বুধবার | অক্টোবর ২১, ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পর্যালোচনা

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণে দুর্ভাগ্য কতটুকু দায়ী?

ড. শহীদুল জাহীদ

অর্থনীতিবিদ বার্গার অ্যান্ড ডিইয়াং ১৯৯৭ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের কারণগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো কিছু উন্নত অনুন্নত দেশের ব্যাংকিং উপাত্ত নিয়ে প্রায়োগিক গবেষণা করেন। বার্গার অ্যান্ড ডিইয়াং খেলাপি ঋণের কারণ হিসেবে চার ধরনের নিয়ামকের কথা উল্লেখ করেন। চার ধরনের কারণের মধ্যে তাদের মতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অন্যতম কারণ দুর্ভাগ্য   

প্রায়োগিক গবেষণায় খেলাপি ঋণের কারণগুলোকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা ব্যাংকভিত্তিক কারণগুলো, ব্যাংকিং শিল্পভিত্তিক বা ব্যাংকিং বাজারের গঠনভিত্তিক কারণগুলো এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নিয়ামকগুলো। অতীতের ন্যায় বর্তমান সময়েও খেলাপি বা মন্দ ঋণের কারণ অনুসন্ধানে বিস্তর গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। খেলাপি ঋণ যদিও নানা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হয়, কিন্তু সাধারণভাবে মঞ্জুরীকৃত ঋণের যে অংশ ফেরত আসে না, তাকেই খেলাপি ঋণ বলা যায়। খেলাপি ঋণ যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই এর কারণ অনুসন্ধানে দেশীয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক প্রায়োগিক গবেষণা চলমান। কারণগুলোর মধ্যে যেমন করপোরেট সুশাসন থেকে শুরু করে গ্রাহক সিলেকশন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তথ্য-উপাত্তের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়।

বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ বড় একটি সমস্যা। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ তহবিলের উৎস মূলত দুটি যথা মালিক কর্তৃক সরবরাহকৃত মূলধন এবং আমানতকারীদের রক্ষিত আমানত। উৎস দুটির মধ্যে মূলধনের চেয়ে আমানতের পরিমাণ সাধারণত বেশি হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণযোগ্য তহবিল বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত। বাসেল গাইডলাইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন অনুপাত মেনে চলতে হয় আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ মেনে ব্যাংকগুলো আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি হিসেবে রেখে দেয়। তাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণযোগ্য তহবিল সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষত উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ। ২০১৯ সালে  ভারত পাকিস্তানে খেলাপি ঋণের হার ছিল যথাক্রমে দশমিক ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার দশমিক ৮৯ শতাংশ।

খাতওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের হার জাতীয় গড় মানের যথেষ্ট ওপরে। আবার দেশীয় কিন্তু বেসরকারি মালিকানাধীন এবং বিদেশী মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ জাতীয় গড় মানের নিচে। ২০১৫ থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গড় খেলাপি ঋণ ছিল যথাক্রমে দশমিক ২৩, দশমিক ২৩, দশমিক ৩১, ১০ দশমিক ৩০ এবং দশমিক ৮৯ শতাংশ। লক্ষণীয়, জাতীয় গড় খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৯ সালে এসে কিছুটা কমেছে। এশিয়ার দেশগুলোয় খেলাপি ঋণের গড় মান বর্তমানে দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় দশমিক ৮৮ শতাংশ। উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের বৈশ্বিক গড় মান শতাংশ ধরা হয়।

সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের খেলাপি ঋণেরও অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্ভাগ্যকে দায়ী করা যায়। বার্গার অ্যান্ড ডিইয়াং দুর্ভাগ্য বলতে মূলত সামষ্টিক অর্থনীতির এমন কিছু উপাদানকে বুঝিয়েছেন, যেগুলোর ওপরে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সামষ্টিক অর্থনীতির এসব নিয়ামকের মধ্যে প্রথমতই আসে কোনো দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। অর্থাৎ জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের মন্দ বা খেলাপি ঋণ সম্পর্কিত। অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনীতির উপাদান যেমন মূল্যস্ফীতি, কল মানি রেট এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদহার উল্লেখযোগ্য। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, মূল্যস্ফীতি এবং স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি সুদহারের ওপর কোনো একক বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু উপাদানগুলোর সঙ্গে কোনো দেশ বা অর্থনীতির ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানগুলোর কুঋণ সম্পর্কিত। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে অর্থনীতিবিদ ইসলাম এবং নিশিয়ামা ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বার্গার অ্যান্ড ডিইয়াংয়ের তত্ত্বের সত্যতা পান।

যেমন উল্লিখিত উপাত্তে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কুঋণ হার কিছুটা বেড়ে ২০১৯ সালে এসে কিছুটা কমেছে। ওই সময়কালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ক্রমবর্ধমান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে দশমিক ৫৫ শতাংশ, দশমিক ১১, দশমিক ২৮,   দশমিক ৮৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে কুঋণের ঋণাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। জিডিপি বাড়লে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কুঋণের হার কমে যায়। বিপরীতভাবে বলতে গেলে মোট দেশজ উৎপাদন কম হলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কুঋণ হার বাড়ে। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপরে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। সুতরাং অতীতে দেশের মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের জন্য ব্যাংকগুলো দুর্ভাগ্যকে দায়ী করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় মুদ্রাস্ফীতি যথাক্রমে দশমিক ১৯, দশমিক ৫১, দশমিক ৭০, দশমিক ৫৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে গড় মুদ্রাস্ফীতি দশমিক ৭১ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির ধারা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের কুঋণ ধারার সঙ্গে ধনাত্মক সম্পর্কে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি বিনিয়োগকারীদের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় আর তাতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসা সংকোচনের কারণে বিনিয়োগকারীরা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে পারেন না। তখন ব্যাংক সেসব ঋণকে শ্রেণীকৃত করে। এখানেও বার্গার অ্যান্ড ডিইয়াংয়ের দুর্ভাগ্য তত্ত্ব প্রযোজ্য। কারণ অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি কত হবে, তা বাড়বে না কমবে, তার ওপর ব্যাংকের একক নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির কারণে অতিরিক্ত কুঋণব্যাংকের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী?

সামষ্টিক অর্থনীতির আরেকটি উপাদান, যার ওপর বাণিজ্যিক ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু খেলাপি ঋণে প্রভাব ফেলে তা হলো, দীর্ঘমেয়াদি সুদহার। সরকার তার ইস্যুকৃত বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রে যে সুদ দিয়ে থাকে, তা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কুঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে বর্তমানে সুদহার নিম্নমুখী। সরকারি ঋণপত্রে রিয়াল সুদহার কমে গেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকগুলো তাদের সুদহারও কমিয়ে দিয়েছে। সুদহারের সঙ্গে খেলাপি ঋণের সম্পর্ক বিদ্যমান। সুদহার কমার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে থাকতে পারে। অন্যভাবে বলা যায়, উচ্চ সুদহারের কারণে উচ্চ খেলাপি ঋণহার বিদ্যমান ছিল। সামষ্টিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পলিসি সুদহার বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পলিসি সুদহার কমা-বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলো আক্রান্ত হয়। এও এক নিয়তি বটে।

সামষ্টিক অর্থনীতির উল্লিখিত উপকরণগুলোর বাইরেও যেমন মুদ্রা বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শ্রমবাজারের গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কুঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু এর কোনোটার ওপরই ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকের উচ্চ খেলাপি ঋণের পেছনে দুর্ভাগ্য তত্ত্ব এখনো প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাতে দুর্ভাগ্য তত্ত্ব আরেকটু ভিন্ন মাত্রিক বটে। দুর্ভাগ্য তত্ত্বের অন্যতম উপকল্প হলো, দুর্ভাগ্য সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ জাতীয় গড় মানের ওপরে। সেখানে বেসরকারি বিদেশী মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ জাতীয় গড় মানের যথেষ্ট নিচে। সুতরাং বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণের জন্য মালিকানার ধরন একটি অন্যতম কারণ। তাহলে বলা যায় যে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেসরকারি বা বিদেশী হওয়া তাদের জন্য সৌভাগ্য আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়া একান্ত দুর্ভাগ্য। এমন অবাক উপসংহার দুর্ভাগ্য তত্ত্বের নতুন সংযোজন ছাড়া আর কি!  

 

. শহীদুল জাহীদ: সহযোগী অধ্যাপক

ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন