বুধবার | অক্টোবর ২১, ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

ফিচার

আইডারডাউন: বুনোহাঁসের যে জাদুকরী পালকের ক্রেতা শুধু অতিধনীরা

বণিক বার্তা অনলাইন

বরফঢাকা আইসল্যান্ডের ওয়েস্টফোর্ডস প্রদেশের রাজধানী ইসাফজরুর। এই এলাকার প্রকৃতি থেকেই সংগ্রহ করা হয় বহুমূল্যবান আইডারডাউন। 

আইডারডাউনের বৈশিষ্ট্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এককথায় এটি এক ধরনের হাঁসের ফিনফিনে পালক। এই পালক এতটাই হালকা ও নরম যে একটি ফুটবলের আকারের আইডারডাউন এক হাতের মুঠোয় এঁটে যায়। 

কয়েক শতাব্দী ধরেই বিশ্বব্যাপী অভিজাত মহলে আইডারডাউনের কদর আকাশছোঁয়া। অবশ্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সামুদ্রিক যোদ্ধাদের সদস্য ভাইকিংরাও আইডারডাউন দিয়ে তাদের নরম বিছানা সাজাতো। এটি এতই মূল্যবান যে মধ্যযুগীয় কর সংগ্রহকারীরা মুদ্রার বিকল্প হিসেবে এটির ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। আর আজকাল এই পালকের প্রধান ক্রেতা অতিধনীরা।

কথায় বলে, তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষেরা মরুভূমিতে আইডারডাউনের নিচে ঘুমায়। আর একটা আইডারডাউনের লেপ উপহার দিয়ে রুশ রাজনীতিকের মন জয় করা সম্ভব। 

আইডারডাউনের বৈশিষ্ট্য হলো এটি অত্যন্ত হালকা। যদিও যেই পাখি থেকে এটি সংগ্রহ করা হয় সেটি কিন্তু বিপরীত বৈশিষ্ট্যের। আইডার একটি চর্বিযুক্ত সামুদ্রিক পাখি। এটির চেহারা হাঁসের চেয়ে বরং পেঙ্গুইনের কাছাকাছি। তাদের বেশিরভাগ জীবন কাটে আর্কটিক সার্কেলে।

আইডারডাউন এখন বিলাসপণ্য হলেও এর সংগ্রাহক ও প্রাথমিক বিপণনের সঙ্গে জড়িতরা কিন্তু বঞ্চিত হোন। আইডাইডাউন সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত এক লুথেরিয়ান যাজক আইডারডাউনকে কোকেনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ সবচেয়ে উষ্ণ প্রাকৃতিক এই তন্তু বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত দামী হলেও সংগ্রহকারীরা সামান্য অর্থ পেয়ে থাকেন। 

তিনি বলেন, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা আসলে কলম্বিয়ার কোকেন চাষিদের মতো। পণ্যটি টোকিওর রাস্তায় ভালো দাম পেলেও আমরা সেটির সামান্য অংশ পাই। 

আইডারের নরম কমল ফিনফিনে পালকগুলো মানুষের বিছানা পর্যন্ত কীভাবে গিয়ে পৌঁছায় সেই গল্পটি কিন্তু স্বস্তিদায়ক নয়। এই পালকের বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর মতে, বেশিরভাগ পালক মাংস শিল্পের উপজাত। অর্থাৎ মাংস সংগ্রহের জন্য পাখিগুলোকে মেরে পালক সংগ্রহ করা হয়। খুব কম হলেও অনেক খামারে কিন্তু জ্যন্ত পাখি থেকে পালক সংগ্রহ করে আবার ছেড়ে দেয়া হয়। এই চর্চাটি লাইভ-প্লাকিং নামে পরিচিত। 

ওই যাজক ব্যাখ্যা করেন যে তিনি কীভাবে আইডারডাউন সংগ্রহ করেন। তিনি একটি ছোট খামার পরিচালনা করেন। প্রতি জুনে প্রায় ৫০০ হাঁস (আইডার) সমুদ্র থেকে এসে তার খামারে আশ্রয় নেয়। প্রাকৃতিকভাবে বড় উন্মুক্ত অঞ্চলে তারা বাসা বাঁধে না। আশ্রয় ও সুরক্ষা পেতে আইডার হাঁসগুলো মানববসতির কাছাকাছি জড়ো হয়। হাঁসগুলো একটা নিরাপদ নিরুপদ্রব জায়গা দেখে বাসা বাঁধে; টায়ার, দরজা এমনকি ঘরের মধ্যেও তারা বাসা বাঁধতে পারে। 

তিনি বলেন, আমি সর্বদা সঙ্গে অনেকগুলো পতাকা নিয়ে ঘুরি। খুঁজে পাওয়া প্রতিটি বাসার পাশে একটি করে পতাকা গেঁথে দেই। ফলে পরে বাসাগুলো সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। এই হাঁসগুলো অবিশ্বাস্যরকম ছদ্মবেশী। আপনি খেয়াল না করলে হাঁটতে হাঁটতে যেকোনো বাসা মাড়িয়ে যেতে পারেন।

মধ্যযুগে প্রচলিত একটি উপকথায় পাওয়া যায়, পেলিকান হাঁসরা নিজের পেট ছিদ্র করে বাচ্চাদের রক্ত খাওয়ানোর কথা ভাবতো। পৌরাণিক গল্পটি নৃশংস মনে হলেও এটি কিন্তু অনেক বড় আত্মত্যাগের পরিচয়ও। আইডার হাঁসরাও বাচ্চাদের জন্য নিজেদের শরীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অবশ্য তারা রক্ত ঢেলে দেয় না, তারা দেয় নিজের বুকের পালক। বুকের বিশেষ ধরনের নরম পালক দিয়ে তারা বাসা বানায়। প্রায় ২৮ দিন ধরে সেই বাসায় ডিমে তা দেয়। এসময় তাদের শরীরের এক তৃতীয়াংশ ওজন কমে যায়। এমনকি কিছু আইডার অনাহারে মারা যায়। ইনকিউবেশন শেষে ডিম ফোটে এবং মায়েরা তার সন্তানদের নিয়ে সমুদ্রে ফিরে যায়। আইডারডাউন সংগ্রাহক সেই যাজক বলেন, এরপরই তিনি বাসাগুলো গ্রহ করেন।

যাজক বর্ণিত দৃশ্যটি বহু শতাব্দী ধরে আইসল্যান্ডের একটি সাধারণ দৃশ্য। সম্ভবত নবম শতাব্দীতে নর্স স্যাটলারদের আগমনের পর থেকে এভাবে আইডারডাউন সংগ্রহ করা হচ্ছে। 

পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ ও পাখি বিশেষজ্ঞরা সবাই আইসল্যান্ডের এই আইডারডাউন সংগ্রহের সংস্কৃতি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। 

আইডার ও আইডারডাউন সংগ্রহকারীদের মধ্যে একটা স্থায়ী সরলতার সম্পর্ক রয়েছে। যদি কোনো সংগ্রহকারী হাঁসের অতিরিক্ত যত্ন নেন, তাহলে আরো বেশি হাঁস বাসা বাঁধতে আসে এবং তার জন্য আরো বেশি আইডারডাউন রেখে যায়। 

মোটামুটি ৪০০ জন আইসল্যান্ডীয় যাজক পালকগুলো সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো প্রক্রিয়া করা হয়। বছরে প্রায় ৩ হাজার কেজি আইডারডাউন বিক্রি করেন তারা। আইডারডাউন সংগ্রহের প্রাচীন ঐতিহ্যই কিন্তু পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এবং আইডার হাঁসের বেঁচে থাকতে ভূমিকা রাখছে। আর বিশ্বজুড়ে হাতেগোনা কিছু অতিধনী ক্রেতা তাদের এই বিলাসপণ্যটি এখনো পাচ্ছেন।

আইডারডাউন সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের প্রক্রিয়াটি খুব শ্রমসাধ্য একটি কাজ। আর অপ্রতুলতা ও গুণাগুণ আইডারডাউনকে একটি বিরল বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত করেছে। সংগ্রহ শেষে আইডারডাউন অবশ্যই শুকনো ও গুণমানে উন্নত হতে হয়। আর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয় একেবারে হাতে। 

আইডারডাউনের গুচ্ছগুলোর মধ্যে হাঁসের পালক বা অন্য কোনো শক্ত উপাদান থাকে না। তাই এগুলো অত্যন্ত নরম হয়। শরীরে ছোঁয়ালে এক অনন্য অনুভূতি সৃষ্টি করে। সাধারণত আইডারডাউনে তৈরি পণ্য বা লেপগুলোর আয়ু হয় ৪০ বছর পর্যন্ত। তবে অত্যন্ত নরম এই আইডারডাউনের দীর্ঘায়ু পেতে সঠিক রক্ষাণাবেক্ষণের দরকার হয়।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন