বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

গ্রামীণ রূপান্তর ।। অবকাঠামো

সেচ অবকাঠামো: কৃষির অগ্রগতির পেছনের শক্তি

মো. জিয়াউল হক

বাংলাদেশ নদীমার্তৃক ও ভাটির দেশ। প্রাচীনকালে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য নদ-নদী, খাল-নালার পাড় ধরে গড়ে উঠেছিল গ্রাম ও গঞ্জ। আদিকালে যোগাযোগ এবং পরিবহনের একমাত্র ও প্রধান মাধ্যমই ছিল নদ-নদী ও খাল-নালা। আর তার পাড় ধরে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা, যার নিদর্শন আজো দেখতে পাওয়া যায়। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশের ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ ২৯ হাজার ঘনমিটার/সেকেন্ড ও সর্বোচ্চ প্রবাহ ১৩৭ দশমিক ৭০ লাখ ঘনমিটার/সেকেন্ড। দেশে ভূ-উপরিস্থ পানি সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩৫০ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিক মিটার) এবং প্রবাহকালে বছরে প্রায় ১৪০০ মিলিয়ন টন পলি নিয়ে আসে, যা এসব নদ-নদী, খাল-নালার প্লাবন ভূমি এবং সাগর-মহাসাগরে পতিত হয় (সূত্র: বাংলা পিডিয়া)। ফলে পুনঃখননের পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে নদ-নদী, খাল-নালা ভরাট হয়ে তলদেশের উচ্চতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপরিকল্পিত/মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ কারণে এসব প্রাকৃতিক নদ-নদীগুলো কালের পরিক্রমায় প্রায় বিলুপ্তির পথে এবং বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে খাল ও নালাগুলো। অপরদিকে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে সারা দেশ বন্যায় কবলিত হয়ে ফসল ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কালের বিবর্তনে নদ-নদী ও খাল-নালাগুলো উজানের পলি ভরাটের কারণে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বর্তমান সভ্যতার যুগে যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যম হলো স্থল, জল ও আকাশপথ। বাংলার ইতিহাসে প্রায় তিন হাজার বছর আগে এ অঞ্চলে প্রথম সেচ খাল খনন করা হয়েছিল। সে থেকে আজ পর্যন্ত দেশে সর্বত্র পানির প্রবাহ এবং নিষ্কাশনের প্রয়োজনে খাল-নালা খনন/পুনঃখনন/সংস্কার কার্যক্রম চলে আসছে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অপর নাম জলবায়ু পরিবর্তন। তার প্রভাবে গলে যাচ্ছে লাখো বছরের জমাট বাঁধা হিমবাহ। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সৃষ্ট হচ্ছে অনাবৃষ্টি, অকালবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রকৃতির এ ভারসাম্যহীনতার সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাব পড়ছে নদ-নদী, খাল-নালা ও সর্বোপরি কৃষির ওপর।

চারিদিকে দিগন্তশায়ী বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঝখানে সবুজ দ্বীপের মতো স্বপ্নমাখা একটি ভূখণ্ডে যে জনবসতি বসবাস করে তাকে গ্রাম বলে। এটি প্রধানত কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে মনুষ্য সম্প্রদায়ের ছোট জনবসতি সমষ্টির একক। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৭০% গ্রামাঞ্চল এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩.৩৭% গ্রামে বসবাস করে থাকে। দেশের গ্রামাঞ্চলগুলো শহর থেকে দূরে অবস্থিত এবং যেখানে শহরের মতো তেমন কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়নের ছোঁয়া কম লাগায় কৃষিতেও রয়ে গেছে মান্ধাতা আমলের চাষাবাদ। গ্রামের সড়কগুলো সাধারণত উঁচু বাঁধের ওপর নির্মিত এবং প্রতি বছর বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে ভেঙে যায়। ফলে ফি বছর মেরামত করার প্রয়োজন হয়। গ্রামবাংলার চাষীরা চাষের সরঞ্জামাদি যেমন- কৃষিজ যন্ত্রপাতি, উৎপাদিত শস্য পরিবহন এবং এ জনপদের বাসিন্দা কৃষক/কৃষানি, জেলে, কামার-কুমার সবাই এ পথে যাতায়াত করে থাকে। যেখানে বসবাসরত সম্প্রদায় কৃষিকাজ, কৃষিভিত্তিক ও বিভিন্ন ছোটখাটো কুটির শিল্পে কাজের মাধ্যমে খুব সাধারণভাবে জীবনযাপন করে থাকে। গ্রামবাংলার জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো তাদের নিজস্ব পেশার দৈনন্দিন প্রয়োজনে বসতবাড়ি থেকে খামারে, পাড়ায়, মহল্লায়, ফসল উৎপাদনে কৃষি জমিতে, মত্স্য চাষ/আহরণের জন্য নদ-নদী, খাল-বিলে স্বাভাবিক চলাচলে কিছু পথের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ পথগুলো সাধারণত নদ-নদী, খাল-নালার পাড় ঘেঁষে অথবা গ্রামের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে গ্রামের পর গ্রাম বয়ে যায়। এ মাটির তৈরি পথগুলোকে সাধারণত মেঠো পথ বলা হয়ে থাকে। গ্রামের এ বিপুল জনগোষ্ঠীর চলাচল, যোগাযোগ এবং পরিবহনের জন্য যে রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয় তাকে গ্রামীণ সড়ক বলা হয়।

বিএডিসির ক্ষুদ্রসেচ উইংয়ের অভিলক্ষ্য হলো—‘সেচ প্রযুক্তির উন্নয়ন, ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, সেচ দক্ষতা ও সেচ এলাকা বৃদ্ধি’। এ অভিলক্ষ্যকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএডিসি কর্তৃক সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নির্দেশনায় সেচ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সারা দেশে খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কার এবং এসব খাল-নালায় সাবমার্জডওয়ার নির্মাণসহ বিভিন্ন সাইজ, ধরন ও ডিজাইনের সেচ অবকাঠামো (ফুট ব্রিজ/বক্স কালভার্ট/কালভার্ট/পাইপ/কালভার্ট/ক্যাটল ক্রসিং/সাইফুন/সাবমার্জড ওয়ার/স্লুইচ গেট/রেগুলেটর/ওয়াটার পাস/একুইডাক্ট /ইউ-ড্রেন/কনডুইট) নির্মাণ কার্যক্রম গ্রহণ করে পানির জলাধার সৃষ্টি ও প্রবাহ ঠিক রেখে সেচ পরিচালনা হাতে নেয়া হয়েছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯ ) প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়েছে এবং তা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে সারা বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন এবং সব উৎপাদন ব্যবস্থা ও কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাচ্ছে। কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী কৃষিক্ষেত্রের করণীয় প্রতিপালনে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবাদযোগ্য কোনো জমি ফেলে না রেখে প্রতি ইঞ্চি জমিতে আধুনিক প্রযুক্তির কলাকৌশল অবলম্বন করে উন্নতজাতের ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। 

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ছাড়াও স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) খাল-নালা, নদ-নদী খনন/পুনঃখনন কাজ করে থাকে। এসব হাজামজা নদ-নদী, খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের ফলে ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে অনাবাদি জমি আবাদি জমিতে রূপান্তর, উপকূলীয় অধঃপতিত জমি সেচের আওতায় আনয়ন এবং বৃষ্টির পানির সংগ্রহ ও সংরক্ষণ মাধ্যমে সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। উপরোক্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, সারা দেশে খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের ফলে শক্তিচালিত পাম্প (এলএলপি) ও ভাসমান পাম্প এবং রাবার/হাইড্রোলিক এলভেটর ড্যাম ক্ষেত্রায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯-১০ ও ২০১৮-১৯ সেচ মৌসুমে ভূ-উপরিস্থ পানির সাহায্যে সেচকৃত এলাকা যথাক্রমে ১০,৯০,২৩৯ হেক্টর ও ১৪,৮৭,৪৮৭ হেক্টর এবং তদনুযায়ী পানি উত্তোলনের পরিমাণ যথাক্রমে ১৩.৩১ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিক মিটার) ও ১৮.০৫ বিসিএম (প্রায়)। এতে প্রমাণিত বিগত দশকে খাল-নালা, নদ-নদী পুনঃখনন/সংস্কারে ভূ-উপরিস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ প্রায় ৩৬% এবং ভূ-উপরিস্থ পানিতে জৈব সার থাকায় ফসলের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাসে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ চাল ৩ কোটি ৮৭ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের ফলে ইন্দোনেশিয়াকে অতিক্রম করে গত অর্থবছরের চতুর্থ অবস্থান থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তায় বিরাট বড় অর্জন। এছাড়াও ২০০৯-১০ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বিএডিসি ৮,৭১৪ কিমি ও বিএমডিএ ১,২৫৯ কিমি খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারে ভূ-উপরিস্থ পানির ধারণ ক্ষমতা ২০০ এমসিএম (মিলিয়ন কিউবিক মিটার) বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণ (Ground Water level Monitoring) প্রতিবেদন অনুযায়ী বিগত দশকে গড় পানির স্তর ঢাকা এবং অপর ৫-৬টি জেলা ব্যতীত সারা দেশে পুনর্ভরণে পানির স্তরের উন্নতি হয়েছে। এতে প্রমাণিত খাল-নালা পুনঃখননে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ হচ্ছে। এ খনন/পুনঃখননকৃত খালের পাড়ে ও মাঝে মাচা তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের উচ্চমূল্যের শস্য ও শাক-সবজি (High Value Crops & Vegetables) উৎপাদন ও বর্জ্র নিরোধক গাছ যেমন- তাল, খেজুর ও সুপারি রোপণ করে কৃষি/শ্রমিকের জানমাল রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট ফসলি জমির প্রায় ৫% অর্থাৎ আবাদযোগ্য জমির প্রায় ১০% শাক-সবজি উৎপাদনে ব্যবহূত হচ্ছে। এ অল্প পরিমাণ জমি থেকে ক্রমবর্ধিষ্ণু বিপুল জনগোষ্ঠীর সবজি চাহিদা মেটানো হচ্ছে। যদিও শাক-সবজিভিত্তিক পুষ্টি গ্রহণের উপাত্ত ও পরিমাণে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন- গড়ে দৈনিক পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির গ্রহণ করা প্রয়োজন ২০০-৩০০ গ্রাম। আর গ্রহণ করছে মাত্র ১০০-১৬৬ গ্রাম। খাল-নালা খনন/পুনঃখনন কার্যক্রম সেক্ষেত্রে শাক-সবজির উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় আরো দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এতে গ্রামীণ জনগণের পুষ্টিমান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কার কার্যক্রমের কর্তনকৃত মাটি খালের দুই পাড় বা এক পাড়ে বাণ রেখে মাটি ফেলে তা কম্পেকশন, ড্রেসিং ও লেভেলিং এবং ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে পায়ে হাঁটা চলাচলের মেঠোপথের সৃষ্টি এবং গ্রামীণ জনসাধারণের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। এতে কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল পরিবহন এবং ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেছে। খাল-নালার পানিতে উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান জৈব পদার্থ থাকায় মাটির বুনট ও গঠন মজবুত হচ্ছে এবং রাসায়নিক সার ও সেচের পানি কম প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কৃষকের সেচ ও উৎপাদন খরচ কম পড়ছে। এছাড়াও খনন/পুনঃখননকৃত খাল-নালার জমাটকৃত পানিতে পাট পচানো ও আঁশ ছাড়ানোর সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি এবং মত্স্য চাষ, হাঁস-মুরগি পালন ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। অপরদিকে সরকারি খাস জমি পুনরুদ্ধার এবং নৌপথের যোগাযোগের সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত এবং সেচের পানির উৎস ও পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ কৃষক/কৃষানির কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৃদ্ধি এবং নদ-নদী, খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের প্রভাব কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে পড়ছে। 

আবার অনেক সময় খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের ফলে এর আগে নির্মাণকৃত একটি মেঠোপথ/রাস্তা/কৃষি মাঠ/গ্রাম/পাড়া দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে কৃষিজ যন্ত্রপাতি, মাঠের উৎপাদিত ফসল, যোগাযোগ, পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে অন্তরায় হয়। এ সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে স্থানীয় জনসাধারণ/জনপ্রতিনিধির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে খাল-নালার প্রস্থতা ও গভীরতা অনুযায়ী সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়ে থাকে। খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কার, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নিষ্কাশন, সেচ কার্যক্রম পরিচালনা, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু-সুচারুভাবে সেচ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের নিমিত্ত বিভিন্ন সাইজ, ধরন ও ডিজাইনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এসব সেচ অবকাঠামো খাল-নালায় গ্রামীণ মেঠোপথ বা গ্রামীণ সড়কে নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এ পর্যন্ত খাল-নালার পাড়ে প্রায় ৩,৫০০ কিমি গ্রামীণ মেঠোপথ সৃষ্টির ফলে কৃষক তার কৃষিজ যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদিত ফসল পরিবহনের সুযোগ বৃদ্ধি ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে। তাই ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমির ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের বিকল্প নেই।


খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের চ্যালেঞ্জগুলো:

১. প্রবাহ ও প্রশস্থতা অনুযায়ী প্রি-ওয়ার্ক ড্রইং ও ডিজাইন না হওয়া;

২. ভূমি দস্যু কর্তৃক দখল, ফসল ফলানো ও স্থাপনা তৈরি করা;

৩. রেকর্ড অনুযায়ী মৌজা ম্যাপে খালের চিহ্ন না পাওয়া;

৪. স্থানীয়ভাবে খালের পাড়ে রোপিত বৃক্ষ কর্তন সমস্যা;

৫. নতিমাত্রা (Gradient) অনুযায়ী খাল পুনঃখননের না হওয়া;

৬. খালের পাড়ের বাণ (Bun) রেখে কর্তনকৃত মাটি ফেলা সমস্যা; 

৭. পাড়ের মাটি কম্পেকশন, ড্রেসিং ও লেভেলিং সঠিকমাত্রায় না হওয়া;

৮. খালের দুই পাশের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া;

৯. প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বন্যায় পুনঃখনন কাজে সমস্যা;

১০. জনসাধারণ কর্তৃক কর্তনকৃত মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া;

১১. প্রি-ওয়ার্ক এবং পোস্ট-ওয়ার্ক কাজে নানা অভিযোগ আনয়ন; 

১২. পলি ভরাট ও তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধিন ফলে ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া।

উপরোক্ত চ্যালেঞ্জগুলো সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করে বর্তমানে সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ ২৬.৬২%, যা আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ৩০% উন্নীতকরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে বিভিন্ন ক্ষমতার সেচযন্ত্র স্থাপন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নিষ্কাশন, যোগাযোগ ও পরিবহনের নিমিত্ত বিভিন্ন ধরন, সাইজ এবং ডিজাইনের ৭,৮৭১টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫,০০০ মিটার। বর্ণিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে গ্রামের বিপুল জনগোষ্ঠীর কৃষিজ যন্ত্রপাতি, উৎপাদিত ফসল, পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ফলে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নে গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি এবং দেশের তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনীতি বিকাশে বিরাট অবদান রাখছে। সুতরাং খাল-নালা পুনঃখনন/সংস্কারের ফলে সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের পাশাপাশি গ্রামীণ মেঠোপথের সৃষ্টি হচ্ছে। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার গ্রাম আমার শহর’-এর বীজ বপণ করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা, দেশনেত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৮-তে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’-এ বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ অঙ্গীকারের আওতায় ‘প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে’ মর্মে নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছেন। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী কৃষিক্ষেত্রের করণীয় নির্দেশনা প্রতিপালন, বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৮, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে রূপকল্প (Vision)-২০২১ সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি (SDG) বাস্তবায়ন, ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন এবং শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনার (Delta Plan-2100) আলোকে বিএডিসি কর্তৃক গৃহীত ও গৃহীতব্য কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের সব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করি।


মো. জিয়াউল হক: প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ)

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন