মঙ্গলবার | অক্টোবর ২০, ২০২০ | ৪ কার্তিক ১৪২৭

শেষ পাতা

হাতবদলের সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে আইএমইআই নম্বর

নিহাল হাসনাইন

রাতে চুরি বা ছিনতাই হওয়া সেলফোনগুলো ভোররাতেই চলে যাচ্ছে রাজধানীর চোরাই ফোনের বাজারে। সেখান থেকে দামি ফোনগুলো নামমাত্র মূল্যে কিনে নেন মেরামতকারীরা। পরবর্তী সময়ে চোরাই ফোনের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর পরিবর্তন করে বিক্রি করা হচ্ছে চড়া মূল্যে। এসব চোরাই ফোন বিক্রির জন্য বেছে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন শপ। চক্রের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতারের পর পাঁচ হাজারেরও বেশি পরিবর্তন করা আইএমইআই নম্বর উদ্ধার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এসব নম্বরের মধ্যে একটি আইএমইআই নম্বরেই চার শতাধিক সেলফোন ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিটি হ্যান্ডসেটে ১৫ সংখ্যার একটি অনন্য নম্বর থাকে, যা আইএমইআই নামে পরিচিত। হ্যান্ডসেটে *#০৬# নম্বরগুলো পরপর চাপলে আইএমইআই নম্বর জানা যায়। হ্যান্ডসেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, মডেল ক্রমিকের সমন্বয়ে গঠন করা হয় আইএমইআই নম্বর। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটগুলোর ক্ষেত্রে এটি মানা হলেও নন-ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটে ভুয়া আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করা হয়। তবে দেশের বাজারে এখন চুরি হওয়া সেলফোনের আইএমইআই পরিবর্তন করে তা ফের বিক্রি করা হচ্ছে। এতে  চুরি যাওয়া সেলফোনের সন্ধান জানতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনের ফলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক লেনদেনের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সিআইডি জানায়, উদ্ধার হওয়া পাঁচ হাজার আইএমইআই নম্বর বর্তমান অবস্থান জানতে সেলফোন অপারেটর কোম্পানি গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক টেলিটককে চিঠি দেয়া হয়েছে। পরে চাহিদা অনুযায়ী তারা তথ্য সরবরাহ করেন। সেলফোন অপারেটরদের সরবরাহ করা তথ্যে দেখা যায় একই আইএমইআই দিয়ে একই সময়ে একাধিক সেলফোন চলছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি আইএমইআই দিয়ে কয়েকশ সেলফোন ব্যবহার হওয়ার তথ্যও পাওয়া গিয়েছে। সেলফোনগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বেশকিছু এলাকায় ভিন্ন অপারেটরে ব্যবহার হচ্ছে।

অনুসন্ধানের তথ্যমতে, রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী মার্কেটের পাশের সড়কে ভোর ৪টার দিকে বসে চোরাই ফোনের বাজার। সারারাত রাজধানীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি এবং সড়ক থেকে চুরি ছিনতাই হওয়া ফোনগুলো ভোররাতে নিয়ে আসা হয় বাজারে। চোরাই ফোনের বাজারের প্রধান ক্রেতা হিসেবে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণীর সেলফোন মেকাররা। অল্প দামে তারা দামি ফোনগুলো কিনে নেন। পরে ওই ফোনগুলো নিয়ে যাওয়া হয় আইএমইআই পরিবর্তনকারী চক্রের কাছে। থেকে ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে ওইসব ফোনের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে বৈধ ফোন হিসেবে বিক্রির জন্য বিভিন্ন -কমার্স সাইটে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। পরে চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয় চোরাই ফোন।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, সেলফোনের অপারেটিং সিস্টেমের সিকিউরিটি দুর্বলতার কারণে আইএমইআই পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে। স্যামসাং ছাড়া অধিকাংশ সেলফোনেই যে কোনো আইএমইআই নম্বর বসিয়ে সেটি সচল করা যায়। কিন্তু স্যামসাংয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই স্যামসাংয়ের আইএমইআই বসাতে হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সার্ভিস সেন্টারে কর্মরতদের আইডি পাসওয়ার্ড প্রতি ঘণ্টা ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে মূল সার্ভারে প্রবেশ করেন আইএমইআই পরিবর্তন চক্রের সদস্যরা। সেখান থেকে নতুন আইএমইআই ব্যবহার করে সেলফোনটি বিক্রি করা হয় চড়া মূল্যে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, সেলফোন চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি হওয়ার পর আইএমইআই নম্বরটি ট্র্যাক করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার ধরনের পরিবর্তন করা আইএমইআইযুক্ত সেলফোন দিয়ে অপরাধীরা নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করলেও তাদের অনেক ক্ষেত্রেই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি সেলফোনের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনের কারণে আগের মতো প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রাজীব ফারহান বণিক বার্তাকে বলেন, সেলফোনের আইএমইআই পরিবর্তনকারী চক্রটি খুবই সংঘবদ্ধভাবে কাজটি করে থাকে। যেসব সেলফোনের আইএমইআই তারা পরিবর্তন করতে পারেন না, সেগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেলফোন আইএমইআই নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি শক্তিশালী করার মাধ্যমে ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলেও মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন