শুক্রবার | নভেম্বর ২৭, ২০২০ | ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

চীনকে প্রতিরোধে একাট্টা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র

ইন্দো-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই

বণিক বার্তা ডেস্ক

নয়াদিল্লিতে গতকাল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের টু প্লাস টু সংলাপে দুই দেশের মধ্যে বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট (বিইসিএ) চুক্তি সই হয়েছে। এ চুক্তির অধীনে দুই দেশের মধ্যে ভূরাজনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহযোগিতা বিনিময়ের কথা রয়েছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক কার্যকলাপকে সামনে তুলে ধরে এ অঞ্চলে মিত্রদের একাট্টা করে চীনবিরোধী জোট গড়ে তুলছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সঙ্গে সীমান্তে ভারতের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে ওয়াশিংটনের এ প্রয়াস অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। 

নয়াদিল্লিতে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ও তার ভারতীয় কাউন্টারপার্ট রাজনাথ সিং বিইসিএ চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেন। মার্ক এসপার বলেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এখন প্রতিরক্ষা খাত। আমাদের সাধারণ স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সবার জন্য মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নিশ্চিতের জন্য আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে যখন চীন আগ্রাসীভাবে এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে চলেছে। 

অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, এ চুক্তি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সব দেশের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেই আইনসম্মত ও মুক্ত চলাচল নিশ্চিতে দুই পক্ষের অঙ্গীকারবদ্ধতাকে আরো দৃঢ় করেছে।

আগামী মাসেই ভারত মহাসাগরে এক যৌথ নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মহড়ায় তথাকথিত কোয়াড জোটভুক্ত চার দেশেরই (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। অনেকেই বলছেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনের শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঠেকাতে অনানুষ্ঠানিক কোয়াড জোটকে ‘এশিয়ার ন্যাটো’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে টোকিওতে কোয়াড সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনের ক্রিয়াকলাপই এ সময় কোয়াডকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আশপাশের অঞ্চলে চীন সরকারের আগ্রাসী নীতিই বেইজিংয়ের আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ওই কর্মকর্তা সে সময় হিমালয় অঞ্চলের সীমান্তের ভারত ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন।

দিল্লিতে গতকাল টু প্লাস টু সম্মেলনে মাইক পম্পেও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বলেন, মুক্ত ও সমৃদ্ধ এশিয়া-প্যাসিফিকের ভিত্তি হলো গণতন্ত্র, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও মুক্ত চলাচল। কিন্তু তারা এসব বিষয়ের প্রতি মোটেও অনুকূল মনোভাবাপন্ন নয়। 

তিনি বলেন, আমাদের দুই গণতান্ত্রিক দেশ জোটবদ্ধ হওয়ার অর্থ অনেক বড় কিছু ঘটা। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার বন্ধন দিন দিন দৃঢ়তর হতে চলেছে। 

এতদিন পর্যন্ত চীনের সঙ্গে ৩ হাজার ৩৭৯ কিলোমিটার সীমান্তের বড় একটি অংশ বিরোধপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে ভারত। কিন্তু সম্প্রতি লাদাখ সীমান্তে চীনা ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে পড়ে নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতি। 

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে বিইসিএ চুক্তি। একই সঙ্গে এর ফলে নয়াদিল্লির সামনেও সীমান্ত এলাকায় উন্নততর অস্ত্র মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

এদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে চীনও সম্প্রতি বেশ আগ্রাসী বক্তব্য দিয়ে চলেছে। সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম চায়না মেইলে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, চীনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় সুবিধা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ভারত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধের মতো অনুসরণ করতে গেলে তা দেশটিকে চীনের সঙ্গে শুধু সরাসরি সংঘাতের দিকেই ঠেলে দেবে, যা দেশটির স্বার্থের পক্ষে মোটেও ভালো হবে না।  

অন্যদিকে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ায় প্রকাশিত আরেক নিবন্ধে বলা হয়, ভারত মহাসাগরে আসন্ন মালাবার মহড়াকে প্রত্যাখ্যান করছে চীন। কারণ কোয়াড যে আসলে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার উদ্দেশ্য থেকে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে তালগোল পাকানো উদ্যোগ ছাড়া আর কিছুই নয়, তার সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। 

এতে আরো বলা হয়, কোয়াড সদস্যদের এটা বোঝা উচিত, আঞ্চলিক পর্যায়ে শত্রুতা বাড়ানোর উদ্যোগ আসলে সময়ের প্রতিকূলে যাওয়া ছাড়া কিছুই নয় এবং বিশ্বব্যাপী তা গ্রহণযোগ্যতাও পাবে না। কিছু কিছু দেশ স্নায়ুযুদ্ধোচিত মানসিকতার প্রচারণা চালিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছে। তারা শুধু নিজের পায়েই কুড়াল মেরে চলেছে। 

এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমে কোয়াডের প্রতি নয়াদিল্লির সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক নিবন্ধ প্রকাশের পর এর প্রতিক্রিয়ায় চীনা কূটনৈতিক লি বাইজিয়ান এক টুইট বার্তায় প্রশ্ন করেন, আপনাদের কারো কোনো ধারণা আছে, আগুন নিয়ে খেলার ফলাফল কী হতে পারে?

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন