বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

গ্রামীণ রূপান্তর ।। অবকাঠামো

কৃষিপণ্য পরিবহনে ট্রাক্টর যখন সংযোগের বাহন

সাদিদ জামিল

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে দেশ আজ অনেকটাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিপরীতে কমছে কৃষিজমি। কৃষি শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান হারে শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে স্থানান্তরের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে শ্রমিক সংকট। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে আসবে। আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষির প্রয়োজনে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। চাষাবাদ ও সেচকার্যে যন্ত্রের ব্যবহার প্রায় ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। চাষাবাদে যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান রেখে চলেছে ট্রাক্টর। তবে সাম্প্রতিক কালে এ যন্ত্রটি শুধু চাষাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বহুমুখী ব্যবহার দেশের গ্রামীণ জনপদে নানামুখী প্রভাব রাখছে। গ্রামীণ কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম এখন ট্রাক্টর। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পেলেও সনাতন পদ্ধতির কৃষিকাজে এ প্রজন্মের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এরূপ প্রেক্ষাপটে আগামী দিনের শিক্ষিত যুবকদের কৃষিকাজে সম্পৃক্তকরণে দেশে যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। সেখানে তরুণদের আয় উপার্জনের একটি বড় মাধ্যম হচ্ছে এ ট্রাক্টর। আবার কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি মানেই ট্রাক্টরের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। কেননা গত কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশের কৃষিপণ্য উৎপাদন ছাড়িয়েছে সাত কোটি টন। এসব কৃষিপণ্য কৃষকের ক্ষেত থেকে বাজারে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ট্রাক্টর। কেননা এ বাহনটিই একমাত্র পরিবহন ও সহজলভ্য হিসেবে পণ্য পরিবহনে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে ট্রাক্টরের আগমন ঘটে স্বাধীনতা-পূর্বকালে, প্রথমত চা বাগান ও চিনিকলের মাধ্যমে। ষাটের দশকে কুমিল্লায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক স্বনামধন্য কীর্তিমান আখতার হামিদ খান কয়েকটি ট্রাক্টর আনেন এবং তা দিয়ে কুমিল্লার কোন কোন এলাকায় ট্রাক্টরের সাহায্যে কীভাবে চাষাবাদ করা যায় তা প্রদর্শন শুরু করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ও বাংলাদেশে ট্রাক্টরের প্রবেশাধিকার চা বাগান ও চিনিকলে সীমিত থাকে। স্বাধীনতা-পূর্বকালে সত্তরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে তদানীন্তন সরকার ও তখনকার কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মাধ্যমে একপর্যায়ে কিছু ট্রাক্টর আমদানি করে কিন্তু নানা কারণে তা কৃষিকাজে তেমন ব্যবহূত হয়নি, অব্যবহূত থেকে তা একসময় নষ্টও হয়ে যায়।

স্বাধীন দেশে আধুনিক যান্ত্রিক চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সময় ও শ্রমের সাশ্রয়ের জন্য মানুষের আগ্রহ একসময় বাড়তে থাকে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশে পাওয়ার টিলারের যাত্রা শুরু হয় এবং তা জনপ্রিয় হতে থাকে। মানুষের কৃষিযন্ত্রের সঙ্গে এভাবেই পরিচিতি ঘটে। কিন্তু পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের মধ্যে চাষাবাদে গুণগত কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। প্রাথমিকভাবে ট্রাক্টরের সাহায্য চাষাবাদে খরচ কমানো যায়, তাছাড়া ট্রাক্টরের লাঙল মাটির প্রায় ছয় ইঞ্চি গভীরে পৌঁছতে পারে, যা পাওয়ার টিলারের পক্ষে দুই বা তিন ইঞ্চির বেশি পৌঁছা সম্ভব হয় না। তেত্রিশ ডেসিমলের একটি জমি চাষে ট্রাক্টরের প্রয়োজন পঁচিশ বা ত্রিশ মিনিট, যা পাওয়ার টিলারের জন্য প্রয়োজন দুই ঘণ্টার ও অধিক সময়। বারবার চাষাবাদের ফলে জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার কারণে মাটির অধিক গভীরে চাষ দিতে পারলে নিচের মাটি ওপরে আসে, ফলে মাটির উর্বরতাশক্তি বৃদ্ধি পায়। এ কারণে বাংলাদেশে যান্ত্রিক চাষাবাদের সুফল লাভের জন্য জমিতে ট্রাক্টরের মাধ্যমে চাষ করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদে আজকের যে ব্যপ্তি আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে সরকারের সার্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টর একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৩ সালে আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কথা চিন্তা করি। তখন দেশে পাওয়ার টিলারে চাষাবাদ শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ চিনি শিল্প করপোরেশন তাদের নিজস্ব খামারে কিছুসংখ্যক বেলারুশ ট্রাক্টর ব্যবহার শুরু করেছে এবং টি গার্ডেনে অল্পকিছু ট্রাক্টর ব্যবহার জনপ্রিয় হতে শুরু হলে নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেড কৃষিতে ট্রাক্টর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ভারত থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম ট্রাক্টর আমদানি শুরু করে। প্রথমে আমরা কুমিল্লা জেলায় কাজ শুরু করি। ট্রাক্টরে চাষাবাদ করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ ও দোলাচলের মুখোমুখি হই। কৃষকদের চিন্তা ছিল ছোট জমিতে কীভাবে ট্রাক্টর ঘুরবে। ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করলে ফসল ফলবে তো? অন্যের জমি বা পাশের জমি মাড়িয়ে ট্রাক্টর কীভাবে উদ্দিষ্ট জমিতে আসবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হাল ছেড়ে না দিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আমরা কাজে লেগে থাকলাম। জমি কৃষকের মনমতোই তৈরি হতে লাগল। এভাবে কৃষকদের মধ্যে একটু একটু করে ট্রাক্টরের প্রতি আস্থার সঞ্চার হওয়া শুরু হলো।

ট্রাক্টর যখন কোনো জমিতে চাষ করত তা দেখে পাশের জমির মালিকরাও অনুরোধ করা শুরু করল যেন তাদের জমিও ট্রাক্টরে চাষ করে দেয়া হয়। এতে কৃষি শ্রমিকও কম লাগল আর সময়ও বেঁচে গেল। ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদে বহু রকম সুবিধা দেখে কৃষক অত্যন্ত খুশি। এভাবে কৃষকের সাকল্য খরচ কমে গেল, পাশাপাশি ফলনও বেশি হলো। ক্রমান্বয়ে ট্রাক্টরের চাহিদা বাড়তে শুরু করল। ক্রমান্বয়ে কৃষক ট্রাক্টরে চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আরো অন্যান্য কোম্পানি ও ট্রাক্টর আমদানিতে আগ্রহী হয় এবং বাংলাদেশে ট্রাক্টর ব্যবসা একসময় একটি শিল্পে পরিণত হয়ে ওঠে, যা বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোতে খুব প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করছে। এরই মধ্যে সরকার ট্রাক্টরের মাধ্যমে চাষাবাদকে জনপ্রিয় করার জন্য আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা প্রদান করে। সরকারের সহায়ক ভূমিকায় বাংলাদেশে ট্রাক্টরের চাষাবাদ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এখন বাংলাদেশে প্রায় সত্তর হাজার ট্রাক্টর বিদ্যমান, যার মধ্যে পঞ্চাশ হাজার ট্রাক্টর শুধু চাষাবাদে নিয়োজিত। ফলে বাংলাদেশের চাষাবাদে ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। চাষাবাদে যন্ত্রের ব্যবহার প্রায় শতভাগের কাছাকাছিতে পৌঁছে যাওয়ায় সরকার চাষাবাদের যন্ত্রে জমি কর্ষণে আর্থিক ভর্তুকি প্রদান এখন বন্ধ করে দিয়েছে, যদিও ধান কাটা, মাড়াই ও চারা রোপণ যন্ত্রে এখনো ব্যাপকভাবে সরকার আর্থিক প্রণোদনা বা ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

ট্রাক্টর চাষাবাদ ছাড়াও গ্রামীণ অর্থনৈতিক জীবনে এক ব্যাপক বিপ্লব সাধন করেছে। সে বিপ্লবটি এনেছে গ্রামীণ যানবাহন কাঠামোতে পণ্য পরিবহনে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে গ্রামীণ যানবাহনের মধ্যে পণ্য পরিবহনে গরুর গাড়ি একটি অপরিহার্য বাহন ছিল। কারণ স্বল্প দূরত্বে স্বল্প পণ্য পরিবহনের জন্য আর্থিকভাবে ট্রাক বা মিনি ট্রাক ব্যয়বহুল, তাছাড়া এসব পরিবহন ভাড়া করার জন্যও দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয়। ট্রাক্টর কৃষিকাজের পরে একটি ট্রলির সাহায্যে সহজে পণ্য পরিবহন করতে পারে। বাংলাদেশে এককভাবে কৃষিপণ্য পরিবহনও একটি বড় বিষয়। ২০১৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে শুধু চাল, গম, ভুট্টার উৎপাদন হয়েছে ৩৮১.৪১ লাখ টন। নানা পর্যায়ে এসব শস্যের সঙ্গে পরিবহনের প্রশ্ন সম্পৃক্ত। প্রাথমিকভাবে জমি থেকে ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদিকে বাড়িতে বা চাতালে নিয়ে যেতে হয়। এ শস্যকে আবার রাইসমিল কিংবা বাজারেও নিয়ে যেতে হয়। নানাভাবে এসব পরিবহনে পরিবহন ব্যয় সাশ্রয় যেমন বড় একটি ইস্যু, তেমনি দ্রুততর পরিবহন ও ব্যবসায়িক কারণে খুব প্রয়োজন।

তাই এসব শস্যপণ্য পরিহনে ট্রাক্টর যেমন একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে, তেমনি তা পণ্য পরিবহন ও ট্রাক্টরের ব্যবহারের বহুমুখিতারও একটি বিষয় হতে পরে। বাংলাদেশে বার্ষিক শস্য উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় আনলে শুধু শস্য পরিবহনে ট্রাক্টরের ব্যবহার খুব তাত্পর্যপূর্ণ মনে হবে। শস্য বোঝাতে চাল, গম, ভুট্টার বাইরেও ডাল, তেলজাতীয় সব শস্যদানা, আলু, তরমুজ ও শাকসবজি ইতাদিও বোঝায়। বাংলাদেশে বার্ষিক শস্য উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় সাত কোটি টন। 

বর্তমানে বাংলাদেশ আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছে। বছরে বাংলাদেশে আলু উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় এক কোটি টন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দশম স্থানে অবস্থান করছে। এর বইরেও মৌসুমি ফল যেমন আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের যে প্রবাহ শুরু হয়েছে তাতে যুক্ত হয়েছে নানা নতুন নতুন জাতের ফলও যেমন ড্রাগন ফল, মাল্টা, এভোকাডো, কোকো, আঙুর, পিচফল, রাম্বুটান ইত্যাদি। শুধু সবজি উৎপাদন হয় বর্তমানে ষাট ধরনের দুইশ জাতের। আমাদের নিজেদের আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা, কলা, লেবু ইত্যাদি নানা জাতের ফল তো আছেই। এসবের বাণিজ্যিক উৎপাদনও বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথমসারির ফল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের কৃষিপণ্য উৎপাদনের এ সমীক্ষায় কৃষিপণ্য পরিবহনও যুক্তিযুক্তভাবে জড়িত। প্রথমত এসবের প্রক্রিয়াকরণ স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং তারপর বাজারজাত করা। এ ব্যাপারে পরিবহন ব্যয় কমানো, দ্রুত পরিবহন এবং গ্রামীণ সড়কে স্বচ্ছন্দে চলাচল, কৃষকের খামার বা বাড়ি, বাগান ইত্যাদিতে যাওয়ার মতো পরিবহন এসব প্রশ্নও এসেই যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুফলের কথা আলোচনা করলে মোটা দাগে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা উঠে আসে। প্রথমেই আলোচনায় আসে গ্রামীণ বা পল্লী সড়কের প্রসঙ্গ। বর্তমানে ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে পল্লী সড়ক বা গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন হয়েছে ১১৩২১০ কিলোমিটার। এটি বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি বড় মাইলফলক, যা কেবল আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ফলে সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশির ভাগ জনগণ নিজগ্রাম থেকে সর্বোচ্চ দুই কিলোমিটারের মধ্যে পাকা সড়ক ব্যববহারের সুবিধা পায়, যে সড়ক আবার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে গ্রামীণ হাটবাজার কিংবা উপজেলা সদরে বা অন্য কোনো বড় মোকাম বা গ্যারেজে কৃষক সহজেই তার উৎপাদিত শস্য নিতে পারছেন। এতে কৃষক যেমন তার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন, সঙ্গে তার এ বাড়তি আয় নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করছে এবং নতুন কর্মসংস্থানেরও। গ্রামীণ বা পল্লী সড়ক যোগাযোগের এ সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছে ট্রাক্টরের জন্য। ট্রাক্টর কৃষকের চাষের কাজের পর গ্রামীণ সড়কে কৃষিপণ্য পরিবহন করে বাড়তি রোজগারের সংস্থান করতে পারছে, যা কৃষকের মাসিক লোন বা লিজের কিস্তি পরিশোধে সহায়তা করছে।

আগেই বর্ণনা করেছি বর্তমানে যে ট্রাক্টর কৃষকের হাতে পৌঁছেছে তা কৃৃষককে মাসিক কিস্তি সুবিধায় লোন বা লিজে নিতে হয়েছে। তাছাড়া এ লিজ-লোন বা মাসিক কিস্তি প্রদানে ট্রাক্টরের মালিক হওয়ার সুবিধায় গ্রামে উদ্যোক্তা শ্রেণীও সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের ট্রাক্টর দিয়ে অন্যের জমি চাষ করে এবং বাকি সময় কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যাপৃত হয়। বাংলাদেশে বোরো, আমন ও আউশ এই তিনটি ধান বুননের সময়কে বিবেচনায় নিলে ট্রাক্টরকে চাষাবাদের কাজে নিয়োগের সময় সর্বোচ্চ তিন মাস কিংবা এর কমও হতে পারে। বছরের বাকি নয় মাস যদি ট্রাক্টর কর্মহীন থাকে তাহলে ট্রাক্টরের রোজগার আর প্রায় থাকেই না বলা চলে। ফলে কৃষক বা গ্রামীণ উদ্যোক্তার পক্ষে লোন বা লিজের মাসিক কিস্তি প্রদানও সম্ভব হয়ে উঠবে না।

যেহেতু জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর একটি অপরিহার্য কৃষিযন্ত্র, যা চাষের খরচ কমানো, শ্রমনির্ভরতা হ্রাস করা এবং সময় সাশ্রয়ের জন্য কৃষিকাজে এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনার এখন আর দরকার আছে বলে মনে হয় না। এটি বোধগম্য যে ট্রাক্টরের ব্যবহারে কৃষককে উৎসাহিত করা খুব প্রয়োজন। যেহেতু শুধু কৃষিকাজ করে প্রয়োজনীয় রোজগার বা ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ সম্ভব নয়, তাই ট্রাক্টরের বহুমুখী ব্যবহারও খুব প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণ সড়কে কৃষিপণ্য পরিবহন যেমন করা যায়, তেমনি ভোগ্যপণ্য পরিবহনও করা যায়। গ্রামীণ হাটবাজার, মোকাম, গঞ্জ ইত্যাদিতে কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহন বর্তমান সময়ে ব্যবসার গতিশীলতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। ট্রাক্টর এক লিটার ডিজেলে দশ থেকে বারো মাইল যাতায়াত করতে পারে, যা একটি ট্রাক বা এ রকম পরিবহন করতে পারে পাঁচ বা ছয় মাইল। তাছাড়া ট্রাক্টরের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও খুবই কম। ট্রাক্টরে ব্যবস্থাপনার জন্য একজন ড্রাইভার যথেষ্ট। ফলে মাইলপিছু যাতায়াত খরচ ট্রাক্টরে ট্রাকের বা এমন পরিবহনের এক-চতুর্থাংশ। ট্রাক্টরে স্বল্পদূরত্বে স্বল্পসংখ্যক মালামালও পরিবহন করা যায়। ফলে ট্রাক্টর কৃষিকাজের বাইরেও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম।

যে বিষয়টির দিকে আমাদের নজর দিতে হবে তা হচ্ছে ট্রাক্টরের ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ। সে বিষয়টি অর্জন করা খুব কঠিন হবে না। যেসব কোম্পানি ট্রাক্টরের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তারা ড্রাইভার ট্রেনিং ও ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণের জন্য ড্রাইভারদের সহায়তা করতে পারে। কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা এবং চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে নাসিমন, করিমনের মতন কন্ট্রোলিং গিয়ার কিংবা ব্র্যাক, স্পিডমিটার ইত্যাদিবিহীন ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার বিভিন্ন স্থানে বেড়ে যাচ্ছে, যা সড়ক পরিবহনকে বিপদগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিকশাভ্যান কিংবা ব্যাটারিচালিত যান। এসব যানও পরিবহন ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। কম ওজনের বা স্বল্প মালামাল স্বল্প দূরত্বে পরিবহনের জন্য ভোক্তা এসব পরিবহন ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে ভোক্তার চাহিদা মেটানোর জন্য ট্রাক্টর যথেষ্ট সহায়ক একটি যান। বর্তমানে সড়কে ট্রাক্টর চলাচলে কোনো নীতিমালা না থাকার ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ট্রাক্টরের মালিকদেরও রোজগার বন্ধ হচ্ছে। এতে গ্রামীণ উদ্যোক্তারাও কৃষিযন্ত্রে বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

ট্রাক্টরের মাধ্যমে যান্ত্রিকীকরণ ও পণ্য পরিবহনকে এগিয়ে নিতে হলে কোনো সার্ভিস প্রভাইডারকে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংকঋণ সহজলভ্য করতে হবে। কৃষি পর্যায়ে বাকিতে বিক্রির মাধ্যমে আমাদের ঋণের বোঝা ভারী হয়ে গেলে, সারা দেশ থেকে কিস্তি আদায়ের মতো ক্ষমতা বা সুবিধা না থাকলে আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানও কখনো বড় সমস্যায় পড়ে যেতে পারে। তখন যান্ত্রিকীকরণের মূল কাজই ব্যাহত হবে। কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হলে আমাদের কৃষকদের সরাসরি ব্যাংকঋণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থায় সাধারণত ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপারের মতো যন্ত্রপাতির জন্য কৃষক এখনো সরাসরি ব্যাংকঋণ পেতে নানান অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। সরকার কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষকের জন্য ভর্তুকি নিশ্চিত করতে পেরেছে। কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কহারও সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা প্রগতিশীল, কৃষিবান্ধব ও সময়োপযোগী। তবে ট্রাক্টর কেনায় সরকারের যে ঋণ নীতিমালা রয়েছে সেখানে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। ঋণের সুদ কম থাকাই বাঞ্ছনীয় এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়কে ফসল তোলার মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত। তাহলে কোনো ঋণ নষ্ট হবে না, কৃষক সময়মতো ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবেন। আমি মনে করি কৃষি উন্নয়নের জন্য আমাদের সবার কমিটমেন্ট আমাদের কৃষিকে আধুনিকতার পথে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রথম সোপান ট্রাক্টরের ব্যবহার জমি কর্ষণ। একটি ট্রাক্টরের জন্য কৃষক বা উদ্যোক্তাকে ১০-১২ লাখ টাকা খরচ করতে হয়, নিতে হয় লোন ব লিজ। একটি ট্রাক্টরের নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল আছে। বাংলাদেশে রক্ষণাবেক্ষণকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয় না বিবেচনায় দশ-বারো বছরের মধ্যে ট্রাক্টরের কর্মক্ষমতা কমে যায়। ফলে নতুন ট্রাক্টর কিনতে হয়। যদি ট্রাক্টর ব্যবহার করে কৃষক বা উদ্যোক্তা তাদের ক্যাপিটালের রিটার্ন এবং লাভজনকতার নিরিখে প্রত্যাশিত উপার্জন না করতে পারেন তাহলে আমাদের কৃষিও ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ কারণে ট্রাক্টরের বহুমুখী ব্যবহার প্রয়োজন, যা প্রথমত কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ। তাছাড়া সম্প্রতি সারা বাংলাদেশে মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও ট্রাক্টরের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে কাজ চলছে। ওয়াসার জরুরি পানি পরিবহনও এমন একটি কাজ। এসবই কোনো না কোনোভাবে পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই পরিবহন ব্যবস্থায় ট্রাক্টর ব্যবহারের সরকারি নীতিমালা সহায়তা কৃষিকাজে ট্রাক্টরের ব্যবহার বৃদ্ধিকে সংকটমুক্ত করবে।


প্রকৌশলী সাদিদ জামিল: ব্যবস্থাপনা পরিচালক

দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেড

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন