মঙ্গলবার | নভেম্বর ২৪, ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

রাষ্ট্র ও বাজার

চলতি উৎপাদনশীলতা বিতর্কে প্রধান বিবেচ্য

ডিয়ান কইল

১৯৯৬ সালে প্রয়াত ম্যানসিউর অলসনের ‘বিগ বিলস লেফট অন দ্য সাইডওয়াক’ নামে দেয়া বক্তৃতায় একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছিল। সেটি হলো দরিদ্র কোনো দেশের নাগরিক (ধরা যাক হাইতির) যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশে অভিবাসন করার পর তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যাপকভাবে উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি মজুরি অর্জনে সক্ষম হয়। ব্যক্তিটি রাতারাতি পরিবর্তন হয়নি, কাজেই দক্ষতা বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি তার উন্নত অবস্থা ব্যাখ্যা করে না। বরং উত্তরটি অভিবাসন করা তার নতুন দেশের পরিবেশেই নিহিত। 

অতএব, অলসন সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে অনেক অর্থনীতিই সামাজিকভাবে দক্ষ-কার্যকর নয়। অধিকতর ভালো প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং অতীত বিনিয়োগগুলো থেকে অর্জিত সম্পদের উচ্চ মজুদ ব্যক্তির উৎপাদনশীলতা এবং তাদের জীবনমানে বিপুল পার্থক্য তৈরি করতে পারে। 

চ্যালেঞ্জ হিসেবে অলসন যেমনটা উল্লেখ করেছেন যে অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া ব্যক্তি নাগরিকরা সার্বিক প্রেক্ষাপট-প্রাসঙ্গিকতা পরিবর্তন করতে পারে না, যেখানে তারা বাস করে এবং কাজ করে। পুরো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত ও সামষ্টিক উদ্যোগ। সামষ্টিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতার ওপর অলসনের নিজস্ব সুপরিচিত গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে যে কেন এটি অর্জন কঠিন। 

দুর্ভাগ্যক্রমে, বিদ্যমান উৎপাদনশীলতা বিতর্ক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অলসনের ‘বিগ বিলস’-সংক্রান্ত অন্তর্দৃষ্টি খুব কমই ধারণ করে। চলতি শতকের মধ্য শূন্য দশকের পর থেকে অনেক ওইসিডি দেশে কেন প্রতি ঘণ্টায় কর্মীদের উৎপাদন স্থবির থেকেছে কিংবা পিছিয়ে থাকা শহর ও অঞ্চলকে পুনরুজ্জীবনে কোন ধরনের টার্গেটেড নীতিগুলো সাহায্য করতে পারে সেগুলো পর্যালোচনা না করে এ বিতর্কে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে অসংখ্য দায়ী ফ্যাক্টর বেশি মনোযোগ পেয়েছে।  

উদাহরণস্বরূপ, প্রকল্প থেকে প্রকল্প ভিত্তিতে নীতিনির্ধারকরা সাধারণত সম্ভাব্য অবকাঠামো বিনিয়োগের ব্যয়-সুফল মূল্যায়ন করে থাকেন। তবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে কোনো প্রকল্পের রিটার্ন (সুফল) অন্য সিদ্ধান্তগুলোর কারণে প্রভাবিত হবে। নতুন কোনো রেললাইন চালু হলে মানুষের ভ্রমণ সমন্বয়ের জন্য কি স্থানীয় বাসের সময়সূচি পরিবর্তন হবে? সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘাটতিতে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ, যেখানে এরই মধ্যে আরো কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে, সাধারণত অনেকটা বেটার ভ্যালু ফর মানি অপশনের মতো। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন প্রকল্প মূল্যায়নে যুক্ত সরকারি এজেন্সিগুলো নীতি পরিপ্রেক্ষিতের সামগ্রিক জরিপের কাজটি খুব কমই করে থাকে। 

আঞ্চলিক বা স্থানীয় নিম্ন দক্ষতার ফাঁদও একই ধরনের সমস্যা হাজির করে। সুনির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরি না থাকলে ব্যক্তি নাগরিকদের শিক্ষায় বিনিয়োগের কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রণোদনা থাকে না। আর বিদ্যমান দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা যদি ছোট হয় তাহলে নিয়োগকর্তারা সেখানে অফিস বা ফ্যাক্টরি খোলায় কোনো উৎসাহ পাবেন না। সেক্ষেত্রে যারা নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে চায়, তাদের একমাত্র অপশন হলো অন্যত্র চলে যাওয়া।  

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য ‘প্রতিষ্ঠান’ গুরুত্বপূর্ণ—এ ধারণার ব্যাপকতর গ্রহণযোগ্যতার বাস্তবতায় অর্থনীতির গবেষকদের মধ্যে এ ধরনের উদাহরণগুলো ঐতিহ্যিক ও গ্রহণযোগ্য মূল্যবোধে পরিণত হয়েছে। সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংগঠনের সমাজতত্ত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বোঝাপড়ার সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের নিজস্ব বিশ্লেষণগুলোর সংযোগ ঘটাতে হবে। অঞ্চলগুলোকে ‘আরো বেশি সিলিকন ভ্যালির হওয়ার’ আহ্বান জানানো শুধুই অযথা। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রতিটি সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে ঠিক কী ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন এবং কী ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে এটি অর্জন করা যেতে পারে, সেটি বোঝাটাই গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ।


অঞ্চলগুলোর মধ্যকার বিপুল অসমতার কারণে মানুষের জীবনের সুযোগ নিশ্চিত প্রায় সবখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু, নির্বাচনে উত্থান-পতন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অব্যাহত মেরুকরণ পরিষ্কারভাবে যেমনটা ইঙ্গিত দেয়। চলমান মহামারী, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্যতা, শূন্য কার্বন অর্থনীতিতে স্থানান্তরের অস্তিত্বমূলক প্রয়োজনীয়তা এবং বিস্তৃত ডিজিটাল ব্যাহতকরণ আরো গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাপকতর সমৃদ্ধি নিশ্চিতের আবশ্যকতা স্পষ্ট করে তুলবে। 

উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রায় সর্বজনীন হলেও সমাধানগুলো হবে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সেগুলো সমাধানে নিজস্ব সম্পদ উত্তরাধিকার, শিল্প ইতিহাস, অবস্থান ও স্থানীয় রাজনীতির প্রতিফলন ঘটবে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত কিংবা বিভাগীয় অংশ এবং বাজেটগুলোয় পছন্দগুলো কীভাবে সমন্বয় করবে, সে সম্পর্কে এখনো কোনো বিজ্ঞানসম্মত কোনো উপায়ের সন্ধান মেলেনি। যেজন্য এসব বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের প্রডাক্টিভিটি ইনস্টিটিউটের কেন্দ্রীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে।

কেউ বিস্মিত হবে না যে নিম্ন বা স্থবির উৎপাদনশীলতার জন্য দায়ী ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে ভৌত ও অভৌত সম্পদগুলোয় বিনিয়োগ ঘাটতি, দক্ষতার অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে এসব সমস্যা গভীরভাবে আমলে নেয়ার একটি দাওয়াই অন্বেষণে যত মনোযোগ দেয়ার কথা, তাতে বড় ধরনের ঘাটতি বিরাজমান। দেরি না করে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এ ঘাটতি দূরে প্রচেষ্টা নিতে হবে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


ডিয়ান কইল: ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক

মার্কেটস, স্টেট অ্যান্ড পিপল: ইকোনমিকস ফর পাবলিক পলিসি গ্রন্থের লেখক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন