বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

পরিকল্পনা কমিশনের দিনগুলো

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ‘সদস্য’ হিসেবে আমি প্ল্যানিং কমিশনে যোগ দিই। পারিবারিক ঠিকুজি অনুযায়ী দিনটি ছিল আমার জন্মদিন (১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৪)। স্কুলের খাতা অনুযায়ী ১২ জুলাই, ১৯৫৩ আমার অফিশিয়াল বার্থডে। সাধারণত সবার জন্মসন থাকে অরিজিনালের চেয়ে এগিয়ে, আমারটা পিছিয়ে। যাহোক সতীর্থ সহকর্মী ড. তারেক বললেন, এটা তোমার জন্মদিনের উপহার। কাকতালীয়ভাবে আমার ১০ ফেব্রুয়ারি জন্মদিনে জাপান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। জাপানিরা শুনলে বলত ‘সো দেসনে!’ তাই নাকি!

প্ল্যানিং কমিশন চত্বর আমার অতি প্রিয় জায়গা। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ টানা চার বছরই আরডির ফরেন এইড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস (ফাবা) অধিশাখার পরিচালক ছিলাম। প্ল্যানিং কমিশনের ভৌত অবকাঠামোর সদস্যের দপ্তর আমার ফাবা ব্লকের ঠিক পেছনে। সে সময়কার সহকর্মীরা আবার আমাকে সেখানে পেয়ে বেশ উত্ফুল্ল। আমিও।

প্ল্যানিং কমিশন থেকেই এনবিআরের চেয়ারম্যান পদে যোগ দিই একই বছরের ২২ অক্টোবর। অর্থাৎ মহামহিম প্ল্যানিং কমিশনে আমার কর্মকাল মাত্র ৮ মাস ১৮ দিন। কিন্তু এই ২৫৮টি দিন আমার জন্য ছিল বড় সৌভাগ্যময় ও সৃজনশীলতার তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ। কেননা এ সময় আমি হাতিরঝিল, পদ্মা সেতু, পুরনো বিমানবন্দর ঘেঁষে রোকেয়া সরণি, বিজয় সরণি (র্যাংগস ভবন)-তেজগাঁও ফ্লাইওভার, বনানী-গুলশান সংযোগ সেতু, রাজধানী ঢাকার চারপাশে নদীপথ, শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৪টি প্রকল্পের প্রস্তাব একনেকে উপস্থাপন এবং অনুমোদন করাতে পেরেছিলাম। এছাড়া যশোর-বেনাপোল সড়কে একটা বড় বরাদ্দ, বহু বছরের পুরনো খুলনা রেলওয়ে স্টেশনকে আধুনিকীকরণ, খুলনা শহর থেকে বাইপাস সংযোগ সড়ক এবং সাতক্ষীরা বাইপাস প্রকল্পের প্রস্তাব চুলায় চাপিয়ে এসেছিলাম। তা নামাতে এক দশকের বেশি সময় পার হয়, তবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে।   

আমাকে বিশাল বপু (২২ মন্ত্রণালয়ের সব পূর্ত প্রকল্প) ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্যের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এক পর্যায়ে শিল্প ও শক্তি বিভাগের ‘শক্তি’ (বিদ্যুৎ, খনিজ ও  জ্বালানি মন্ত্রণালয়) আমার কাঁধে চাপিয়ে আরো শক্তিশালী করা হয়। আমাদের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা এম আজিজুল ইসলাম এবং তার মাধ্যমে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কাছে দিন-রাত যেকোনো সময় যেকোনো ব্যাপারে রিপোর্ট করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। বনানী ১১ এবং গুলশানের ৪৪তম সড়কের সংযোগ সেতুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (২০০৭-০৮) সময়ে প্রকল্প ধারণা, প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও উদ্বোধন সবই সম্পন্ন হওয়া একটি প্রকল্প। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায়ই সরাসরি আমাদের তাগিদ দিতেন। ফলে এলজিইডি দ্রুততম সময়ে এ প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অনন্যদৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তবে পরবর্তীকালে জেনে দুঃখ পাই যে সেতুটি নির্মাণের বিল পেতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের বহু বছর সময় লাগে। 

বিজয় সরণি (র্যাংগস ভবন)-তেজগাঁও উড়াল সেতু প্রকল্প 

প্রকল্প প্রণয়নের সময় মূল ডিজাইনে ছিল রোকেয়া সরণি থেকে বিজয় সরণি ক্রসিং ও র্যাংগস ভবনের ওপর দিয়ে ওভারপাস হয়ে তেজগাঁও উড়াল সেতুর পথে ধাবিত হবে। এক পর্যায়ে বলা হলো, ওভার পাসের আইডিয়া বাদ থাক, পরে দেখা যাবে। এখন আপাতত ক্রসিং থেকে র্যাংগস বিল্ডিং ভেঙে সোজা সড়ক চলে যাবে তেজগাঁওয়ের দিকে। প্রকল্পটি সে সময় এক বৃহস্পতিবার দুপুরে অনুমোদন হলে পরে বিকালে বা সন্ধ্যায় র্যাংগস ভবন ভাঙা শুরু করা হয়। ছুটির দিনে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কোর্টের আশ্রয় নিয়ে...। সে সময় তড়িঘড়ি করে র্যাংগস ভবন ভাঙতে গিয়ে অসাবধানতাবশত শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। আমাদের তত্কালীন পূর্ত সচিব রশীদুল হাই শামিম নির্মাণাধীন তেজগাঁও উড়াল সেতু নির্মাণকাজ নিজে পরিদর্শনে গিয়ে সেতু কাঠামো থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। এখন বিজয় সরণি ক্রসিংয়ে চারদিক থেকে আসা গাড়ির সে াত নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে যখন গলদ্ঘর্ম হতে দেখি, যখন দেখি তেজগাঁ উড়াল সেতু ও রোকেয়া সরণি উভয় পাশে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তখন মনে মনে প্রমাদ গুনি যে বিজয় সরণিতে ওভারপাস করা হলে আজ এ অবস্থা হতো না। 

হাতিরঝিল প্রকল্প

বেগুনবাড়ী ও হাতিরঝিলের স্বচ্ছ জলরাশির হ্রদকে ঘিরে সৃজিত সড়ক, সেতু ও সুশোভিত পায়ে চলার পথসহ ঢাকা শহরের হূদয় মাঝে নান্দনিক পরিবেশ রচনার উদ্যোগে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকতে পারাটা আমার জীবনের একটি বড় সুযোগ ও সৌভাগ্য বলে মনে করি। এই মহানগরের ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথার কঠিন জীবনযাপনের মাঝখানে এক চিলতে শান্তি ও সৌকর্যের সারথি হিসেবে নয়নাভিরাম পাঁচটি সেতুসহ এই অপূর্ব অবকাঠামোটি নির্মাণ প্রয়াস প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ পর্বে (প্রকল্প প্রণয়ন ও  অনুমোদনের) পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলাম আমি। 

সবারই জানা যে টঙ্গী ডাইভারসন রোড ও প্রগতি সরণি (পান্থপথ থেকে এয়ারপোর্ট রোড ও সোনারগাঁও হোটেলের দক্ষিণ পাশের বেগুনবাড়ী খাল) এবং টঙ্গী ডাইভারশন রোড হয়ে রামপুরা ব্রিজের মধ্যবর্তী নিম্ন এলাকা (যা হাতিরঝিল নামে পরিচিত) বহুদিন ধরে অবহেলা ও  অপরিকল্পিত অবয়বে অপব্যবহূত হয়ে আসছিল। রাজধানী ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থ এই নিচু এলাকার উত্তর দিকে টঙ্গী শিল্প এলাকা, পূর্ব দিকে রামপুরা ব্রিজ এবং পশ্চিম দিকে টঙ্গী ডাইভারশন রোড। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এই নিচু এলাকার জন্য প্রাথমিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যে খসড়া প্রতিবেদন পেশ করেছিল ২০০৩-০৪ সালের দিকে, তাতে উল্লেখ করা হয় যে এ এলাকায় যেকোনো প্রকার মাটি ভরাটের কাজে ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর ক্ষতিকর এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেবে এবং এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। হাতিরঝিল এলাকার হাইড্রোলজিক্যাল বিশ্লেষণে সে সময় উল্লেখ করা হয়, ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার জন্য এই নিচু এলাকা অবশ্যই সংরক্ষিত রাখতে হবে। এ কারণে সে সময় সমীক্ষা দল টঙ্গী ডাইভারশন রোড ও প্রগতি সরণি সংযোগের মাধ্যমে সারফেস রোডের পরিবর্তে এলিভেটেড রোড নির্মাণের প্রস্তাব করেছিল। এলিভেটেড রোড যদিও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক সংযোজন হিসেবে পরিকর্তিত হবে কিন্তু এ ব্যবস্থায় বেগুনবাড়ী খাল ও হাতির ঝিলের দৈন্যকে আরো নাজুক অবস্থায় নিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাতে পারে বিবেচনায় ওই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করা হয়। 

২০০৭ সালের ৫ এপ্রিল সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে খাল ও ঝিলের পরিবেশগত সার্বিক উন্নতি বিধান এবং ঘূর্ণায়মান সংযোগ সড়কসহ  অবয়ব পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। একই তারিখে এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনে আমার সভাপতিত্বে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভার দিকনির্দেশনা অনুসরণে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল পুনর্গঠিত ডিপিপি পেশ করা হয়। কিন্তু পিইসি সভার নির্দেশনামতো যথাযথভাবে ডিপিপি পুনর্গঠিত না হওয়ার কারণে ডিপিপির বিভিন্ন ঘাটতি ও অসম্পূর্ণতা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে তা ফেরত দেয়া হয় ৬ মে (২০০৭)। এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান অঙ্গ ও জটিলতম কর্মকাণ্ড ছিল বেগুনবাড়ী খাল ও হাতিরঝিলের জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কার্যাবলি। ঢাকা জেলা প্রশাসন ও রাজউকের মধ্যে জমির প্রকৃত মালিকানা ও বরাদ্দ প্রদান বিষয়ে দীর্ঘদিনের মতানৈক্য ছিল। ২৪ এপ্রিল (২০০৭) জেলা প্রশাসক, ঢাকার ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ৩০০ একর জমি আনুমানিক ব্যয় প্রাক্কলন ১ হাজার ১৫১ দশমিক ৬৪ কোটি টাকার হিসাব পেশ করা হয়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ‘হাতিরঝিল এলাকা সমন্বিত উন্নয়ন (পান্থপথ-প্রগতি সরণি সংযোগ সড়কসহ)’ শীর্ষক প্রকল্পের ডিপিপি ১ হাজার ৬০২ দশমিক শূন্য ৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে পরিকল্পনা কমিশনে পেশ করা হয়। পরিকল্পনা কমিশন থেকে আমি ঝিলের মধ্যস্থিত জমির প্রকৃত মালিকানা, প্রকৃতি ও হিসাবায়ন যথাযথভাবে নিরূপণের নির্দেশ দিই। এটাও বলি, জেলা প্রশাসক ঢাকা ও রাজউকের চেয়ারম্যান সরাসরি আলোচনায় বসে বছরের পর বছর নথি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ সমস্যা নিরসন করবেন। তাতে কাজ হয়েছিল। ১৭ জুন (২০০৭) পুনরায় জেলা প্রশাসক ঢাকার ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মধ্যে কোর্ট অব অ্যাওয়ার্ডসের ৫৫ দশমিক ৪৬ একর (কম-বেশি) জমি রয়েছে উল্লেখ  করে জমির অধিগ্রহণ মূল্য মোট ২৪৪ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা বলে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবগত করা হয়। ওই পত্রে বিভিন্ন অবকাঠামো শ্রেণীবিন্য্যস ও পরিমাণ সম্পর্কেও তথ্য প্রদান করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭-এর ২৮ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল মহোদয়ের সভাপতিত্বে  অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ‘হাতিরঝিল রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ঝিলের চারদিকে রাস্তা নির্মাণ, মাঝে সেতু নির্মাণ এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণকল্পে বিস্তারিত সমীক্ষার জন্য বুয়েটকে অনুরোধ করা হয়। মরহুম আনোয়ারুল ইকবালের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই তার অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত সিদ্ধান্তের জন্য। আমি আজও বুয়েটের বিআরটিসির প্রতিও সকৃতজ্ঞতায় আনত হই এজন্য যে মাত্র ১৫ দিনে তারা সৃজনশীলতা ও মেধার সমন্বয় ঘটিয়ে আজকের হাতিরঝিলের নয়নাভিরাম পরিবেশ রচনায় এত চমত্কার সমীক্ষা তথা ডিজাইন করে দিয়েছিলেন, যার মূর্ত প্রকাশ আজকের পুরো হাতিরঝিল এলাকা। সেই সমীক্ষাসহকারে পুনর্গঠিত ডিপিপি ২৪ জুলাই (২০০৭) পরিকল্পনা কমিশনে পেশ করা হয়। যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় ঠিকঠাক করে ২৮ আগস্ট (২০০৭) অনুষ্ঠিত একনেক সভায় আমি ‘ঢাকা শহরে টলটলে পানির লেক চাই’ উল্লেখ করে ১ হাজার ৪৭৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই, ২০০৭ থেকে জুন, ২০১০ পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য হাতিরঝিল প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করি।  যুক্তি তুলে ধরি, ঢাকার গড় বৃষ্টিপাত হিসাব করে হাতিরঝিল এলাকার সংশ্লিষ্ট অববাহিকা এলাকায় (পানিপ্রবাহ ও নিষ্কাশন এলাকা) ঝিলের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ঢাকার প্রায় ৪৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিবেচ্য প্রকল্পটির আওতায় নির্মিত ঝিল অবদান রাখবে বলে বুয়েটের জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ী খালের গভীরতা প্রায় ১৫০ ফুট করা হলে সেক্ষেত্রে এর রক্ষাপ্রানুযায়ী করার সংস্থান আছে কিনা এবং নিকটস্থ ভবন ও অন্যান্য স্ট্রাকচার, রামপুরা সেতু ও টঙ্গী ডাইভারশন সড়কের ওপর নির্মিত কালভার্ট-সেতুর ওপর এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব যাতে না পড়ে, সে বিষয় বিবেচনায় এনে প্রকল্প চলাকালে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের আওতায় ২৪৪ দশমিক ৭৪৭২ একর জমি অধিগ্রহণ বাবদ মোট ব্যয় দেখানো হয় ১ হাজার ১০ কোটি টাকা। এই জমির মধ্যে রাজউক, বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঢাকা ওয়াসা, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং কোর্ট অব অ্যাওয়ার্ডসের আওতাধীন ও খাসজমিসহ মোট ১৩৩ দশমিক ৪০৩৮ একর জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রাক্কলিত ৫৫০ দশমিক ৫২ কোটি টাকা বুক ট্রান্সফার বা সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিশোধিত হবে বলে প্রস্তাব করি এবং শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন ১১১ দশমিক ৩৪৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ বাবদ ৪৫৯ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা অবমুক্তযোগ্য হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ বিভাগে বাজেট ও আর্থিক শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আমার দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতা সূত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে আমার প্রস্তাব মতোই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে উপস্থিত অনেকেই আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। হাতিরঝিলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আমি এখনো সেই সুখময় স্মৃতি রোমন্থন করি।   

প্রকল্পটি বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) যাবতীয় ডিজাইন; রাজউক জমি অধিগ্রহণ, ভূমি খনন, ঝিলের তলার পলি অপসারণ, ঝিলের রক্ষাপ্রদ কাজ হিসেবে আরসিসি প্রি-কাস্ট পাইলিং; এলজিইডি হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ী খালের উভয় তীরে ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ৩২০ মি. সৌন্দর্যবর্ধনমূলক সেতু নির্মাণ, ২ মি. প্রশস্ত ও ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটপাত নির্মাণ; পান্থপথ ক্রসিং-এ ২৫০ মি. দীর্ঘ ওভার পাস (পরে আন্ডারপাস হয়ে যায়)  নির্মাণ; ২ দশমিক ৫০ মি. প্রশস্তে ঝিলের সীমানা বরাবর ১৪ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও ল্যান্ড স্কেপিং, গার্ডেনিং, পার্ক ও স্ট্রিট ফার্নিচার স্থাপন, বৃক্ষরোপণ ও ঢাকা ওয়াসা স্টর্ম ওয়াটার সুয়ারেজ লাইন নির্মাণ, পাইপ ড্রেন নির্মাণ, প্রধান সুয়ারেজ লাইন নির্মাণ, গৃহস্থালি বাণিজ্যিক সংযোগ লাইন নির্মাণ, লিফট স্টেশন নির্মাণ (পানি নিষ্কাশনের জন্য); ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, পানি সরবরাহ পাইপলাইন নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এটি নির্মিত হয়েছে। মাইলস্টোনরূপী এই অবকাঠামোয় মোট ২৪৪ দশমিক ৭৪৭৪৬ একর জমি ব্যবহূত হয়েছে, যার মধ্যে রাজউক (১৩.০৯০১ একর), বাংলাদেশ রেলওয়ে (১৮.৮৫০৩ একর), ঢাকা ওয়াসা (১৪.৭৩১০ একর), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (২৩.০১৫৬), কোর্ট অব অ্যাওয়ার্ডস (৫৫.৪৬০০ একর), খাসজমি (৮.২৫৬৮ একর) এবং  ব্যক্তিগত জমি (১১১.৩৪৩৪)। উল্লিখিত বুয়েটের বিআরটিসিসহ এলজিআরডি, ঢাকা ওয়াসা, রাজউক সে সময় যে নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় রেখেছিল, তা সমসাময়িককালে বিরল, অভূতপূর্ব ও গৌরবদীপ্ত। জুন ২০১০-এর মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আড়াই বছরেরও বেশি সময় নিয়ে এটির নির্মাণ শেষ দেখিয়ে উদ্বোধন করা হয়, তখনো  থিয়েটার, পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য দ্বীপ নির্মাণের কাজ এবং ওয়াসার কিছু কাজ বাকি ছিল। পরে যা যথেষ্ট ধীরগতিতে করা হয়েছে বা হচ্ছে। লেকের মধ্যে দৃষ্টিনন্দন রঙিন ফোয়ারাটি পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছে। ২০১১ সালের ৪ অক্টোবর প্রকল্পটির নির্মাণব্যয় অতিরিক্ত ৪৯৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭১ দশমিক ৩০ কোটি টাকায় সংশোধিত হয়।

ঝিলের পানি স্বচ্ছ ও টলটলে রাখার ব্যাপারে মাঝেমধ্যে অমনোযোগিতা দেখে ব্যথা পাই, ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হই ঝিলপাড়ে অপরিকল্পিত খাবারের দোকান ও গাড়ি পার্কিংয়ের আবদার দেখে, গাড়ি চলাচলে স্পিড ব্রেকার বসানোর ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে আদিখ্যেতা দেখে। প্রকল্পের মধ্যে খুনখারাবি, ছিনতাই ও সড়ক দুর্ঘটনার খবরে মর্মযাতনা বোধ করি। তবে প্রকল্প এলাকাকে একটি থানা হিসেবে এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে সেনাবাহিনীর একটি স্থায়ী ইউনিট প্রতিষ্ঠায় বেশ ভরসা পাই। 

স্বপ্নের সেতু বাস্তবতার বিবরে

জাতীয় অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব, তাত্পর্য ও উপযোগিতা অপরিসীম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা, তৃতীয় বৃহত্তম শহর খুলনা, বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নয়নের কারণে ঢাকা বিভাগের পাঁচটি, খুলনা বিভাগের ১০টি এবং বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ শিল্প স্থাপন খাতে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণে ব্যাপক অগ্রগতি (বিশেষ করে ঢাকা-মাওয়া ও জাজিরা-ফকিরহাট ভায়া গোপালগঞ্জ মহাসড়ক নির্মিত) হলেও একই সঙ্গে পদ্মায় সেতু নির্মাণ না হওয়ায় ওই অবকাঠামো যথা উপযোগিতায় আসছে না। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মায় সেতু নির্মাণ করা হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের যে সংযোগ সংস্থাপিত হবে এবং এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে পরিবেশ সৃজিত হবে, তাতে দেশের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিআরডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।   

স্বাভাবিক ও সংগত কারণেই এ সেতু নির্মাণ দেশ ও জাতির কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। বহুদিন ধরে চলছিল এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ-প্রাক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (মে-অক্টোবর ১৯৯৯), বিস্তারিত সমীক্ষা (মে ২০০৩ থেকে মে ২০০৫), পিসিপি প্রণয়ন (জুন ২০০৫), অর্থসংস্থানসহ বাস্তবায়ন কৌশল নিরূপণ (২০০৫-২০০৬)। এমনকি সেতুর শুরুর স্থান মাওয়ায় তত্কালীন সরকারপ্রধানের ভিত্তিপ্রস্তরও পর্যন্ত বসানো হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প অনুমোদন না হলে কাজের কাজ কিছুই শুরু হচ্ছিল না। বিষয়টির জরুরীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মায় সেতু নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়। [চলবে]


ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব, পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্তন সদস্য এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন