বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে আফ্রিকা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

জয়তী ঘোষ

কভিড মহমারী এবং চলমান জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতি থেকে সহনশীলতার ছবক শেখাটা আমাদের উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে আফ্রিকায় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সু-উদ্দেশ্যচালিত প্রচেষ্টাগুলো ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় বৃদ্ধির বিপরীতে বৈশ্বিক কৃষি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি কৃষি ব্যবস্থাকে আরো ভঙ্গুর করে তুলেছে।

লাখো মানুষ, যারা ক্ষুধার মাঝে নিমজ্জিত কিংবা ক্ষুধার হুমকিতে আছে, তাদের প্রতি বিশ্বের মনোযোগ বা দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) বছর শান্তিতে নোবেল প্রদান করেছে নরওয়ের নোবেল কমিটি।

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ক্ষুধার্ত মানুষদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর এজন্য দায়ী অকার্যকর বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা।

এমনকি কভিড-১৯ মহামারী আঘাত হানার আগেও বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তার অভাবে ভুগছে, যার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বা ভয়াবহ অনাহারের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ। করোনা মহামারীর ফলে ২০২০ সালে নতুন করে অর্থনৈতিক খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ায় অবস্থার অবনতি ঘটেছে, যদিও এর আংশিক কারণ হচ্ছে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়া। তবে বৈষম্য বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের জীবিকা হারানোর কারণে প্রভাবের মাত্রাটা বেশি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতি আগে কিংবা এখনো প্রতিরোধযোগ্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে দ্বিতীয় লক্ষ্যমাত্রা সত্যিকার অর্থেই অর্জনযোগ্য; কেননা বিশ্বে বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয়, তা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মৌলিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে সমর্থ। কিন্তু মহামারী শুরুর আগে থেকেই বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত। বেশির ভাগ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাই অস্থিতিশীল। খাদ্য আয়ের বণ্টন ব্যবস্থায় এতটাই বৈষম্য বিদ্যমান যে কোটি কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্যের চাহিদা পূরণে সমর্থ নয়। বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী যে সংস্থাগুলো রয়েছে, তারা উৎপাদন বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে এমন একটি তির্যক রেখা টেনে রেখেছে যে ক্ষুদ্র কৃষক চূড়ান্ত ভোক্তারা তাতে ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছেন।

খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বৈষম্যগুলো খুব স্পষ্ট, এমনকি খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলগুলোয়ও প্রচুর অযৌক্তিকতা বিদ্যমান। আর তাই প্রায় ক্ষেত্রেই রাসায়নিক দিয়ে সংরক্ষণ করে কোনো এক অঞ্চলের কাঁচামাল অন্য দেশে বা বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে প্রক্রিয়াজাত হয়ে তা আবার উৎপাদিত অঞ্চল বা আশেপাশের এলাকাগুলোয় ফেরত আসছে।

বিশ্ব কেন এসডিজির দ্বিতীয় লক্ষ্যমাত্রাটি অর্জনের পথ থেকে সরে যাচ্ছে, তার একটি কারণ হচ্ছে নীতিনির্ধারকরা সমস্যাটিকে ভুলভাবে নির্ণয় করছেন। টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা সমবণ্টনের দিকে জোর না দিয়ে তারা কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাকে আরো বেশি কার্যক্ষম করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এর ফলে ফলনের ওপর অতিমাত্রায় জোর দেয়া হচ্ছে। কৃষি-পরিবেশ, স্থানীয় পুষ্টি চাহিদা রাসায়নিকনির্ভর কৃষিতে বড় ধরনের প্রণোদনা প্রদানের মতো বিষয়গুলোর দিকে দেয়া হচ্ছে কম মনোযোগ। 

প্রসঙ্গে আফ্রিকার সবুজ বিপ্লববিষয়ক জোট গ্রিন রেভল্যুশন ইন আফ্রিকার (এজিআরএ) উদাহরণ টানা যেতে পারে, ২০০৬ সালে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং রকফেলার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এটি শুরু হয়। এজিআরএ কর্মসূচির অধীনে একরপ্রতি ফলন বাড়াতে একচেটিয়াভাবে উচ্চফলনশীল বাণিজ্যিক বীজ, কৃত্রিম সার রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারকে সমর্থন করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এর সমর্থকদের ব্যাপক অর্থে অসচেতন বলেই মনে হয়। কেননা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এর আগে এশিয়ার অনেক উন্নয়নশীল দেশে একই ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করে মাঝারি গোছের ফলাফল পাওয়া গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা বড় বড় পরিবেশগত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

প্রাথমিকভাবে ২০২০ সাল নাগাদ আফ্রিকার দুই কোটি ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০টি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছিল এজিআরএ। পরে ২০২০ সালের মধ্যে তিন কোটি কৃষক পরিবারের জন্য ফলন আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা গৃহীত হয়েছিল। তবে সময়সীমার কাছাকাছি চলে আসায় এজিআরএ এখন তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরে গিয়ে অধিক বিনয়ের সঙ্গে আয় বৃদ্ধি (পরিমাণ উল্লেখ না করে) এবং ২০২১ সালের মধ্যে আফ্রিকার ১১টি দেশের খামার আছে এমন তিন কোটি ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছে। নিজেদের কাজ ঘিরে সমালোচনার সাম্প্রতিক এক জবাব দিতে গিয়ে আগের তুলনায় আরো বেশি সতর্ক হয়ে তারা দাবি করছে যে, তাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রত্যক্ষভাবে ৯০ লাখ এবং অপ্রত্যক্ষভাবে কোটি ১০ লাখ কৃষকের কাছে পৌঁছানো (যদিও কারণগুলো অস্পষ্ট)

লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুতি সত্ত্বেও এজিআরএ এখনো তাদের কাজের অগ্রগতিসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেনি। সুতরাং কৃষকদের আয়ের পরিমাণ, ফলন বৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক নির্ভরযোগ্য অনুমানভিত্তিক তথ্যও তাদের কাছে নেই। তবে এজিআরএর তালিকাভুক্ত ১৩টি দেশের প্রধান শস্য উৎপাদন, ফলন এবং সংগ্রহবিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোয় স্বতন্ত্র গবেষকরা বিভ্রান্তিকর কিছু উপসংহারে পৌঁছেছেন। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সামান্য তথ্যই আছে। বিপরীতে দেখা গেছে এজিআরএ তালিকাভুক্ত দেশগুলোয় অনাহারে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৩০ শতাংশ (এজিআরএর পক্ষ থেকে বিশ্লেষণটিকে চরম ত্রুটিপূর্ণ বলে আখ্যায়িত করা হলেও পাল্টা কোনো তথ্য-প্রমাণ তারা সরবরাহ করতে পারেনি)

উৎপাদন সম্পর্কিত গবেষণা থেকে উঠে এসেছে দেশগুলোয় এজিআরএর কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম ১২ বছর ধরে গড়ে প্রত্যেক বছরে প্রধানতম শস্যের উৎপাদন দশমিক শতাংশ বেড়েছে, অবশ্য তাদের কার্যক্রম শুরুর আগের ১২ বছর ধরেও উৎপাদন একই হারে বাড়ছিল। ১৩টি দেশের মধ্যে আটটি দেশে উৎপাদন কমেছে, তিনটি দেশে ফলন কমেছে। এমনকি যেসব দেশে প্রধান প্রধান ফসলের উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণ বেড়েছিলযেমন জাম্বিয়া, মূলত বপনক্ষেত্রের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে ভুট্টার উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছেসেখানে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ক্ষুধা দারিদ্র্যের পরিমাণ বেশি ছিল।

তদুপরি, প্রতিবেদনটিতে দেখানো হয়েছে যে বিভিন্ন দেশে সবুজ বিপ্লব অনুশীলনের মাধ্যমে যে নেতিবাচক ফলাফল বা প্রভাব পড়েছে, এজিআরএ দেশগুলোয়ও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। জমিতে পুষ্টিকর ঋতুভিত্তিক স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শস্য যেমন জোয়ার (ভুট্টাজাতীয় খাদ্যশস্য) চাষের বদলে উচ্চফলনশীল ভুট্টা চাষ করা হয়। ফলে কৃষকদের আরো ব্যয়বহুল বীজ কিনতে হয়েছে, যার খরচ মেটাতে প্রায়ই তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। একটি মাত্র ফসল উৎপাদন এবং অতিমাত্রায় রাসায়নিকের ব্যবহার (যেমন পেট্রোলিয়ামজাতীয় সার বা কৃত্রিম সার) মাটির ক্ষারত্ব বাড়িয়ে উর্বরা শক্তি হ্রাস এবং ভবিষ্যতের চাষাবাদকে প্রভাবিত করাসহ অন্যান্য পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি করছে। মনোকালচার বা একটি মাত্র শস্য উৎপাদন কাসাভা (গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ) কিংবা মিষ্টি আলুর মতো মূল ফসলের উৎপাদন কমিয়ে খাদ্যতালিকাকে অপুষ্টিকর বৈচিত্র্যহীন করে তুলেছে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

জয়তী ঘোষ: ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এবং ইনডিপেনডেন্ট কমিশন ফর দ্য রিফর্ম অব ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশনের সদস্য

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন