রবিবার | নভেম্বর ০১, ২০২০ | ১৬ কার্তিক ১৪২৭

শেষ পাতা

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ

দেশে শঙ্কা বাড়লেও শয্যা কমছে

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

আসন্ন শীতে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রাণহানি বৃদ্ধির শঙ্কা যতই বাড়ছে, ততই কমছে সারা দেশে কভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা। সেই সঙ্গে অন্যান্য চিকিৎসা যন্ত্রাংশও অপর্যাপ্ত। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রায় এক মাস ধরে বলে আসছেন, দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে তার মন্ত্রণালয়ের।

বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর প্রথম ধাক্কাটি আসে প্রায় আট মাস আগে। সেই ধাক্কা সামলাতে গিয়ে ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্থনীতি, প্রাণ হারিয়েছেন সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

এদিকে শীতের আগেই উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে ভাইরাসটির সংক্রমণ বাড়ছে বলে গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও)

বাংলাদেশে কার্তিক মাস শুরু হয়েছে। শীতকাল আসতে বেশি দেরি নেই। দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমের চেয়ে ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ শীতপ্রধান দেশে এমনটি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে যে এমন হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু আশঙ্কা বাড়ার সঙ্গে প্রস্তুতির অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া গত তিন মাসে ঢাকা মহানগরে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৬ আগস্ট ঢাকা মহানগরীতে ২১ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য শয্যা সংখ্যা ছিল হাজার ৩৭টি। এক মাস পর ১৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যা দাঁড়ায় হাজার ১০৭টি। দুটি হাসপাতাল কমে ১৯টি হাসপাতালে ১৬ অক্টোবর শয্যা সংখ্যা হাজার ৫১৯টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে করোনা রোগীদের জন্য সারা দেশের হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে (১৬ অক্টোবর) ১১ হাজার ৬৮৭টি। 

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বাংলাদেশে দ্বিতীয় পর্যায়ে মারাত্মকভাবে সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সেপ্টেম্বরে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করতেও বলা হয়েছিল। তবে করোনার প্রথম আঘাতের সময়কার অবস্থার চেয়ে বেশি একটা উন্নতি করতে পারেনি জেলা হাসপাতালগুলো।

১৬ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সারা দেশে করোনা রোগীদের সেবায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রয়েছে মাত্র ৫৬৪টি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৩১৪টি, ঢাকা বিভাগে ৬৪, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭, চট্টগ্রাম মহানগরে ৩৯, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪০, রাজশাহী বিভাগে ২৪, রংপুর বিভাগে ২০, খুলনা বিভাগে ১৮, বরিশাল বিভাগে ১২ এবং সিলেট বিভাগে ১৬টি আইসিইউ রয়েছে।

করোনার প্রথম ধাক্কার সংক্রমণের সময়ে ভেন্টিলেটরের সংকট দেখা দিয়েছিল। এখন ভেন্টিলেটরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৯৮৭টিতে। কোনো কোনো বিভাগে সংখ্যা ১৫ ১২টিতেও রয়েছে। সারা দেশে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে ৫৪১টি, অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের সংখ্যা রয়েছে মাত্র ৩৫৬টি। সেন্ট্রাল অক্সিজেনের সংযোগ এখনো সব জেলা হাসপাতালে পৌঁছেনি। তবে ১৮ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দাবি করেছেন, ৭৮টি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সংযোগ রয়েছে। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া জানান, করোনা রোগীর সংখ্যা কমার কারণে হাসপাতাল শয্যা সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করোনা মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা মোকাবেলার জন্য আমরা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের কাজ পরামর্শ দেয়া।

করোনা শুরুর পর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পরবর্তী ঢেউ মোকাবেলার জন্য হাসপাতালগুলো প্রস্তুতের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যথেষ্ট সময় পেয়েছে মন্তব্য করে ভাইরোলজিস্ট বলেন, প্রায় তিন মাস আগে আমরা বলেছিলাম, এক হাজার হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আমদানি করার জন্য। কিন্তু তারা তা করেনি, যা আছে তা বিভিন্নভাবে পাওয়া। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ করতে বলেছিলাম। ঢাকা মহানগরীর মধ্যেই অনেক হাসপাতালে সেই ব্যবস্থা করা হয়নি। তো জেলা হাসপাতালের কী হবে? মানুষকে সচেতন করার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা রয়েছে মন্তব্য করে ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ যেন ছড়িয়ে না পড়তে পারে তার জন্য মানুষকে সচেতন হতে হবে। মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু সেই কাজে ভাটা পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং জেলা হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করতে বলেছেন। কিন্তু সেগুলোর অবস্থা তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি।

শীতকালে করোনার সংক্রমণ বাড়লে তা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতএমনটি বলে আসছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, প্রস্তুত বলতে আমরা এখন সেবা বাড়ানোর কাজে আছি। অনেক যন্ত্রাংশ এখনো দেশে আসার পথে আছে। সেই সঙ্গে করোনার রোগীও কিন্তু (হাসপাতালে) পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রস্তুত না হয়ে প্রস্তুত বলা কতটুকু যৌক্তিক, এমন প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান কর্মকর্তা। ডা. নাসিমার অভিযোগ, বারবার বলার পরও সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা নেই। এখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কতটুকু করতে পারবে বলেও প্রশ্ন রাখেন তিনি।

বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলমের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, এসব তথ্য (প্রস্তুতি সংক্রান্ত) এখনো তার জানা নেই।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন প্রতিবেদক। তার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করলেও তিনি জবাব দেননি।

গতকাল রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে করোনা মোকাবেলায় সব প্রস্তুতি রয়েছে এমন বক্তব্য রাখেন জাহিদ মালেক। অনুষ্ঠান শেষে প্রস্তুতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি জানতে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভারতও কিন্তু করোনার বিস্তার ঠেকাতে পারেনি। শীতকালে করোনার বিস্তার ঠেকাতে আমাদের যা পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা নিয়েছি। তবে পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন