বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

গ্রামীণ রূপান্তর ।। অবকাঠামো

প্রত্যন্ত অঞ্চলের আশার আলো সৌরবিদ্যুৎ

ড. মনজুর হোসেন

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নজর কাড়া ৬ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিশ্বে দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির তালিকায় স্থান করে নেয় এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। ২০০০ সালের পর থেকে প্রশংসনীয়ভাবে দারিদ্র্যের হারও কমতে থাকে এবং তা অর্ধেকে নেমে আসে। দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির নিয়ামক হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় রূপান্তর পরিলক্ষিত হয়। গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরকে মোটাদাগে তিন ভাগে ব্যাখ্যা করা যায়: এক. কৃষির রূপান্তর যা কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের পর যে যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে তার ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দুই. রেমিট্যান্স প্রবাহের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং তিন. গ্রামীণ অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নয়ন। আজকের এ আলোচনায় তৃতীয় বিষয়টির একটি দিক অর্থাৎ বিদ্যুতায়নের ওপর আলোকপাত করব। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিদ্যুতায়নের বাইরে থাকা গ্রামাঞ্চলের একটি বিরাট অংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে এক তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

সরকার যদিও শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত শতকরা হিসাবে প্রায় ৮০ শতাংশ লোক বিদ্যুেসবার আওতায় এসেছে। ভৌগোলিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে যেমন দ্বীপাঞ্চল বা অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুেসবা এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি উদ্যোগে ২০০৩ সালের দিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইডকলের মাধ্যমে ‘সোলারহোম সিস্টেম’ নামে সৌরবিদ্যুতের কর্মসূচি গ্রহণ করে। ঘরের চালায় একটি সৌর প্যানেল থাকে এবং ঘরের ভেতরে একটি ব্যাটারি থাকে। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রক্রিয়া বেশ সাশ্রয়ী এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনগণের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে একটি জনপ্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়। ২০০৩ সালে শুরু করে ইডকল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ পরিবারের কাছে এ সোলার হোমসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই বিআইডিএসের পক্ষ থেকে ইডকলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েক দফা মূল্যায়ন করা হয়। এতে এ কর্মসূচির অনেক অজানা তথ্য আমাদের কাছে পরস্ফুিট হয়। আমরা লক্ষ করি যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অর্থনীতির রূপান্তরে সৌরবিদ্যুৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

১. পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ

বিভিন্ন সক্ষমতার সোলার সিস্টেম পাওয়া যায়। দরিদ্র একটি পরিবারের জন্য ২০ ওয়াট পিকের একটি সিস্টেম মোটামুটি যথেষ্ট হওয়ায় এ সিস্টেমই মোটামুটি জনপ্রিয়। প্রায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে কিস্তিতে একটি ২০-৩০ ওয়াট ক্ষমতার সিস্টেম (যার বর্তমান বাজারমূল্য আরো কম) কিনলে একটি পরিবার নিরবচ্ছিন্নভাবে দু-তিনটি লাইট ও একটি ফ্যান ব্যবহার করতে পারে। একটি সিস্টেমের জীবন ২০ বছরের মতো হিসাব করা হয়। যদিও মাঝেমধ্যে ব্যাটারি বা অন্যান্য মেরামতের প্রয়োজন হতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে একটি পরিবার প্রতি মাসে আড়াই লিটার কেরোসিন সাশ্রয় করতে পারে, যার মূল্য ১৭০ টাকা। এতে সাশ্রয় হচ্ছে পুরো ৫০ লাখ পরিবারের বছরে ১ হাজার কোটি টাকার মতো। ভালো আলো প্রদান করা ছাড়াও সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব। কারণ এতে পরিবারের জন্য ক্ষতিকারক কেরোসিন ব্যবহার কমছে, যা বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করছে। 

২. সন্তানদের শিক্ষায় অবদান

গবেষণায় আমরা দেখতে পেয়েছি, সৌরবিদ্যুতের আলোর ফলে সন্তানদের পড়াশোনার উন্নতি হয়। যেমন বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে আগের চেয়ে পড়াশোনার সময় বেড়েছে এবং মোট স্কুলিং বছরের সংখ্যাও বেড়েছে। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার আগ্রহ বেড়েছে। তবে কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রে এ ফলাফল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। 

৩. আয়, ব্যয় ও কর্মসংস্থান

বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে পরিবারগুলোর বিভিন্ন ধরনের আয় বেড়েছে। সোলার মিনিগ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জিং, মোবাইল চার্জিং ও সার্ভিসিং, দোকান বা ব্যবসা অধিককাল পর্যন্ত খোলা রাখাসহ বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক কাজের পরিধি বেড়েছে। এছাড়া সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি সার্ভিসিং সংক্রান্ত মেকানিক্যাল কাজে কর্মসংস্থান হয়েছে। 

বিদ্যুৎ থাকার কারণে গ্রামীণ এলাকার জনগণ মোবাইল ফোন চার্জ দিতে পারছে এবং ব্যবহার করতে পারছে। ফলে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্য হয়েছে। আমাদের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ওইসব এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে খানার আয় ৩-১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে ব্যবসার সম্ভাবনাও বেড়েছে। মূলত ওইসব এলাকায় মাছ, পরিবহন, পোলট্রি ও গবাদিপশু এবং ছোট ব্যবসার প্রসার লক্ষ করা গেছে। যেসব পরিবারের সদস্যরা বিদেশে আছেন, তাদের সঙ্গে ভিডিও কল করা এবং যোগাযোগের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাওয়ার সুবিধা হয়েছে। এতে পরিবারগুলো তাদের বিপদে-আপদে দ্রুত অর্থের জোগানের ফলে ভালোভাবে সংকট মোকাবেলা করতে পারছে। 

৪. সৌরসেচ ও কৃষি প্রবৃদ্ধি

সৌরবিদ্যুৎ দ্বারা সেচ প্রকল্পের প্রচলন করা হয়েছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে গভীর বা অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সাশ্রয়ী দামে সেচ দিতে পারায় কৃষকদের কৃষি উৎপাদন খরচ কমে এসেছে। আমাদের গবেষণায় দেখতে পেয়েছি, সৌরসেচের দারা কৃষকরা পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচের পানি পাচ্ছেন। ফলে ফসলও ভালো হচ্ছে। এছাড়া সৌরসেচ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাসাবাড়িতে কাজে লাগানো হচ্ছে। ডিজেলের পরিবর্তে সৌরসেচ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় কৃষির ফলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

৫. নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা

গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৌরবিদ্যুৎ নারীর ক্ষমতায়নে ভালো ভূমিকা রাখছে। যেমন নারীরা বিভিন্ন রকম আয়বর্ধক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে সক্ষম হচ্ছে বিদ্যুতের সুবিধা ব্যবহার করে। রেডিও-টেলিভিশনের প্রচলন, মোবাইল ফোনের সহজ ও সুলভ ব্যবহারের ফলে নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য আদান-প্রদানে সক্ষম হচ্ছে। তথ্যের সহজগম্যতা তাদের ক্ষমতায়নে, বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। গ্রামগঞ্জে সাধারণত টয়লেট ঘরের বাইরে হয় এবং রাতের বেলায় টয়লেট ব্যবহারের সময় অনেক নারীই সহিংসতার শিকার হয়। বৈদ্যুতিক বাতি বা সৌর চার্জার বাতি এ সহিংসতা অনেকাংশে কমাতে সক্ষম হয়েছে। 

তবে সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারের টার্গেট অনুযায়ী এর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হয়নি। সরকারের নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারসংক্রান্ত নীতি অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে এর ব্যবহার মোট জ্বালানির ৫ শতাংশ ও ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীতকরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখনো এর পরিমাণ শতকরা হারে ৩ শতাংশের বেশি নয়। সৌরবিদ্যুতের বিশেষ করে মিনিগ্রিড ও সৌরসেচের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের ব্যবহার অনেকাংশেই সীমিত করেছে। তাছাড়া সরকারের সর্বজনীন বিদ্যুতের সংযোগ দেয়ার নীতির কারণে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব বা মনোযোগ হারিয়েছে। তবে ফসিল ফুয়েল ব্যবহার করে জ্বালানি উৎপাদনের বর্তমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, যেমন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, গ্যাসের স্বল্পতা এবং পরিবেশের কথা মাথায় রেখে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরো বাড়ানোর প্রতি সবিশেষ নজর দিতে হবে।


ড. মনজুর হোসেন: বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন