বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

গ্রামীণ রূপান্তর ।। অবকাঠামো

ডিজিটাল অবকাঠামো ও সামাজিক গতিশীলতা

খন্দকার সাখাওয়াত আলী

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আমাদের গ্রামসমাজ ছিল নিশ্চল ও গতিহীন। তবে মুক্তিযুদ্ধ মানুষের মনে বড় ধরনের স্বপ্ন বুনে দেয়। অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তখনো কৃষি। ধান, পাট আর রবিশস্য নিয়ে আমাদের সনাতন কৃষি। আমাদের অর্থনীতি কৃষি ও কৃষিপণ্য রফতানি আর শিল্পোদ্যোগ খুবই প্রাথমিক স্তরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেল ও সড়কপথের বড় বড় সেতু ভেঙে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ শেষে এক কোটি শরণার্থী ফেরত আসে যার যার নিজেদের গ্রামে। ঘরবাড়ি, গরু কিংবা লাঙল কিছুই তাদের অবশিষ্ট ছিল না। নতুন করে বীজ বপন করে জীবন শুরু করার বীজটুকু তাদের ছিল না। বাংলাদেশের শুরুটা প্রায় ছাইভস্মের ভেতর থেকে গ্রামসমাজ নিয়ে যেন ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। দেশকে উজাড় করে দিয়ে চলেছে আমাদের গ্রামসমাজ। 

শুরুর এ বাংলাদেশের গ্রামসমাজের নিশ্চল ও গতিহীনতা ভেঙে সামাজিক গতিশীলতা সৃষ্টিতে বিগত পাঁচ দশকজুড়ে চারটি বিষয় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমত, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, দ্বিতীয়ত, দেশব্যাপী সড়ক নেটওয়ার্ক, তৃতীয়ত, দেশজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক, চতুর্থত, বিদেশে কাজের সুযোগ। গ্রামসমাজের সার্বিক রূপান্তর, বিশেষত যোগাযোগ রূপান্তরে এ চারটি বিষয়ের প্রভাব সবচেয়ে বড়। এর পাশাপাশি কৃষির বহুমুখীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ, বেসরকারি সংস্থা, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ, অকৃষি খাতের প্রসার ও সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাত ও পোশাক শিল্প—এ ঘটনাগুলোও গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামসমাজের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এ প্রবন্ধে আমরা সীমাবদ্ধ রাখব মুখ্যত ডিজিটাল অবকাঠামোর বিকাশ ও গ্রামসমাজে গ্রামীণ যোগাযোগের রূপান্তরের নানা দিক প্রসঙ্গে। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমাদের টেলিকমিউনিকেশন খাত ছিল আকারে খুবই ক্ষুদ্র। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত টেলিফোনের পরিসর ও পরিধি খুব একটা তেমনভাবে বাড়েনি। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিফোন রেগুলেটরি বোর্ড প্রথম বেসরকারি খাতে মোবাইল ফোনের লাইসেন্স প্রদানের জন্য টেন্ডার করে। দুটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়া হয়। যার একটি সেবা টেলিকম আর অন্যটি তত্কালীন সরকারের (বিএনপি) সঙ্গে যুক্ত এবং মন্ত্রী মোরশেদ খানের প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিফোন লিমিটেড (সিটিসেল নামে)। একক মালিকানার কারণে এ সময় মোবাইলের দাম ও কলচার্জ সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। নেটওয়ার্ক পরিসরটিও ছিল সীমিত। নব্বই দশকের শেষ দিকে তত্কালীন সরকারের প্রযুক্তিবান্ধব, দরিদ্রবান্ধব নীতির কারণে একাধিক মোবাইল অপারেটরকে লাইসেন্স দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে গ্রামীণফোন, একটেলকে লাইসেন্স দেয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল টেলিফোন খাতে বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আর তা সম্ভব হয়েছিল তত্কালীন সরকারপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তের কারণে। দেশের নতুন এ মোবাইল খাতটি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে টেলিকম পলিসি করা হয়। 

তত্কালীন সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, আমাদের গ্রামীণ টেলিকমিউনিকেশনে একটি বিপ্লব সাধিত হয়েছে। গ্রামীণফোন সে বিপ্লবের সূচনা করে। আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রথম প্রজন্মের প্রযুক্তি ছিল মোবাইল ফোন। এখন এ মোবাইল প্রযুক্তিই আমাদের ডিজিটাইজেশনের মূল অবকাঠামো ও সড়ক। আর এ সড়ক নির্মাণের পেছনে পাঁচটি স্টেকহোল্ডারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইতিহাসের জন্য জেনে রাখা জরুরি। প্রথমত ধারণা উদ্যোক্তা। যিনি মোবাইল ফোনের মতো একটি আধুনিক প্রযুক্তি দরিদ্র মানুষের হাতে তুলে দেয়ার সম্ভাবনা দেখেছেন। গরিবদের মধ্যে ব্যবহার সামর্থ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। এ ধারণা উদ্যোক্তাটি হলেন বাঙালি আমেরিকান প্রবাসী ইকবাল কাদীর। অর্থাৎ তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক মোবাইল প্রযুক্তির দূরদৃষ্টিটি সামনে আনেন এবং পেছন থেকে এর জন্য কাজ করেন। দ্বিতীয়ত, ধারণা উদ্যোগের বাস্তবায়ন উদ্যোক্তা (প্রফেসর মুহম্মদ ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক ও তার সহকর্মী খালেদ শামস, ডেপুটি মহাব্যবস্থাপক, গ্রামীণ ব্যাংক)। এ ধারণাকে বাস্তবায়নের প্রশ্নে গ্রামীণ ব্যাংকের এই দুজনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ ও আস্থা তৈরিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তৃতীয়ত, নীতি উদ্যোক্তা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে)। এ ভূমিকায় ১৯৯৬ সালের তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান ও নিয়ামক উদ্যোক্তার ভূমিকা নিয়েছিলেন। প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার ভিত্তিতেই গ্রামীণফোনকে লাইসেন্স দেয়া হয়। চতুর্থত, গ্রামীণফোনে বিনিয়োগকারী নরওয়েজিয়ান সরকারি টেলিফোন কোম্পানি টেলিনর (অর্থায়ন  ও প্রযুক্তি জোগান দিয়ে)। 

মোবাইল টেলিফোন খাতে বিনিয়োগ পরিবেশ দেখে পরবর্তী অন্য বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসে। গ্রামীণফোনের পাশাপাশি আরো বিদেশী বিনিয়োগ আসতে শুরু করে। একটেল, রবি, বাংলালিংক ও ওয়ারিদের মতো বিনিয়োগকারীরা আসা-যাওয়া করেছে। বিগত আড়াই দশকে নানা পরিস্থিতির মধ্যে গ্রামীণফোন শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মার্কেট লিডার হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০০৪ সালে সরকারি মালিকানাধীন টেলিটক মোবাইল¬ ফোন চালু করে। শুরুতে গ্রাহকদের আগ্রহ তৈরি করতে পারলেও তা টেকসই হয়নি। বরং ভিআইপি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ অর্থ অনিয়ম ও কারচুপির উদাহরণ রয়েছে। বর্তমানের পরিস্থিতি এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। 

গ্রামীণফোনের শতকরা ৩৫ ভাগ শেয়ারহোল্ডার গ্রামীণ টেলিকম ১৯৯৭ সালে গ্রামাঞ্চলে ‘ভিলেজ পে ফোন’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে শুরু করেছিল। এটি খালেদ শামসের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল। তিনি গ্রামীণফোন ও গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ। দেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫১টি জেলায় ও ১৯ হাজার গ্রামে এ সেবা চালু হয়েছিল। আমাদের মতো সনাতনী ও নিশ্চল সমাজে মোবাইলের মতো উচ্চপ্রযুক্তি বেশ দ্রুতগতিতে দেশময় ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছিল। ‘ভিলেজ পে ফোন’ দেশের সাধারণ মানুয়ের চাহিদার দিক বিবেচনায় রেখে প্রকল্প পরিকল্পনা করার পরিপ্রেক্ষিতে খুব দ্রুততার সঙ্গে গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ব্যাংক তার গ্রাহকের মধ্যে থেকে নারী সদস্যদের নির্বাচন করে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে মোবাইল ফোন কেনার জন্য ঋণ প্রদান করেছিল। ঋণগ্রহীতা এ নারীরা গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ব্যবসা হিসেবে টেলিফোন বা যোগাযোগ সেবা চালু করে এবং দ্রুত এ সেবা জনপ্রিয়তা লাভ করে। নারীদের দেয়া এ সেবাকেন্দ্রগুলো গ্রামে ‘ফোনবাড়ি’ বা ’টেলিফোন লেডি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। গ্রামীণফোন ও পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনগুলোর বিজিনেস মডেলের কারণে, মোবাইল ফোন ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সবার কাছে পৌঁছে যায়। এ মোবাইল ফোন দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বড় ধরনের প্রভাব রেখেছে। বিশেষত গ্রামীণ সমাজে। মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা গ্রামীণ সমাজের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক রূপান্তরে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে, যা গ্রামীণ সমাজের গতিশীলতা তৈরিতে প্রতিনিয়ত অবদান রেখে চলেছে। 

আমাদের দেশের শ্রমবাজার ও কাজের সুযোগের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে, দেশের বড় বড় শহরে কাজের সন্ধানে শ্রমিক, কর্মজীবী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সমাবেশ ঘটতে থাকে। দেশের সড়ক নেটওয়ার্ক যেমন এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের অবকাঠামোগত সুয়োগ তৈরি করেছে, মোবাইল নেটওয়ার্ক সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা  ও দৈনন্দিন যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটিয়েছে। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ আর্থিক লেনদেনে আচরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। 

‘ভিলেজ পে ফোন’ চালু হয়েছিল সুনির্দিষ্ট গুটিকয়েক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। প্রথমত, বাংলাদেশে বিশেষ কিছু অঞ্চল ও সারা দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের বা দেশের বাইরে অভিবাসিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথা বলার সুযোগ করা সেবা ও অর্থের বিনিময়ে; দ্বিতীয়ত, গ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাজের জন্য যায়। যাদের কেউ কেউ উপার্জনের জন্য পরিবারকে গ্রামে রেখে স্থায়ীভাবে শহরে থাকে। আবার কেউ কেউ গ্রামে কাজ কমে গেলে স্বল্প সময়ের জন্য মৌসুমি অভিবাসন করে শহরগুলোতে আসে। এদের সঙ্গে তাদের পরিবারের যোগাযোগ সেতু হয়ে ওঠে এই ‘ভিলেজ পে ফোন’। তৃতীয়ত, গ্রাম ও উপশহরজুড়ে নানা ধরনের প্রাত্যহিক চাহিদা তৈরি হতে থাকে। এ চাহিদার ধারাবাহিকতায় ক্রমেই এ সেবার মূলধারায় রূপ নেয়। দেশময় একটি মোবাইল অর্থনৈতিক মাঠ পর্যায়ের ভিত্তি ও কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে। শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জে গ্রাহক সংগ্রহ ও সেবা পৌঁছার লক্ষ্যে নতুন ধারার ডিস্ট্রিবিউশন ও ক্ষুদ্র আকারের এজেন্সি ব্যবসা শুরু হয়। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিমালিকানাধীন নিজস্ব মোবাইল সেটটি হওয়ার আগ পর্যন্ত, এ এজেন্ট পয়েন্টগুলো থেকে অর্থের বিনিময়ে মোবাইল ফোন সেবা দেয়া হতো। এ এজেন্টগুলো ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা এককভাবে মোবাইল ফোন সেবাভিত্তিক ক্ষুদ্র আকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে। যার পথ ধরে দেশময় মোবাইল অপারেটরদের অবকাঠামোগত স্থাপনা টাওয়ারের পাশাপাশি, একটি দক্ষ ও শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। 

বিগত প্রায় আড়াই দশকের মধ্যে দেশের প্রায় শতভাগ এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতাধীন। দেশের ১৬৩ মিলিয়ন মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এখনো এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এপ্রিল ২০১৯ থেকে জানুয়ারি ২০২০ সাল অবধি নতুন গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে ৭ মিলিয়ন (+৪.৫)। এসব মোবাইল গ্রাহকের প্রতিজন যদি ধরে নিই সাধারণ মোবাইল সেট ব্যবহার করে এবং তার মূল্য যদি গড়ে ২৫ ডলার (অর্থাৎ ২০০০ টাকা) হয়। মোবাইল খাতেও সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ডলার। মোবাইল ফোনের এ অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে, ধাপে ধাপে ডিজিটাল কাঠামোর ভিত্তিটা গড়ে উঠছে। 

২০০৮ সালে রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মোবাইল ফোন সহজলভ্যতার নীতি গ্রহণের পাশাপাশি সাবমেরিন কেবলের সংযোগ স্থাপন করে। দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় এসে তারা ডিজিটাল সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেয় এবং দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে। এই পর্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। জানুয়ারি ২০২০ সাল অবধি বাংলাদেশের শতকরা ৪১ ভাগ ইন্টারনেটের আওতাভুক্ত হয়েছে। দেশে ইন্টারনেটের মোট গ্রাহকসংখ্যা ৬৬.৪৪ মিলিয়ন এবং এ প্রবৃদ্ধির হার ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় শতকরা ১০ ভাগ (অর্থাৎ ৫.৮ মিলিয়ন)। একই সঙ্গে দেশকে ডিজিটাইজেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে নেয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে থ্রিজি (২০১৪) ও ফোরজি (২০১৮) টেকনোলজি গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত এক যুগ হতে চলল তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল টেকনোলজি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব রাখতে শুরু করেছে। কাজের জন্য মোবাইলে কথা বলার জায়গায় ইন্টারনেটের সূত্রে ডিজিটাল সেবার বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যার সরাসরি উপকারভোগী গ্রামের সাধারণ গরিব মানুষ। 

এ সামগ্রিক পরিস্থিতির আলোকে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি ডিজিটাল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গ্রামীণ সমাজের ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার কাহিনী নিচে তুলে ধরব। যা অবশ্যই হবে সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট ও গ্রামীণ সমাজে বড় ধরনের প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছে—এমন সব ক্ষেত্র।

ক. ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরির পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান সাফল্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক খাতে। এর আগে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি খাতের প্রথম প্রজন্মের সেবা ছিল ক্ষুদ্রঋণ। ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপারে ব্যবহারকারী ও সমাজের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের বাস্তবায়নকারী সংস্থাসমূহ যথাক্রমে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা, আরডিএসসহ বড়, ছোট, মাঝারি নানা এনজিও। বিগত পাঁচ দশকের ক্ষুদ্রঋণের পরিসর ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের বাংলাদেশ টাকায় ১২০৮ মিলিয়ন (ইউএস ডলার ১৪ বিলিয়ন), ৩৩ মিলিয়ন গ্রাহক ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহারকারী। ২০২০ সালে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপারে বড় সমালোচনা উচ্চসুদের হার। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার শতকরা ২০ থেকে ২৭ ভাগ। যেখানে ব্যাংকে শতকরা সুদের হার ৯ থেকে ১৬ ভাগ। মূলধারার ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে ঋণের টাকা পাঠানো সম্ভব হয়নি। 

খ. গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণের আওতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে ঋণ দেয়া হয়, তার পোর্টফোলিও থেকে গ্রামীণ সমাজের গতিশীলতা সহজেই বোঝা যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ক্ষুদ্রঋণের পোর্টফোলিও যথাক্রমে কৃষি শতকরা ৪৭ ভাগ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও ব্যবসা শতকরা ৩৪ ভাগ, পরিবহন ও যোগাযোগ শতকরা ৪ ভাগ, সামাজিক খাত শতকরা ৩ ভাগ, ছোট কুটির শিল্প শতকরা ২ ভাগ ও অন্যান্য শতকরা ৮ ভাগ। 

গ. ক্ষুদ্রঋণের এ পোর্টফোলিও থেকে খুব স্পষ্টভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজের পরিবর্তনশীলতা ও গতিশীলতার বিষয়গুলো দৃশ্যমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ও প্রবাসীদের দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স। বিদেশ-শহর ও গ্রামের এ অর্থপ্রবাহে বৈপ্লবিক গতিশীলতা এনেছে দ্বিতীয় প্রজন্মের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। আর আমার বিবেচনায় তৃতীয় প্রজন্মের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা হলো এজেন্ট ব্যাকিং। 

ঘ. গ্রামাঞ্চলে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর উপস্থিতির কারণে গ্রাম ও শহরের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের প্রসার ও স্থিতিশীলতা এ ব্যবধান কমাতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৭ সালের বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকা শতকরা ৮৮ ভাগ। ২০০৫ সালে যা ছিল শতকরা ৪৪ ভাগ। সে সঙ্গে বিদ্যুতের পাশাপাশি সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক আকারে গ্রামীণ অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়েছে, যেসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই বিদ্যুৎ খাত ও ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি উন্নয়ন গ্রামীণ গতিশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে, তা বলাই বাহুল্যে। 

ঙ. এমএফএস খাত অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করছে। গ্রাম ও শহরের আর্থিক রক্তসঞ্চালনের লাইফলাইন হয়ে উঠেছে। যার দুটি বড় প্রমাণ ২০১৪ সালে তত্কালীন বিরোধী দল যখন ঢাকার সঙ্গে গোটা বাংলাদেশের আগুন-সন্ত্রাসের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল কিংবা ২০২০ সালে ১১ মার্চের পর থেকে করোনাকালে দেশের এমএফএস খাতের ভূমিকার কারণে অর্থনৈতিক লাইফলাইন সচল ছিল ও রয়েছে। ২০১০ সালে এমএফএস খাত শুরু করলেও দ্রুত তার বিকাশ ঘটতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০ সালের আগস্ট মাসের মোট গ্রাহকের সংখ্যা ৯ কোটি ২৯ লাখ। বর্তমানে গড়ে মাসিক মোট লেনদেনের পরিমাণ ৪১ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। জুলাই মাসে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। যা ছিল এমএফএস খাতের সর্বোচ্চ অর্থ লেনদেন। এই বাড়তি টাকা লেনদেনের অন্যতম কারণ ঈদ উৎসব ও প্রবাসী জমানো টাকার একটি অংশ দেশে পাঠিয়ে দেয়া। 

চ. এমএফএসের ব্যবহারকারীরা মূলত পেশায় ও ব্যবসায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। এদের বড় অংশ দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহর বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রে কাজ করে। এরা তাদের উপার্জিত আয়ের একটি বড় অংশ গ্রামে তাদের পরিবারের কাছে পাঠায়, যা স্পষ্ট ফুটে ওঠে করোনাকালে এমএফএস খাতের লেনদেনের মাধ্যমে। করোনা-পূর্ব ২০২০ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির এমএফএস খাতের গড় লেনদেন ছিল ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। করোনার শুরুতে অর্থাৎ মার্চে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হয়েছিল। এপ্রিলে লেনদেন আগের মাস থেকে আরো শতকরা ২৭ ভাগ কমে দাঁড়ায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। মে মাসে এসে অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। এ মাসে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আগস্ট মাসে এসে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ মাসের লেনদেন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মতো ৪১ হাজার কোটি টাকা। 

ছ. সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতের ক্রমাগত বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের নগদ সহায়তা প্রদানের কৌশল গ্রহণ করছে। সেই সঙ্গে ধাপে ধাপে সরকারি নীতি ক্রমান্বয়ে অ্যানালগ থেকে ডিজিটালের দিকে এগোছে। প্রথম ব্যাংকের মাধ্যমে উপকারভোগীর কাছে সরকারি এ নগদ সহায়তা পাঠানো হতো। এসব ভাতা যথাক্রমে শিক্ষা বৃত্তি, বয়স্ক ভাতা, মাতৃকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযুদ্ধ ভাতা, তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ভাতা ও কৃষি ভর্তুকি বা সহায়তা ইত্যাদি। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে এমএফএসের মাধ্যমে এসব ভাতা প্রদানের পরিকল্পনা করছে। যে পরিকল্পনায় উপকারভোগীদের নিজস্ব পছন্দমতো এমএফএস অপারেটরদের বাছাই করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে (২০২০-২১) ৯৬ হাজার কোটি টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিভিন্ন ভাতা ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, করোনাকালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে ৫০ লাখ পরিবারকে ২,৫০০ হাজার টাকা, চারটি এমএফএস অপারেটরের মাধ্যমে ঈদের সময় অর্থসহায়তা বা আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে। তবে বাস্তবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৩৮ লাখ পরিবারকে করোনাকালীন এ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা গেছে। ডিজিটাল এ পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে এক দফা আর্থিক সুশাসনের মান উন্নয়ন করা গেছে। তবে প্রক্রিয়াটির সার্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক সুরক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় আকারের প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে পারে। যা সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার সুশাসন ও স্বচ্ছতা তৈরিতে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। 

জ. এমএফএস খাতে উপস্থিতির কারণে সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগগুলোয় নতুন ধরনের সৃজনশীলতা উদ্যোগ ও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিগত এক দশকে এরই মধ্যে তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের নানা কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান। করোনাকালে গোটা দেশ যখন লকডাউন তখন বন্দর, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ব্যাংকিং খাতের মতো জরুরি সেবা খাতের আওতাধীন ছিল। লকডাউনকালে ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে এবং ক্ষুদ্রঋণের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে। এমন পরিস্থিতিতে এমএফএস খাত দুর্যোগকালে ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেছে।

পরিশেষে বলব, আমাদের এ অর্জনকে ধরে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে উন্নয়ন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার জগতের ওপর আস্থা রাখতে হবে। নিয়মনীতির প্রতি সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যাহত সমর্থন থাকতে হবে। ক্ষমতা-প্রভাব ও ম্যানিপুলেশন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে না বলার সাধারণের শক্তি ও ক্ষমতার ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের আস্থা রাখতে হবে। উন্নয়নের সাফল্যের ভাগীদার করতে হবে সাধারণ মানুষকে। সমাজের সুবিধাবাদীরা যেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অর্জনের সুফল ইঁদুর হয়ে না কাটতে পারে, সরকারপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। সরকারি নীতিসহায়তা, মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের পরিশ্রমী উদ্যোগের মধ্যেই আমাদের গ্রামসমাজের রূপান্তরের গল্প লুক্কায়িত। কৃষক কৃষিতে নিজে, কৃষকের মেয়ে পোশাক শিল্পে, কৃষকের ছেলেটি প্রবাসী শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত সমাজের সৎ উদ্যোক্তা শ্রেণী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এরাই বাংলাদেশ ও গ্রামসমাজের রূপান্তরের নায়ক। এদের ঘাম, শ্রম, উদ্যোগ আর সততার মধ্যেই বাংলাদেশের উন্নয়ন গল্পের মূল শক্তি আর রহস্য লুক্কায়িত। এই সাধারণ মানুষরাই বাংলাদেশকে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে চলেছে উন্নয়নের পথে। এসব মানুষের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। 


খন্দকার সাখাওয়াত আলী: সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা নলেজ অ্যালায়েন্স, ইমেরিটাস ফেলো, উন্নয়ন সমুন্নয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন