালা থেকে নিবন্ধন ফি ও ভূমির পরিমাণ কমানোসহ নয়টি বিধি সংশোধন করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেনগুলো অবাধে বাড়তে দেয়ার সুয়োগ তৈরি করে দেয়া। 

আমাদের সমাজে কিন্ডারগার্টেন নামক শিশু বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব একটি বাস্তবতা। এগুলোর লেখাপড়া ও পরিবেশ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে কিন্তু শিক্ষাজগতের বাস্তবতা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। শিশুদের এ বিদ্যালয়গুলোর অস্তিত্ব কি মুছে যেতে বসেছে? এগুলো বিক্রির বিজ্ঞাপন ইদানীং আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে দেখতে পাই। কিন্ডারগার্টেন জাতীয় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত হয় (৯৯ শতাংশ) কিংবা একটু সচ্ছল অথচ বেকার কোনো ছেলে বা মেয়ে নিজের বাসার একটি রুমে হয়তো এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান চালু করেন। করোনাকালীন বন্ধেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়ি ভাড়া ঠিকই দিতে হচ্চে। যদিও শিক্ষার্থী বেতন আদায় হচ্ছে না। অন্যান্য বিলও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক হারে পরিশোধ করতে হয়, যা এখনো অব্যাহত আছে। কিন্ডারগার্টেনের প্রাইভেট বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠান থেকে নামমাত্র বেতন পান, তারা নির্ভর করেন মূলত প্রাইভেট টিউশনির ওপর, যা করোনাকালে বন্ধ রয়েছে। তারা না পাচ্ছেন প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন, না পাচ্ছেন প্রাইভেট পড়ানো বাসা থেকে কোনো বেতন। কাজেই জীবন চালানো, সংসার চালানো তাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ শুরু হয়েছে এবং কয়েক দফায় বাড়িয়ে তা নভেম্বরের ১৪ তারিখ পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে। কী অবস্থায় এগুলোর মালিক ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা দিন কাটাচ্ছেন, আমরা কেউ তার খবর রাখি না। দু-চারজন টিচার শুধু বলেছেন, ‘স্যার, দুরবস্থার কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না, সম্ভব হলে কিছুটা সাহায্য করেন।’ শিক্ষক নেতারা বলেছেন যে শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফির ৪০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, ৪০ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন, বাকি ২০ শতাংশ দিয়ে গ্যাস বিল, বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ ও পানির বিলসহ অন্যান্য খরচ নির্বাহ না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি দিতে হয়। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় না হওয়ায় মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত স্কুলগুলো সকল প্রকার বিলসহ বাড়ি ভাড়া, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। বাড়ির মালিক ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও গরিব কর্মচারীরা অর্থকষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা দিশেহারা। শিক্ষাক্ষেত্রের বিশাল এ সেক্টরকে টিকিয়ে রাখতে এবং অসহায় শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও গরিব কর্মচারীদের জন্য জীবন বাঁচানো এবং এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্র্রীর কাছে যেকোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রার্থনা করেন। একটি সংগঠন আপত্কালীন ৫০ কোটি, অন্য একটি সংগঠন সরকারের কাছে ৫০০ কোটি টাকা অনুদান চেয়েছে। নেতারা বলছেন, ‘এ স্কুলগুলো যদি না থাকত তাহলে সরকারকে আর ২৫ থেকে ৩০ হাজার বিদ্যালয় স্থাপন করে প্রতি মাসে শিক্ষক বেতন বাবদ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। সেদিক থেকে বলা চলে আমরা সরকারের বিরাট রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে দিয়েছি। পরোক্ষভাবে আমরা দেশের বেকার সমস্যা সমাধানেও কাজ করছি।’ শিক্ষক নেতাদের এ কথাগুলো কিন্তু ফেলে দেয়ার মতো নয়, যুক্তিসংগত কথা।

অভিভাবকদের কাছে বেতন চাইলে সেটা অমানবিকতার পর্যায়ে পড়ে। আর বেশির ভাগ অভিভাবকও এ মুহূর্তে বেতন দিতে রাজি নন। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন আদায় না করলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারছে না। আর এ শিক্ষক ও কর্মচারীরা যে কষ্টে দিনাতিপাত করছেন সেটি আর এক ধরনের অমানবিকতা। তাই এ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে এখনই আসা উচিত। হতে পারে, অভিভাবকদের ৭০ শতাংশ বেতন দিতে হবে, বাকিটা মওকুফ করা হবে। এই ৩০ শতাংশ বেতন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বহন করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা শিক্ষকের এখনই দিয়ে দেবে, বাকিরা পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে দেবে। তবে কোনোভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীদের ঠকানো যাবে না। কিন্তু এ সিদ্ধান্তটি কে নেবে? স্কুল কমিটি, শিক্ষা বিভাগের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, অভিভাবক প্রতিনিধি সমন্বয়ে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে যেখানে মন্ত্রণালয় সায় দেবে। শিক্ষক নেতারা বলছেন প্রায় সত্তর হাজার কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, উপকারভোগী মিলে ২০ লাখ। এসব প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষক আছেন, তারা কী ধরনের বেতন পান এ ধরনের তথ্য উপজেলা কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসারদের কাছে থাকা উচিত। কিন্ডারগার্টেনগুলোতে কী পড়ানো হয়, কীভাবে পড়ানো হয়, কারা পড়ান ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা ও সঠিক পরিসংখ্যান থাকা উচিত। কারণ কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজের বাস্তবতা। এগুলোর সমস্যা অনেক কিন্তু এগুলো তো এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। 

প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে তা পরিচালনা করতে হয়। এটি কোনোভাবেই যার তার হাতে ছেড়ে দিলে হয় না। কিন্ডারগার্টেনগুলো আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান (৬৫৬২০টি) রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে পরিচালনা করা হয় যেটি একটি ভালো দিক। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কীভাবে চলছে, কী শিখছে সেখানকার ক্ষুদে শিক্ষার্থী তথা ভবিষ্যৎ নাগরিকরা সেগুলো সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছু বলার প্রয়োজন নেই। দু-চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া এগুলোর শিক্ষার মান যে কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তা আমাদের অজানা নয়। যার করণে একটু সচ্ছল অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। তারা কষ্ট করে হলেও তাদের বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠিয়ে থাকেন। মূলত এ কারণেই দেশের আনাচকানাচে গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন টাইপের বিদ্যালয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের যার তার হাতে ছেড়ে দেয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। কিন্ডারগার্টেনে যারা পড়ান তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ নেই। অথচ শিশুদের ডিল করার জন্য, তাদের পড়ানোর জন্য শিশুশিক্ষা ও শিশুবিজ্ঞানের ওপর যথেষ্ট ধারণা থাকতে হয়, জানতে হয়, প্রাকটিস করতে হয় যা আমাদের কিন্ডারগার্টেনগুলোতে নেই। ব্যতিক্রম দু-চারটি রয়েছে। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলেও অন্যভাবে ম্যানেজ করা যায় কিন্তু শিশুদের শিক্ষা কারোর বাড়ির বারান্দায়, কারোর ভাড়া করা একটি রুমে বা দুটো রুমে, ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর চলতে দেয়া যায় না। সেখানে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে, যারা শিশুশিক্ষার সার্বিক নির্দেশনা প্রদান করবে এবং সেভাবেই গোটা দেশে একইভাবে শিশুদের আনন্দদায়ক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে, সেখানকার শিক্ষকদের যথাযথ পেশাগত উন্নয়ন সংঘটিত হবে। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক, পরিচালক কিংবা মালিকদের আমরা দোষারোপ করতে পারি না। প্রাথমিক শিক্ষার দুর্বলতার কারণেই এগুলো গড়ে উঠেছে। এখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রের। এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি মওকুফ কিংবা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়ার বিষয়ে কোনো সহায়তা করা হবে কিনা সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। কিন্তু আসা উচিত। 

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীর আগে এক বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু আছে। ২০২১ সাল থেকে চালু হতে যাচ্ছে দুই বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা। ফলে সরকারি প্রাথমিকেও এখন থেকে চার বছরে ভর্তি হতে হবে। এই শ্রেণীর নাম হবে ‘শিশু শ্রেণী’। আগামী বছর হয়তো দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মোট পাঁচ হাজার বিদ্যালয়ে চালু করা হবে এই শিশু শ্রেণী। এরপর ২০২২ সালের মধ্যে সব স্কুলে তা কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব বলেছেন, ‘আমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে চাই। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ দুই বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা আছে। সে কারণে দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিকে দুটি ক্লাস চালু হলে প্রথমটিতে মূলত খেলাধুলাই থাকবে। খেলার ছলে শিশু যা শিখতে পারে সেটাই যথেষ্ট হবে। ফলে পরের শ্রেণীতে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে স্কুলে আসবে। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত একটি শ্রেণী যুক্ত হলে এগারো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে নিরীক্ষা জরিপে চিহ্নিত করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে একটি করে নতুন শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ করতে হবে। শ্রেণীকক্ষ চার বছরের শিশুদের উপযোগী হতে হবে। সব বিদ্যালয়েই অতিরিক্ত একজন করে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কোমলমতি শিশুদের দেখভাল করার জন্য নিয়োগ করতে হবে একজন করে যত্নকারী বা কেয়ারগিভার। আমরা এগুলো নিয়ে বাস্তবসম্মত কোনো চিন্তা করেছি কিনা সেটি দেখতে হবে। শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না।

২০১০ সাল থেকে সীমিত আকারে এবং ২০১৩ সাল থেকে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমেছে। ২০১৩ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৯.৫ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭.৯ শতাংশ। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর পর প্রথম শ্রেণীতে নিট ভর্তির হার, শিক্ষাচক্র সমাপনীর হার, উপস্থিতির হার, সমাপনী পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে বলে সরকার দাবি করছে। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ থেকে দেখা যায় যে জাপান, কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ভারতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দুই বছর মেয়াদি। ইউনেস্কোর ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা উন্নত বিশ্বের দেশসহ ১০ শতাংশ দেশে তিন বছর মেয়াদি এবং ৪৯ শতাংশ দেশে দুই বছর মেয়াদি চালু রয়েছে। আমাদের দেশের কিন্ডারগার্টেনগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দুই থেকে তিন বছর মেয়াদি। এগুলো হচ্ছে প্লে গ্রুপ, কেজি ওয়ান, কেজি টু ইত্যাদি নামে। কিন্ডারগার্টেনগুলো বেসরকারি হওয়ায় সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না। মন্ত্রণালয়ের এটিও একটি কৌশল, যাতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকে ঢুকতে পারে। তাই তারা সব সরকারি প্রাথমিকের সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক যোগ করেছে। তবে এসব শিশুশ্রেণীতে সত্যিকার অর্থে কী ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে পরবর্তী শ্রেণীতে যাওয়ার জন্য তার কোনো প্রমাণ বা ডকুমেন্ট আমরা দেখতে পাই না। যতটা জানা যায়, এসব শিক্ষার্থীকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেই খাতা-কলম ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সামেটিভ অ্যাসেসমেন্টই ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা যদি রাষ্ট্র সঠিকভাবে, মানসম্মত উপায়ে ম্যানেজ করতে পারে তাহলে রাষ্ট্র থেকেই এগুলো পরিচালিত করা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সরকাার প্রাথমিকের শিক্ষকদের চাকরিটি সরকারি কিন্তু মানসম্মত শিক্ষাদান থেকে এগুলো বহু দূরে অবস্থান করছে। তাই বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা আমরা শুধু বলার জন্য পুরোটাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পরিচালনা করব নাকি সত্যিকার অর্থে মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষাদানের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগকে আরো শক্তিশালী করব।

শিশুদের সুস্থ বিনোদনের অন্তরায় হচ্ছে একঘেয়ে পড়াশোনা আর গাদা গাদা হোমওয়ার্ক। ধীরে ধীরে সমাজে এমন পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে যে অভিভাবকরা চাইছেন শুধু ফল, অংকে শিশু কত পেল, ইংরেজিতে কত নম্বর পেল ইত্যাদি। পাশের বাড়ির শিশুটির চেয়ে তার শিশু কম নম্বর পেল কিনা, পেলে কত নম্বর কম পেল ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। কিন্ডারগার্টেনের মালিকরাও বিষয়টিকে সেভাবে দেখতে শুরু করলেন। একটি শিশুর ভেতরে ভেতরে যে মানসিক শক্তি দুর্বল হতে হতে এবং অসুস্থ হতে হতে মরতে বসেছে সমাজের সেদিকে খেয়াল নেই। সবাই চায় শুধু নম্বর, নম্বর। নম্বর দিয়ে সমাজে পরিচয় কে প্রথম কে দ্বিতীয়, নম্বর দিয়ে পরবর্তী প্রতিষ্ঠানে ভর্তি। রাষ্ট্র থেকেই এগুলো টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কাজেই কিন্ডারগার্টেন পরিচালক বা মালিকদের দোষ তো পুরোটা নয়। সরকারিতে পড়াশোনা না করলেও, শিক্ষক ক্লাসে কী পড়াচ্ছেন বা পড়াচ্ছেন না সেটি দেখার, খোঁজ নেয়ার কেউ নেই। কাজেই অভিভাবকরা সেখানে শিশুদের পাঠাতে চান না। তারা চান ফল, তারা চান গাদা গাদা হোমওয়ার্ক, শিশুদের পড়ার চাপের মধ্যে রখাতে। কিন্ডারগার্টেনগুলো সেই দাবিগুলোই পূরণ করছে আর তাই সমগ্র দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে কিন্ডারগার্টেন। এখন এটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে চলে গেছে। শিশুরা যখন কোনো সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করে সেটিও তাদের জন্য এক ধরনের বিনোদন। শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে খেলা বা বিনোদনের মধ্য দিয়ে। আর বাইরের খেলার মধ্য দিয়ে তার সামাজিকতা বৃদ্ধি পায়। এগুলো চর্চা এখন কিন্ডারগার্টেনে নেই। পুরো সমাজ যেন পাল্টে গেছে আর সেই সঙ্গে শিশুদের বাগান নামে পরিচিত কিন্ডারগার্টেনগুলো বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। 


মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত; প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশেন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব) 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন