বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

রসায়নে নোবেল

ক্রিসপারই পারে পৃথিবীকে বদলাতে!

ড. নাদিম মাহমুদ

কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক মহামারীর নামের তালিকায় উঠছে কভিড-১৯। বিশ্বের সংকটময় মুহূর্তে সবাই তাকিয়ে রয়েছে বিজ্ঞানের দিকেকখন ভ্যাকসিন আসবে, কখন মানুষ আবার প্রাণোচ্ছল চেনা রূপে ফিরবে।

তাই গবেষকরাও মরিয়া হয়ে লড়ছেন। যুদ্ধের ময়দানে কভিড-১৯-কে পরাজিত করার লড়াইয়ে শরিক হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি।

এমনই এক প্রযুক্তির নাম ক্রিসপার। যাকে আমরা ক্লাস্টার্ড রেগুলারলি ইন্টারস্পেসড শর্ট প্যালিনড্রোমিক রিপিটস (সিআরআইএসপিআর) বা ক্রিসপার বলি।

একটি খুশির খবর দিয়ে লেখা শুরু করতে চাই। বর্তমানে কভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পদ্ধতি হলো রিভার্স ট্রান্সকিপ্টেজ পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন বা আরটিপিসিআর। পদ্ধতিতে মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির নমুনা থেকে রোগ শনাক্তকরণে অন্তত -১০ ঘণ্টা সময় লাগে। ঠিক সময়টাকে কমিয়ে ফেলছে ক্রিসপার।

সপ্তাহ খানেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনিফার ডৌডনার নেতৃত্বে একদল গবেষক একটি পদ্ধতির সূচনা করেন, যা কভিড-১৯ শনাক্তকরণে সময় নেবে মাত্র মিনিট। র্যাপিড কিট নিয়ে বিশ্বে সমালোচনা থাকলেও ডৌডনারা সরাসরি ডিএনএ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছেন। এমনকি খরচও আরটিপিসিআরের চেয়ে কম।

শুধু কভিড-১৯ শনাক্তকরণে নয়, ক্রিসপার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরির কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।

গেল বর্তমান আলোচনা। এইচআইভি, আলঝেইমার, অন্ধত্ব, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগের নিরাময়ে সেরা পদ্ধতি হিসেবে ক্রিসপারের জুড়ি নেই। আমাদের বিশ্বাস, ক্রিসপারে হয়তো আগামী পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

ঠিক এমনই এক আণবিক প্রযুক্তিকে (মলিকুলার টেকনোলজি) রসায়নে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনিফার ডৌডনা জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ইমানুয়েল শরপেন্টিকে যৌথভাবে রসায়নে ভূমিকা রাখার জন্য নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

বিষয়টি অনেকের কাঙ্ক্ষিত ছিল। কারণ আমরা যারা লাইফ সায়েন্সে গবেষণা করছি, তারা কমবেশি সবাই ক্রিসপার-ক্যাস৯-এর সঙ্গে পরিচিত। যদিও আমাদের আশা ছিল প্রযুক্তিকে আরো বছর দুয়েক আগে পুরস্কার দেয়া হবে। তবে নোবেল কমিটি শেষ পর্যন্ত ক্রিসপারকে বেছে নিয়েছে, তাতে আমরা অনেক খুশি।

কেন জিন প্রযুক্তিকে রসায়নে নোবেল দেয়া হলো। রসায়নের সঙ্গে মলিকুলার বায়োলজির যে সম্পর্ক রয়েছে তা সাম্প্রতিক সময়ে পাওয়া নোবেল পুরস্কারগুলো বলে দিচ্ছে।

সাধারণত নোবেল পুরস্কার, মৌলিক গবেষণা মানবজাতির উপকারে কতটুকু লাগছে, তার হিসাব কষে দেয়া হচ্ছে। যদিও গবেষণা প্রকাশের কয়েক দশক পর এসব পুরস্কার গবেষকরা ঘরে তোলেন, তবে এবার রসায়নে যে পুরস্কারটি এসেছে তা আবিষ্কার হয়েছে মাত্র আট বছর আগে। প্রোগ্রামেবল ডুয়াল-আরএনএ-গাইডেড ডিএনএ এন্ডোনিউক্লিয়াস ইন অ্যাডাপটিভ ব্যাকটেরিয়াল ইমিউনিটি শিরোনামে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে মার্টিন জিনেক   চিলিনস্কির ক্রেজিজটরা যখন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, ঠিক তার আগে কেউ ধারণাই করেনি জিনপ্রযুক্তি কখনো আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। যে প্রবন্ধ পেপারটি এখন পর্যন্ত সাড়ে নয় হাজার প্রবন্ধ অনুসরণ বা সাইটেশন করেছে।

ক্রিসপার বোঝানোর আগে কিছু সহজ বিষয় জেনে নিই। আমরা যে হাইব্রিড ফসল ফলাচ্ছি, সুস্বাদু মাছ থেকে শুরু করে গাছের ফলের উৎপাদন বাড়িয়েছি, এতে অনেকাংশে প্রভাব ফেলেছে জেনেটিক মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমও প্রযুক্তি। জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা কোনো গাছ, ফসল বা প্রাণীর দেহের ডিএনএ পরিবর্ধন পরিমার্জন করার সুযোগ পাচ্ছি। সাধারণত ডিএনএ চারটি নিউক্লিওটাইড বা রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। তিনটি নিউক্লিওটাইড মিলে তৈরি হয় একটি অ্যামিনো অ্যাসিড আর অ্যামিনো অ্যাসিডের মালা হচ্ছে প্রোটিন। বলতে গেলে এসব প্রোটিন জিনের ফসল।

আর জিন সম্পাদনার জন্য আমরা যে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছি তা হলো মেগানিউক্লিয়েজ, জিঙ্ক ফিঙ্গার নিউক্লিয়েজ (জেএফএন) ট্রান্সক্রিপশন অ্যাক্টিভেটর লাইক অ্যাফেক্টর নিউক্লিয়েজ বা ট্যালেন।

ক্রিসপার প্রযুক্তি আসার আগে আমরা এসব প্রযুক্তিই জিন প্রকৌশলে কাজে লাগাতাম। সমস্যা ছিল এসব পদ্ধতি অনেক সময়সাপেক্ষ এবং কেবল নির্দিষ্ট কিছু জানা জিনের কাটাছেঁড়া করা যেত। এছাড়া ব্যয়ও ছিল আকাশচুম্বী।

ঠিক এসব সমস্যা এড়িয়ে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে ক্রিসপার। ক্রিসপার হলো একটি জিন সম্পাদনকারী আণবিক যন্ত্র বা টুলস, যার সঙ্গে কিছু নিউক্লিওটাইড থাকে আর এর সঙ্গে একটি সহযোগী এনজাইম ক্যাস৯ থাকে। যে জিনটি জিনোম থেকে অপসারণ করা হবে বা সংযোজন করা হবে সেই জিনের নিউক্লিওটাইডকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাস৯যাকে আমরা কাঁচির সঙ্গে তুলনা করতে পারিকাঙ্ক্ষিত জায়গায় গিয়ে কেটে দেয়।

২০১২ সালে বিজ্ঞানীদের সামনে প্রযুক্তি আসার পর এখন পর্যন্ত একে একবিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার বলে অনেকে বলছেন। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ২০ হাজারের মতো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

জেনিফার ডৌডনা ইমানুয়েল শরপেন্টির গবেষণাটির ফল ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। ইমানুয়েল শরপেন্টি স্ট্রেপটোকক্কাস পায়োজিনস ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করছিলেন, তার আশা ছিল, ব্যাকটেরিয়া টনসিলের মতো রোগ সৃষ্টি করে, সেই বিষয়ে একটা ভালো গবেষণা করা। তার ইচ্ছে ছিল, ব্যাকটেরিয়ার জিন কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ করে তা নিয়ে গবেষণা করা।

কিন্তু তিনি ব্যাকটেরিয়া নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখতে পান, ব্যাকটেরিয়াটির কিছু জিন কাঁচির মতো কাজ করছে। তারপর তিনি এক কনফারেন্সে পরিচিত হন জেনিফার ডৌডনার সঙ্গে। তাকে বিষয়টি খুলে বলেন।


এরপর ডৌডনা তার ল্যাবে গিয়ে তার পোস্টডক মার্টিন জিনেককে বিষয়টি জানান। আগে থেকে মার্টিনের ইচ্ছে ছিল স্ট্রাকচারাল বায়োলজি নিয়ে গবেষণা করার। আর সেই আগ্রহের জায়গা থেকে জিনেক কাজটি করার সুযোগ পেলেন। অন্যদিকে ইমানুয়েলের ল্যাব থেকে কোলাবরেটর হিসেবে যোগ দিলেন চিলিনস্কির ক্রেজিজট।

ঠিক এক অনাকাঙ্ক্ষিত গবেষণা ফুটে উঠেছে ক্রিসপারে। লুই পাস্তুরের চান্স ফেবারস দ্য প্রিপেয়ার্ড মাইন্ড উক্তিকে ইমানুয়েল মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।

আর এভাবে তাদের কাজ এগিয়ে যায়। যদিও একই সঙ্গে আরো এক গবেষক ফাং জাং, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রড ইনস্টিটিউটে কাজ করছেন, তিনিও গ্রাউন্ড বেকিং কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। তার গবেষণাও ডৌডনা শরপেন্টির লেবেলে ছিল। যদিও আমাদের আশা ছিল, তিনিও ক্রিসপারে নোবেল পাবেন, কিন্তু সর্বশেষ তিনি পাননি।

ক্রিসপাস-ক্যাস৯-এর বিপ্লব চলবে আগামীতে। আমরা কল্পবিজ্ঞানে যেসব দৈত্য, যেসব শক্তিশালী চরিত্র পড়তাম, কিংবা সাই-ফাই মুভিতে দেখতাম তা আমাদের সামনে হাতছানি দিচ্ছে।

যাবতীয় রোগের গবেষণায় ক্রিসপার টুলস আগামী দিনের আশীর্বাদ হতে পারে। যা কাজে লাগিয়ে হাইব্রিড মানব অর্থাৎ শক্তি, বুদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষম করা যে সম্ভব তাতে কারো দ্বিধা নেই।

বলতে গেলে অর্ডার দিয়ে মানুষ অন্যান্য জীবের কপি তৈরি করা সম্ভব। এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ২০১৮ সালে। চীনের বিজ্ঞানী হি জিয়ানকই ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথম তার ল্যাবরেটরিতে নিজের প্রয়োজনমতো জিনের সংশোধন সংযোজন করে দুই শিশুকে ল্যাবে তৈরি করেন। খবরটি প্রকাশের পর সারা বিশ্বে সায়েন্টিফিক কমিউনিটিতে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সর্বশেষ তথ্য, চীন সরকার সেই গবেষকের গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি তাকে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছে।

আর তাই প্রয়োজন জিনোম এডিটিং নীতিমালা। যে নীতিমালায় থাকবে ক্রিসপারের ভবিষ্যৎ ব্যবহার। সেটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত দুই নারী গবেষকের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে পারে। পৃথিবী হতে পারে অন্য রকম। আমরা চাই আরোগ্য, আমরা চাই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। ঠিক কাজটি করার লড়াইয়ে ক্রিসপার এগিয়ে যাবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।

 

. নাদিম মাহমুদ: গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন