বুধবার | অক্টোবর ২১, ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

অর্থনীতির নোবেল ও বব উইলসন

ড. এম এ মোমেন

পল ৭০ ছাড়িয়ে আর বব ৮০ ছাড়িয়ে যাওয়া বুড়ো। ৪৫ বছর ধরে খুব কাছাকাছি আছেন। এখন তো আরো কাছাকাছি, একই রাস্তার এপার আর ওপার। দূরত্ব ৪০ মিটার।

স্ট্যানফোর্ড নিউজ ও সিএনএন থেকে ১৩ অক্টোবর ২০২০-এর একটি আপডেটেড সংবাদ তুলে ধরতে প্রলুব্ধ হচ্ছি। দুটো সংবাদের মিশেল ঘটেছে আমার অনুবাদে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মিলগ্রম সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২০) এত ভোরে দরজায় কড়া নাড়া শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, কড়া নাড়ছেন তার প্রতিবেশী।

‘পল আমি বব উইলসন। তুমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছ।’

রবার্ট উইলসন তার শিক্ষক পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক ছাত্রের সঙ্গে একই সঙ্গে ২০২০ সালের অর্থনীতি বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। খবরটা হজম করতে একটু সময় নিয়ে মিলগ্রম বললেন, ‘ওহ তাই, ওকে।’

ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ডে মিলগ্রমের বাড়ির সামনের সিকিউরিটি ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে উইলসন ও তার স্ত্রী ম্যারি প্রাক-প্রভাত অন্ধকারের (সিএনএন বলছে ভোর ২টা ১৫ মিনিট) মিলগ্রমের ঘরের সামনের দরজায় উঠে কয়েক সেকেন্ড ধরে ডোরবেল বাজাচ্ছেন। দরজায় টোকা দিচ্ছেন তাকে জাগিয়ে খবরটা দেবেন।

সুইডেনে দিনের বেলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট কোস্টে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। উইলসন বললেন, ‘তারা তোমাকে ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। তাদের কাছে সম্ভবত তোমার নম্বর নেই।’

ম্যারি তখন বললেন, ‘আমার নম্বরটা দিয়ে দিয়েছি।’

একটু নীরবতার পর দরজার অন্যপ্রান্ত থেকে তিনি বললেন, ‘আমি (নোবেল) পেয়েছি, ওয়াও।’

হেসে উইলসনের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ফোনের জবাব দেবে তো?

মিলগ্রমের স্ত্রী তখন সুইডেনে স্ট্যানফোর্ডের বাড়ির ডোরবেলের সিকিউরিটি ক্যামেরায় নোটিফিকেশন পেয়ে দেখলেন উইলসন তার স্বামীকে শুভ সংবাদটি জানাচ্ছেন। ফালতু কল ভেবে একটু আগে উইলসনও নিজেই তার বাড়ির ফোনটির প্লাগ খুলে রেখেছিলেন। তাকে না পেয়ে নোবেল কমিটি থেকে খবরটি তার স্ত্রী ম্যারিকে দেয়া হয়।

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতির উদ্দেশে সেভেরিজেস রিকসব্যাঙ্ক প্রাইজ ইন ইকোনমিক সায়েন্স পুরস্কার ২০২০ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক পল মিলগ্রম ও রবার্ট উইলসনকে প্রদান করেছে। তারা ‘নিলামতত্ত্ব সমৃদ্ধ করেছেন এবং নিলামের নতুন ফরম্যাট আবিষ্কার করেছেন’। পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার)।

গত ৫২ বছরে নোবেল কমিটি ৮৬ জন অর্থনীতিবিদকে নোবেল সম্মানে ভূষিত করেছে। পল ও বব যথাক্রমে ৮৫ ও ৮৬তম নোবেল লরিয়েট।

পল ও বব একই লক্ষ্যে অর্থনীতি বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের যৌথ উদ্যোগ নিয়ে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি বলেছে: তাদের আবিষ্কার সমাজকে বিশেষভাবে উপকৃত করেছে। নব্য অর্থনীতির সফল ঘটক দুজন, ঘটকালিটা মানুষের কল্যাণে এসেছে এবং বাজার পরিকল্পনায় ঝুঁকি ও ত্রুটি কমে এসেছে।

রবার্ট উইলসনের সরাসরি তিন ছাত্র অর্থনীতির নোবেল পেলেন: আলভিন রথ (জন্ম ১৮ ডিসেম্বর ১৯৫১) ২০১২ সালে, বেঙ্গট হোমস্ট্রম (জন্ম ১৮ এপ্রিল ১৯৪৯) ২০১৬ সালে এবং পল মিলগ্রম ২০২০ সালে শিক্ষক রবার্ট উইলসনের সঙ্গে। নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন এমন আরো কজন ছাত্রের নাম আলোচনায় আসছে।

রবার্ট বাটলার উইলসন জুনিয়র

জন্ম ১৬ মে ১৯৩৭ নেব্রাস্কায়, স্কুল ফাইনাল সেখানেই, মেধাবী বব উইলসন পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন, ১৯৫৯ সালে গ্র্যাজুয়েট এবং ১৯৬১-তে এমবিএ ডিগ্রিধারী হলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডক্টর ইন বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ১৯৬৩ সালে। তারপর কিছুদিন তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৪ থেকেই স্ট্যানফোর্ড বিজনেস স্কুলের ফ্যাকাল্টি। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ পর্যন্ত হার্ভার্ড ল স্কুলের এফিলিয়েটেড ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজ করেছেন। 

রবার্ট উইলসন অর্থনীতির গেইম থিওরি এবং তার প্রায়োগিক জ্ঞানে বিশ্বনন্দিত একজন বিশেষজ্ঞ। তার গবেষণা ও শিক্ষকতাজীবন যেসব বিষয়কে ধারণ করে আছে তার মধ্যে রয়েছে বাজার পরিকল্পনা, মূল্য নির্ধারণ, দরকষাকষি, তথ্য অর্থনীতি, শিল্প সংগঠন, নিলাম পরিকল্পনা, জ্বালানি, প্রযুক্তিগত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি খাতে প্রতিযোগিতামূলক ডাকের পদ্ধতি নির্ধারণ। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তার দ্য থিওরি অব সিন্ডিকেটস কয়েক প্রজন্ম ধরে ইকোনমিকস, ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টিংয়ের শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে যাচ্ছে।

তার গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। বহুসংখ্যক জার্নালের তিনি সহযোগী সম্পাদক। এখনো তিনি তার ছাত্র-গবেষকদের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং এগুলোর মানোন্নয়নের জন্য উদারভাবে পরামর্শ দিয়ে যান। তিনি উপদেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে তেল কোম্পানির জন্য অফশোর লিজিংয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, ভোক্তার ভার কমাতে চেষ্টা করেছেন, অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা পদ্ধতি পরিকল্পনা, পাইকারি বাজার পরিকল্পনা, পরিবেশ ও আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অতিপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের মূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন কাজে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছেন। নোবেল কমিটি তার অনেক কাজের মধ্যে নিলামে মূল্য নির্ধারণী গবেষণাকে সামনে নিয়ে এসেছে এবং অর্থনীতিতে তার ও তার সহকর্মী পল মিলগ্রমের উদ্যোগের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে উভয়কে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।

বব উইলসন মূলত শিক্ষক

আলভিন রথ নিজে ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তার শিক্ষক বব উইলসন সম্পর্কে লিখেছেন: স্ট্যানফোর্ডে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আসা জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল মাশলারের একটি ক্লাস করার পরই আমি সিদ্ধান্ত নিই গেইম থিওরি হবে আমার গবেষণার বিষয়। বব উইলসন আমার তত্ত্বাবধায়ক হতে রাজি হলেন। শুধু তা-ই নয় পিএইচডির জন্য যোগ্য হতে যেসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় তার একটিতে আমি পাস করতে না পারলেও তিনি তা সামলে নেন। সেই বছরটা ছিল তার শিক্ষা ছুটির বছর। তবুও তিনি প্রতি সপ্তাহে একদিন আমার জন্য ১ ঘণ্টা বরাদ্দ রেখেছিলেন। আমার স্মৃতিতে যা আছে তা হচ্ছে আমাদের প্রতিটি সাক্ষাতের পর আমার জন্য অনিবার্য হয়ে উঠত একটা নতুন কিছু পড়া। আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করতাম গত এক সপ্তাহে আমার কেন তেমন অগ্রগতি হয়নি, আর তিনি বলতেন এতে নিরুসাহিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি বলতাম, আমার কাজে কিছু দূর এগিয়ে আটকে গেছি, আমাদের আলোচনার শেষদিকে তিনি আমাকে একটা বিশেষ কোনো পেপার পড়ার কথা বলে দিতেন। তিনি যা বলতেন তা বরাবরই ছিল লক্ষ্যভেদী। তার অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা লাইব্রেরিতে। বেশ খানিকক্ষণ পড়ার পর বুঝতে পারলাম বব নিশ্চয়ই ভুল করেছেন। এই পেপারের সাথে আমার অগ্রগতি আটকে যাওয়ার সম্পর্ক কোথায়? তারপর পেপারের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছে হঠাৎ একটা ইঙ্গিত বা মন্তব্য পেয়ে গেলাম, যা আমার অগ্রগতির বাধাটিকে কাটিয়ে দিল।


বব উইলসন এভাবেই আমাদের শিখিয়েছেন। 

২০১৬ সালের নোবেল বিজয়ী ফিনল্যান্ডের বেঙ্গট হোমস্ট্রম তার শিক্ষক রবার্ট উইলসন সম্পর্কে লিখেছেন:

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব বিজনেসে তখন পর্বতপ্রমাণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন বব উইলসন। বয়স তখনো তার ৪০ হয়নি। দেখতে আরো ১০ বছর কম মনে হয়। তার প্রভাব স্কুলের ডিসিশন সায়েন্স গ্রুপ বাইরে বহুদূর ছড়িয়ে। আমি অর্থনীতিতে ববের প্রথম যে ক্লাসটিতে যোগ দিই তা ছিল তার আইকনিক মাল্টিপারসন ডিসিশন থিওরি কোর্স। বব কৌতূহলোদ্দীপক মনে করেছেন এমন বহু নতুন বিষয় নিয়ে এ কোর্সটি তিনি প্রণয়ন করেছেন। প্রতি বছরই কোর্সের ধরন পরিবর্তন হয়। আমি তিনবার তার এই ক্লাস করেছি। ববের পড়ানোর ধরন আমার মনে স্থায়ী দাগ কেটেছে। তিনি কোনো পেপারের সমালোচনা করা বা পেপার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করায় আগ্রহী ছিলেন না। বরং যে প্রশ্নটিকে ঘিরে পেপারটি রচিত হয়েছে তিনি তা নিয়ে আলোচনা করতে এবং প্রশ্নটি কেমন করে অর্থনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে তা বিশ্লেষণ করতে পছন্দ করতেন এবং অংক ও সংখ্যা দিয়ে বিশ্লেষণ সম্ভব একটি গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করতেন।

রবার্ট উইলসনের শিক্ষার্থীদের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল ববের অনানুষ্ঠানিক পাঠচক্র। অর্থনীতির বিভিন্ন শাখা-উপশাখার গবেষকরা এতে যোগ দিতেন। এর কোনো ধরাবাঁধা কাঠামো ছিল না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যার কিছু বলার আছে তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে চলে যেতেন, একটি মডেলের খসড়া দাঁড় করাতেন, এখান থেকে চিন্তা করার মতো অনেক বিষয় বেরিয়ে আসত—এটা ছিল মজার ক্লাস, কিছুটা আতঙ্কেরও, কিন্তু সব সময়ই অনুপ্রেরণাদায়ক। পিএইচডি গবেষণায় উপদেষ্টা হিসেবে তিনি গবেষকদের উদারভাবে সময় মঞ্জুর করতেন, কিন্তু তাদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুযোগ দিতেন না। ববের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারাটাতেই ছিল উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা নিয়ে ফিরে আসার নিশ্চয়তা।

আমি কখনো তার অফিসে খালি হাতে যাওয়ার ধৃষ্ঠতা দেখাইনি। শেষ মুহূর্তে হলেও একটি কিছু লিখে তার হাত দিয়েছি।

খারাপ হলেও এটা কিছুই হয়নি এ ধরনের কঠোর মন্তব্য তিনি করতেন না। ‘আমি তার অনুমোদন এবং অননুমোদনের সূক্ষ্ম ভাষাটি বুঝতে পারি। তার মন্তব্যগুলো ছিল গভীর ও অন্তর্ভেদী’...আমার এ কথার মধ্যে এতটুকুও বাড়াবাড়ি নেই যদি আমি বলি, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মেধাবী তরুণদের কার অন্তর্দৃষ্টি ও ভবিষ্যৎ দর্শন দিয়ে যেভাবে তিনি তৈরি করেছেন তার সাহায্য ছাড়া অর্থনীতির গেইম থিওরির এমন বহুমুখী বিকাশ ঘটত না’ তাহলে আমার কথা মোটেও অতিরঞ্জিত হবে না।

তার তিন নোবেলজয়ী ছাত্রের নোবেলপ্রাপ্তি ঘটেছে বয়সের রিভার্স অর্ডারে—কম বয়স থেকে বেশি বয়সে। পল মিলগ্রম তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম। তবে তার অধীন পিএইচডির হিসেবে অর্ডার ঠিক আছে বলতে হবে। রথ করেছেন চুয়াত্তরে, হোমস্ট্রম আটাত্তরে, মিলগ্রম ঊনাশিতে। পল ও ববের মধ্যেই সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। নিজের নোবেল পাওয়ার কথা শুনে তারই মনে হতে পারে, তার শিক্ষক বব উইলসন কেন বাদ যাবেন।

অর্থনীতির ঐতিহাসিকদের চোখে ‘বব উইলসন রাজবংশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বব উইলসনের পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড রাইফা (১৯২৪-২০১৬) আর তার তত্ত্বাবধায়ক মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কোপল্যান্ড (১৮৯৮-১৯৭০) তারা প্রত্যেকেই অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনার দিকপাল।

অ্যাডাম স্মিথ-বব উইলসন কথোপকথন

টেলিফোনের এক প্রান্তে ধনতন্ত্রবাদের জনক, আধুনিক অর্থনীতির জনক দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ প্রণেতা ২৩০ বছর আগে প্রয়াত অ্যাডাম স্মিথ নন। তিনি নোবেল মিডিয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। তিনি নোবেল প্রাইজ পাওয়ার খবরটি দিয়ে রবার্ট উইলসনকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, আমরা এইমাত্র পল মিলগ্রমের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বললেন, আপনি রাস্তা পেরিয়ে তার দরজায় বেল বাজিয়ে খবরটা তাকে দিয়েছেন।

রবার্ট উইলসন: ঠিকই বলেছেন, রাতে একটা ভালো ঘুম দেয়ার জন্য তিনি ফোন বন্ধ করে রেখেছিলেন। কাউকে না কাউকে তাকে জাগানোর কাজটা করতে হতো। আমি যেহেতু রাস্তার এ পাড়ে থাকি, রাস্তা পেরিয়ে তার দরজায় টোকা দিই, তার ঘুম ভাঙাই।

অ্যাডাম স্মিথ: আমার মনে হয়, নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটল।

জবাবে বব উইলসন বললেন, দরজায় টোকা দেয়ার ব্যাপারটা ঊনবিংশ শতাব্দীর মতো শোনায়। আমাদের দুজনের বাড়ির মাঝখানে মাত্র ৪০ মিটার।

অ্যাডাম স্মিথ: মোদ্দাকথা আপনি তাকে ব্রেকিং নিউজটা দিলেন। আপনারা পরস্পরকে কী বললেন? তার প্রতিক্রিয়া কী?

রবার্ট উইলসন: বললাম অভিনন্দন। পরে তিনি আমাকে বলেছেন, আমার কথায় তিনি ভেবেছিলেন, কেবল তিনি একাই পুরস্কার পেয়েছেন। আমাকে কেন পুরস্কারে অন্তর্ভুক্ত করল না জিজ্ঞেস করলেন, আমার প্রতি যথেষ্ট সদয়। আমি তো সবসময় আমাদের কাজে তাকে নেতা মনে করেছি। আমি তাকে নিয়ে খুব গর্বিত। কারণ তিনি তার পিএইচডিতে আমার ছাত্র ছিলেন। প্রথম দিকে আমি যে তাকে বাজার ও নিলাম পরিকল্পনায় প্রভাবিত করতে পেরেছি, এতেই আমার আনন্দ। তাকে নিয়ে আমার তৃতীয় ছাত্র নোবেল পুরস্কার পেলেন।

অ্যাডাম স্মিথ: আলভিন রথ ও বেঙ্গট হোমস্ট্রম, তাই না?

রবার্ট উইলসন: ঠিক। সেজন্য আমি মানুষকে এতদিন বলে আসছিলাম, পল যদি নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান তাহলে এটা আমার জন্য ‘ট্রাইফেক্টা’ হবে—সবকিছুর চমত্কার সমন্বয় (ট্রাইফেক্টা বিশ শতকের শেষভাগে অভিধানভুক্ত একটি বেসিং সম্পৃক্ত শব্দ। কেউ যদি ঘোড়দৌড়ের প্রথম তিন বিজয়ীর ওপর বাজি রেখে জিতে যায় তার অর্জন হচ্ছে ট্রাইফেক্টা)। সবই সুন্দরভাবে মিলে গেল।

অ্যাডাম স্মিথ: ক্রিকেটের পরিভাষায় আমরা একে বলব হ্যাটট্রিক।

রবার্ট উইলসন: হ্যাঁ, হ্যাটট্রিক, ঠিকই।

অ্যাডাম স্মিথ: প্রশ্নটি আমি পল মিলগ্রমকে করেছিলাম—আপনাদের দুজনের মধ্যে জাদুটা কী—যা এত উৎপাদনমুখী, সৃষ্টিশীল?

রবার্ট উইলসন: আমি অনেকটা অনুমাননির্ভর ভাবুক, কিন্তু পল একেবারে সুনির্দিষ্ট। আমি বেতার তরঙ্গ নিলামের কথা বলেছি, তাতে খুব উদ্ভাবনশীল উপাদান তিনি যোগ করেছিলেন। আমি অনেকটাই ঐতিহ্যগত নিলামতাত্ত্বিক। কিন্তু তিনি নিলাম পরিকল্পনায় এতটাই সৃজনশীল উপাদান যোগ করেছেন—আমরা একে বলি প্যাকেজ অকশন—প্যাকেজ নিলাম।

রবার্ট উইলসন: আমি সবসময়ই বেঙ্গট, আলভিন ও পলকে নিয়ে গর্ব করেছি। তাদের বিস্ময়কর প্রতিভা।

অ্যাডাম স্মিথ: এখন সময়টা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার, এটা কিছুটা কঠিনই হবে, কিন্তু স্পষ্টত আপনারা সবাই একত্র হয়ে এই নতুন আনন্দটি উদযাপন করতে পারতেন।

রবার্ট উইলসন: ঠিক বলেছেন, করতে পারলে ভালো হতো।

অ্যাডাম স্মিথ: আবার আমার উষ্ণ অভিনন্দন।

রবার্ট উইলসন: আমাকে বলতে হচ্ছে, আপনার নাম অ্যাডাম স্মিথ হওয়াটা খুব যুক্তিযুক্ত হয়েছে।

অ্যাডাম স্মিথ: আমার অ্যাডাম স্মিথ নামটা আমাকে সমস্যায়ও ফেলতে পারে। কারণ আগে যারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তারা বিশ্বাস করতে চাইবেন না, ঘোষণার দিন অ্যাডাম স্মিথ তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলাটা অনেক আনন্দের। আশা করছি আমরা আরো দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলার সুযোগ পাব। আজকের মতো আপনার শুভদিন কামনা করে বিদায় নিচ্ছি। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

অকশন থিওরি বা নিলামতত্ত্ব হচ্ছে মুক্তবাজারে কাম্য উপযোগিতার জন্য শ্রেষ্ঠ নিলাম ডাককারীর কাছে সম্পদ কিংবা বস্তু বরাদ্দ করার ধারণা। প্রায়োগিক অর্থনীতির একটি শাখা নিলাম, নিলামতত্ত্ব সম্পদ ও বস্তুর প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে বিধান ও হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রদান করে। 

এটাই স্বাভাবিক যে নিলামের সময় সম্পদের মালিক সর্বোচ্চ ডাককারীর কাছে তার সম্পদ বা বস্তু বিক্রি করবেন। আবার কেনার সময় একই রকম বস্তু সবচেয়ে কম দামে দিতে যিনি রাজি থাকেন, তার কাছ থেকেই কিনবেন। এখনকার এই বিশ্বায়িত খোলাবাজার ও প্রযুক্তির অগ্রসরমানতার যুগে প্রতিদিনই নিলামে অবিশ্বাস্য মূল্যের দ্রব্য ও সম্পদ হস্তান্তর হচ্ছে। বাড়িঘর, দোকানপাট, গাড়ি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, টেলিকম স্পেকট্রাম, খনিজ দ্রব্য, মূল্যবান ধাতব পদার্থ এসবের নিলাম হচ্ছে। ট্রেজারি বিল, বৈদেশিক মুদ্রা, তেলক্ষেত্র, জমিন, এয়ারপোর্ট, রেলওয়ে এমন আরো অনেক কিছু নিলামে তুলছে সরকার স্বয়ং। ব্যক্তিমালিকানা খাতের সম্প্রসারণ নিলামের আকার ও প্রকৃতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি বিপন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য খাদ্যসামগ্রীর সরকারি ক্রয় তাও নিলামের মাধ্যমে হচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির যে সমাজ, তাতে ব্যক্তির জীবনের সব ক্ষেত্রকেই নিলাম কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করছে। একটি উদাহরণ এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলবে: ধরা যাক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ নিলামে তোলা হলো। যদি সর্বোচ্চ ডাককারীকে নিলাম বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, তাহলে প্রত্যেক বাড়িতে ও কর্মক্ষেত্রে বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাবে। 

এক্ষেত্রে নিলামতত্ত্ব কেমন করে কাজ করে? নিলাম সাধারণভাবে দ্রব্যের মূল্য আবিষ্কারের পথ করে দেয়। নিলামতত্ত্ব দেখে কেমন করে নিলামের পরিকল্পনা করা হয়, কোন বিধান নিলাম পরিচালনা করে, নিলাম ডাককারীরা কেমন আচরণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত কী ফলাফল অর্জিত হয়। 

নিলাম শুনলেই যে দৃশ্যটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসে তা হচ্ছে একজন দেউলিয়া ব্যক্তির পাওনাদারকে পরিশোধ করার জন্য তার সম্পদ ডাকে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে এটাই হচ্ছে নিলামের সবচেয়ে পুরনো ধরন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডাককারী টাকা দিয়ে তার সম্পদ বা দ্রব্য নিজ দখলে নিয়ে নেন। ডাকের মাধ্যমেই মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায়। 

কিন্তু বিগত দশকগুলোতে বিচিত্র ধরনের সামগ্রী ও সেবা ডাকের হাতুড়ির তলায় এসে পড়েছে। দেউলিয়া ব্যক্তির সম্পদ আর রেডিও বা টেলিকম স্পেকট্রাম প্রকৃতিগতভাবে এক নয়। কোন কোম্পানিকে বাড়ি বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হবে কিংবা স্পট মার্কেট থেকে বিদ্যুৎ কেনা এবং কার্বন নিঃসরণ ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা একই মাপকাঠিতে হওয়ার নয়। নিলামতত্ত্ব বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে এ কাজগুলো করে। এ তত্ত্বের প্রায়োগিক আধুনিকায়ন ঘটেছে রবার্ট উইলসন ও পল মিলগ্রমের যৌথ ও স্বতন্ত্র কাজে। তাদের কাজে ডাকে অংশগ্রহণকারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পক্ষগুলো উপকৃত হয়েছে বলেই তাদের ব্যবস্থাপত্র সারা পৃথিবীই গ্রহণ করেছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গত ২০ বছরে কিংবা তার চেয়েও বেশি সময়ে প্রদত্ত নোবেল স্বীকৃতির মধ্যে সম্ভবত এটাই শ্রেষ্ঠতম।

(আগামী পর্বে ‘নোবেলজয়ী পল মিলগ্রম)


ড. এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন