শনিবার | অক্টোবর ২৩, ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

ফিচার

ভারতে কন্যাশিশু দত্তক বৃদ্ধির পেছনের গল্পটা মোটেও সুখকর নয়

বণিক বার্তা অনলাইন

ভারতে এক বছরে মোট ৩ হাজার ৫৩১ শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬১টিই কন্যাশিশু। এই প্রবণতা কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

ভারতের চাইল্ড অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটির (সিএআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে ৪ হাজার ২৭টি শিশুকে দত্তক নেয়া হয়, এর মধ্যে ২ হাজার ৩৯৮টিই কন্যাশিশু। ২০১৫ সালের পর এবছরই সর্বোচ্চ সংখ্যক শিশুর দত্তক নিবন্ধন হয়। এর মধ্যে আবার ৩ হাজার ৩৭৪টি শিশুকে ভারতেই দত্তক নেয়া হয়েছে। আর বাকি ৬৫৩ শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে দেশের বাইরে।

এদিকে গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়কালে ১ হাজার ৪৭০টি ছেলে শিশু ও ২ হাজার ৬১টি কন্যাশিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে। আবার রাজ্যগুলোর মধ্যে মহারাষ্ট্র থেকে সর্বাধিক- ৬১৫টি শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে। এরপরেই কর্নাটক থেকে ২৭২, তামিলনাড়ু থেকে ২৭১, উত্তরপ্রদেশ থেকে ২৬১ ও ঊডিশা থেকে ২৫১টি শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে। 

অধিক হারে কন্যাশিশু দত্তক নেয়ার পরিসংখ্যানটি ইতিবাচক মনে হলেও এটির পেছনের গল্পটা কিন্তু সুখকর নয়। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবার এখন কন্যাশিশুদের পরিত্যাগ করে দত্তক কেন্দ্রে পাঠাচ্ছে। এই কারণেই মূলত কন্যাশিশু দত্তক নেয়ার হার বাড়ছে।

ভারতের আবহমান সংস্কৃতিজুড়ে ছেলে শিশুদের প্রাধান্য দেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে সিএআরএর একজন কর্মকর্তা বলেন, মানুষের মানসিকতা ধীরে ধীরে পরিবর্তীত হচ্ছে। এজন্য তারা কন্যাশিশুদের দত্তক নিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। 

মানবাধিকার কর্মীরা অবশ্য কন্যাশিশুদের দত্তক নেয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনকই মনে করছেন। তারা এর পেছনের নির্মম গল্পটা তুলে ধরছেন। তাদের ভাষ্য, আরো বেশি কন্যাশিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে, কারণ দত্তক নেয়ার জন্য মেয়েশিশুরা সহজলভ্য। অনেক পরিবার কন্যাশিশুদের পরিত্যাগ করে দত্তক কেন্দ্রে পাঠায়। আর এ কারণেই কন্যাশিশু দত্তক নেয়ার সংখ্যা বাড়ছে। 

অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক আখিলা শিবদাস বলেন, আপনি একটি দত্তক সংস্থায় গেলে দেখবেন দত্তক গ্রহণের জন্য ছেলে শিশুর তুলনায় অনেক বেশি কন্যাশিশু রয়েছে। সুতরাং এটিকে প্রগতিশীল মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা কিছুটা অতিরঞ্জিত কিংবা অতি-সরলীকরণ হতে পারে। 

তিনি বলেন, অনেক পরিবার ছেলেশিশুর প্রতি প্রবল অগ্রাধিকার মনোভাব পোষণ করে, সন্তান জন্মের আগেই লিঙ্গ জানার চেষ্টা করে এবং কন্যা ভ্রুণ হলে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেয়। আবার অনেক অভিভাবক জন্মের পর কন্যাশিশুদের পরিত্যাগ করে। আর কিছু মানুষের মধ্যে সম্মিলিত গ্লানি ও অপরাধবোধের অনুভূতি রয়েছে। তারা কন্যাশিশুদের দত্তক নিয়ে সত্যিকার অর্থে এটিকে সমাধানের চেষ্টা করে। 

সিএআরএর তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখিত সময়কালে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৩ হাজার ১২০টি শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ৫ থেকে ৮ বছর বয়সী মাত্র ৪১১টি শিশুকে দত্তক নেয়া হয়েছিল। 

শিবদাস বলেন, বেশিরভাগ বাবা-মা দত্তক গ্রহণে এখনো দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের পছন্দ করেন। ফলে বড় শিশুদের দত্তক নেয়া একটা সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে। কন্যাশিশুদের দত্তক নেয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি কতোটা পরিবর্তীত মূলবোধের প্রতিফলন- তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত ও গভীর অনুসন্ধান দরকার।

গত বছর ইউনিসেফ জানিয়েছে, পরিবারের পরিত্যাগ করা ও অনাথ মোট ২ কোটি ৬৯ লাখ শিশুর দেশে পরিণত হয়েছে ভারত।

এখানে আরো একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা দরকার। ২০১৫ সালে ডিজাইনার তানিয়া বোয়ার আনওয়ান্টেড (অনাকাঙ্ক্ষিত) নামে একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, ভারতে প্রতিবছর ৬ লাখ ২৯ হাজার মেয়ে নিখোঁজ হয়। প্রতিবেদনটিতে এটাও দাবি করা হয়েছিল, প্রতি ৫০ সেকেন্ডে ভারতের একজন বাবা-মা তাদের কন্যাশিশুকে হত্যা করে।

সূত্র : দ্য হিন্দু

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন