বুধবার | আগস্ট ০৪, ২০২১ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

করোনাবিশ্ব

মহামারী এখন পর্যন্ত যা দেখাল

বণিক বার্তা ডেস্ক

বছরটি, যাকে রবিন মারানটজ অভিহিত করেছিলেন একটি বীভৎস বছর হিসেবে। যে বছরটিতে সেন্ট্রাল জাভায় এক ব্যক্তি বাঁশের খুঁটি একত্র করে একটি বাঁধ তৈরি করেন, তাতে একটি প্লাস্টিকের ওপর লকডাউন লিখে লাগিয়ে দেন। এর মাধ্যমে মূলত গ্রামের রাস্তায় প্রবেশের পথ আটকে দেয়া হয়। বেলজিয়ামে মৃতদেহ সত্কারের কাজে নিয়োজিত এক ব্যক্তি হাজমত স্যুট (ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক যা দ্বারা গোটা শরীর ঢাকা থাকে) পরতে শুরু করেন। ডেট্রয়েটের একটি শিশু অভিযোগ করল মাথাব্যথার, এক মাস পর তার স্মরণসভায় মাত্র ১২ জন লোককে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয়। ফেস মাস্কের আড়ালেই তার বাবা-মাকে শোক প্রকাশ করতে হয়। একটি বছরে এমন অসংখ্য খণ্ড খণ্ড নজিরবিহীন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে গোটা পৃথিবী। যা এর আগে কখনো দেখতে হয়নি। ডেট্রয়েটের সেই শিশুটির নাম স্কায়লার হারবার্ট। তার মা একজন পুলিশ অফিসার, বাবা একজন দমকল কর্মী। সে যখন মারা যায় তখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর।

একটি একক ঘটনা (কভিড-১৯ মহামারী) এসব মানুষ, এসব স্থান, বেদনা ভয়কে যুক্ত করেছে। আমাদের বেশির ভাগই এপিডেমিওলজিস্ট কিংবা স্প্যানিশ ফ্লুতে বেঁচে যাওয়া মানুষ না। আমাদের বেশির ভাগের জন্য ২০২০ সালের আগ পর্যন্ত মহামারী ছিল ইতিহাসের একটি উপাদান মাত্র, একটি ডিস্টোপিয়ান কল্পকথা কিংবা হেনিগের মতো সাংবাদিকদের লেখার সতর্কতামূলক বই থেকেই আমরা এটি সম্পর্কে দূর থেকে জানতে পারতাম। নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক ঘটনা হিসেবে পরিণত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারাও তাই আমাদের জন্য ক্লান্তিকর একটি ব্যাপার।

তবে এককভাবে কেবল বিজ্ঞানকে অনুসরণ করার চেষ্টা অনুশীলন পর্যবেক্ষককেও আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে। যেমন হেনিগ বলছিলেন : এমনকি আমার মতো একজন বিজ্ঞানপাগল মানুষের জন্যও, বিজ্ঞানীদের বিতর্ক, দ্বিমত এবং পুনঃ পুনঃ মূল্যায়ন দেখা আমার জন্য বিরক্তির ছিল। তার বদলে আমি যা চাইছিলাম তা হলো ল্যাব-কোট পরিহিত একজন নায়ক দৌড়ে গিয়ে এটাকে ছোঁ মেরে দূরে সরিয়ে দেবে।

কিন্তু তার পরও আমাদের শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখতে হচ্ছে বিজ্ঞানের ওপর। আমরা একটি ভ্যাকসিনের পথ চেয়ে আছি বছরের শুরু থেকেই। সে লক্ষ্যে বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টাও নজিরবিহীন।

মহামারীর সময়ের বিভিন্ন রচনা ছবি বিভিন্ন জায়গায় জমা হতে শুরু করেছে। যেগুলো আশা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের অংশও। এসব রেকর্ড এমনকি যা আপনি পরে গিয়ে পেছন ফিরে দেখবেন। যা অনেকটা অতীতের দিকে চোখ ফেরানোর মতোই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই পরের সময়টি আমাদের জন্য কখন আসবে আমরা কেউই জানি না। আমাদের অবশ্যই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, আমরা যাবই। কিন্তু কীভাবে? এবং বিপর্যস্ত মহামারীটি আমাদের কি বদলে দেবে?

করোনাভাইরাসের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণার গতিতে হেনিগ বেশ বিস্মিত। যার অনেকগুলো সংগঠিত হয়েছে নজিরবিহীন উন্মুক্ততায়। তিনি লিখেন, সম্ভবত আমাদের ফিল্টারবিহীন দৃষ্টিভঙ্গি ভালো কিছুতে রূপান্তরিত হবে। হয়তো সেটা উদ্ভট উপায়েই হবে, যেখানে বিজ্ঞানীদের একটি বিমান তৈরি করতে দেখা যাবে, সেটি উড়ানোর সময়েই। কারো কারো মতে, করোনাভাইরাসের গবেষণা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক বোঝাপড়াকে ভালো কিছুর দিকে চালিত করবে।

হয়তো আমরা মানুষেরা কিছুটা অধৈর্য, আত্মমগ্ন প্রজাতি। আমরা একই সঙ্গে দুর্দান্ত নায়কগিরি দেখাতে পারি এবং অবিশ্বাস্য মূর্খতাও। আমাদের বিভেদগুলো বিপর্যয়ের মাধ্যমে স্থায়িত্বের উপায় শিখেছে।

যখন আমরা কোয়ারেন্টিনের শব্দভাণ্ডার ২০ সেকেন্ডের হাত ধোয়া আয়ত্ত করছিলাম, গ্রহের তাপমাত্রা তখনো ওপরে চড়তে শুরু করেছিল। তবে মহামারীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কিছু আশাবাদী ঘটনাও ঘটছিল, যার কোনো কোনোটা যৌক্তিকও ছিল। যেমন ভেনিসের খালে ফিরতে শুরু করেছিল ডলফিন, যদিও দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় খবরটি সঠিক ছিল না। যদিও তাত্ক্ষণিকভাবে আমরা রকম কিছুই হয়তো আশা করছিলাম।

দশকের মাঝে প্রথমবারের মতো পাঞ্জাবিরা হিমালয়কে দেখতে পেয়েছিল, কারণ অর্থনৈতিক শ্লথতা দূষণকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ, এটা সত্য। যেমন ব্যাংকক এবং সাও পাওলো পরিষ্কার বায়ুর রিপোর্ট করেছিল। মনে হচ্ছিল সবকিছু যেন ২০২০ সালে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, একই সময়ে গোটা পৃথিবী যেন একটি অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। যেখানে আমরা দেখেছি বহু দূর পর্যন্ত খালি রাস্তা, বন্ধ ব্যবসা-বাণিজ্য। দৃশ্য যেন সবখানেই একই রকম। এসবের মধ্যেই পৃথিবীব্যাপী একই রকমভাবে অ্যাম্বুলেন্সের ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, হাসপাতালের জরুরি কক্ষ আইসিইউগুলো ক্ষণে ক্ষণে জীবন-মৃত্যু নিয়ে লড়ছিল। পাশাপাশি আমরা দেখছি গরিব শ্রমিক শ্রেণীর বড় একটি অংশ এখনো প্রতিদিন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে, কারণ তাদের সামনে আর কোনো বিকল্পই যে অবশিষ্ট নেই।

এদিকে রবার্ট কুনজিং সম্প্রতি তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, পরিবেশের জন্য মহামারীর প্রতিকূলতা সম্পর্কে। বায়ুদূষণ আবার দেখা যেতে শুরু করেছে। বছর সাইবেরিয়ার টুন্ড্রাও পোড়ানো হয়েছিল। তার প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রহের সঙ্গে আমরা যে ধরনের আচরণ করে আসছিলাম মহামারী কি সে আচরণে কোনো বদল আনবে, যেখানে আট মিলিয়ন মানুষ ঠেলাঠেলি করছে এখানে বাস করার জন্য? তার আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, যদি পৃথিবীর অর্থনীতি প্রকৃতি দ্বারা নির্ধারিত সীমার ভেতর চালিত হয় তবে সেটি কেমন দেখাবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো এখনই দেয়া সম্ভব না, কারণ যেমনটা ওপরে বলা হচ্ছিল আমরা এখনো মহামারীকালের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।

বীভৎস বছরটি আমাদের কাউকে কাউকে তাত্ক্ষণিকভাবে অবিশ্বাসী করে তুলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। যারা কিনা এপ্রিলের মাঝামাঝিতেই কভিডে মৃত্যুর দিক থেকে সবার ওপরে উঠে গিয়েছিল। আগস্টের শেষ দিকে গিয়ে লাখ ৮০ হাজার মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়। যা কিনা সবচেয়ে নিকটে থাকা ব্রাজিলের প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। বছরই আমরা দেখেছি নতুন এক ধরনের যোদ্ধাকে যারা কিনা ফেস মাস্ককে মুখে লাগিয়ে নিজেদের আশপাশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য, তাদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য সম্ভাব্য সবই করেছে। কেমন হবে যদি আমরা হঠাৎ করে প্রয়োজনীয় লেবেল লাগিয়ে কিছু কর্মীকে উচ্চতর বেতন, ভালো সুরক্ষা এবং নিশ্চিত স্বাস্থ্য সুবিধা দ্বারা প্রতিস্থাপন করি? এসব প্রয়োজনীয় শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়ার শিক্ষাও যেন এই মহামারীটি আমাদের দিয়ে যাচ্ছে। এখন সেসব শিক্ষা আমরা গ্রহণ করব কিনা তা সময়ের হাতেই তোলা রইল।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন