মঙ্গলবার | অক্টোবর ২০, ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

ফিচার

মানুষের মঙ্গলযাত্রাকে কি অনিশ্চিত করে দিল মহামারী

বণিক বার্তা অনলাইন

নাসার রোবটযান রোভার মঙ্গলগ্রহের পথে রয়েছে। এটি অন্যান্য সরঞ্জামের সঙ্গে স্পেসস্যুট উপাদানের বেশ কয়েকটি টুকরো নিয়ে যাচ্ছে। স্পেসস্যুটের ডিজাইনাররা দেখতে চান গ্রহটির ধূলাবালি, বিকিরণপূর্ণ পরিবেশে স্পেসস্যুটের এই টুকরোগুলো কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। স্যুটটির বাইরের শক্ত কাপড়, কর্তন-প্রতিরোধী গ্লাভস, শ্যাটারপ্রুফ প্লাস্টিকের বাবল হেলমেটের মতো উপাদানগুলো একদিন মঙ্গলগ্রহের সূর্যাস্তের মৃদু আলোকে প্রতিফলিত করবে। 

ভবিষ্যতের নভোচারীরা গ্রহটির পৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই স্পেসস্যুট ডিজাইনারদের নিশ্চিত হওয়া দরকার যে তারা যথাযথ পোশাক পরেছে। রোভারটি আগামী ফেব্রুয়ারিতে মঙ্গলপৃষ্ঠে অবতরণ করবে। 

৫০ বছর আগে মানুষ চাঁদের বুকে পা রাখতে সক্ষম হয়েছিল এবং কয়েক বছর ধরে লাল গ্রহটিতে পা রাখার ধাপটি সবচেয়ে পরিষ্কার মনে হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের এই বিশেষ বছরে এসে ভবিষ্যতটি আগের চেয়ে আরো দূরে সরে গেল বলে মনে হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারী আমাদের স্বপ্নের অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষা মহাকাশ অনুসন্ধানসহ সব ধরনের মানব প্রচেষ্টাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। 

যদিও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধিকালীন এপ্রিলে নাসার প্রশাসক ঘোষণা করেছিলেন, ‘কোনো ভাইরাসই মানুষের অন্বেষণের আকাঙ্ক্ষা থেকে শক্তিশালী হয় না।’ 

এ ধরনের সময়েও মানুষকে অন্য গ্রহে প্রেরণকারী সংস্থার নেতাকে বিশ্বাস করতে হয় যে এখনো সম্ভব। আসলেই কভিড-১৯ শেষ পর্যন্ত মানবজাতির মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানো থামিয়ে রাখতে পারবে না। মহাকাশ ভ্রমণের প্রয়োজনীয় সময়সীমাতে এক বছর বা আরো বেশি ধীরগতির ক্রিয়াকলাপকে একটি ছোট ধাক্কা হিসেবে মনে করা হয়। তারপরও চলমান মহামারীটি মহাবিশ্ব ভ্রমণে আমেরিকার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করতে পারে। 

কভিড-১৯ মহামারীর কারণে অনেক সংস্থার মতো নাসাও বেশিরভাগ কর্মীকে বাড়িতে পাঠিয়েছে এবং সংস্থাটি কিছু প্রকল্প স্থগিত করেছে। মহামারীর মধ্যে মার্স রোভার পার্সিভারেন্সের কাজ শেষ পর্যায়ে ছিল এবং নাসা এটিকে ‘মিশন এসেনশিয়াল’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। এরপর গত ৩০ জুলাই পারসিভারেন্স রোভার ও ইনজেনিটি হেলিকপ্টার ড্রোন মঙ্গলগ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। 

করোনা মহামারী দেশকে পঙ্গু করে দেয়ার আগে ২০৩০ এর দশকে আমেরিকানদের মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি স্বাধীন গবেষক দল নাসার মঙ্গল স্বপ্ন সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কংগ্রেসের অনুরোধে নাসা এই গোষ্ঠীকে মূল্যায়ন করতে বলেছিল যে প্রাথমিক অ্যাপোলো মিশনগুলোর মতো ২০৩৩ সালে নভোচারীরা লাল গ্রহে যেতে পারে কিনা কিংবা অবতরণ না করলেও গ্রহটির চারপাশে ঘুরে ফিরে আসতে পারে কিনা। 

গবেষকরা আবিষ্কার করেন, কোনো ধরনের বিলম্ব বা বাজেট ঘাটতি না থাকলে নভোচারীরা ২০৩৭ সালে মঙ্গল গ্রহের উদ্যেশে যাত্রা করতে সক্ষম হতে পারেন। তবে এটা ২০৩৯ সালে আরো বাস্তবসম্মত হবে, আর এতে মানুষ ’৪০ এর দশকে গ্রহটিতে অবতরণ করবে। তবে গবেষকরা এই উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনাগুলোর ওপর কোনো মহামারীর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেননি। 

যদিও কেবল নাসাই মানবজাতিকে মহাকাশে যাওয়ার টিকিট দেয় না। বেসরকারি সংস্থাগুলোও তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজস্ব রকেট তৈরি করছে। মহামারীর কারণে নাসা তাদের কিছু প্রকল্প থামিয়ে দিলেও মার্কিন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার সিইও ইলন মাস্কের স্পেসএক্স মঙ্গল মহাকাশযানের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। স্পেসএক্স ও বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন নাসার অনেক কাজ করে দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ইলন মাস্ক প্রায়শই বলেন, নাসার আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা না পেলে স্পেসএক্স আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতো না। 

মানুষকে পাঠানোর মতো সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে বেসরকারি এই সংস্থাটি। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে স্পেসএক্স ২০২০ এর দশকে লালগ্রহে মানুষকে পৌঁছে দিতে পারবে। যদিও বিলিয়নেয়ার এই উদ্যোক্তা সময়সূচি সম্পর্কে অত্যধিক আশাবাদী। তবে শেষ পর্যন্ত স্পেসএক্স নাসা ছাড়া এটি করতে পারবে বলে মনে হয় না। 

সাধারণত স্পেসফ্লাইটের ব্যবসায় ধীরে চলো নীতি অনিবার্য, এমনকি সর্বোত্তম পরিস্থিতিতেও। ২০৩০-এর দশকে মঙ্গলগ্রহে যেতে চাইলে যাত্রা শুরুর কাজটি অবশ্যই এই দশকে করতে হবে। নাসার এই ধরনের উচ্চাভিলাসী মিশন বর্তমানে মার্কিন নাগরিক ও আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়া আরো শক্ত হতে পারে। কারণ মহামারী সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি মানসিকভাবেও অনেক বড় প্রভাব ফেলেছে। 

পারসিভারেন্স আগামী ফেব্রুয়ারিতে মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করবে এবং জীবনের উপস্থিতির নমুনা পেতে জন্য মঙ্গলের ভূমি খনন শুরু করবে। পারসিভারেন্স বহনকরা স্পেসস্যুটের নমুনাগুলো একদিক থেকে আমেরিকানদের আশাবাদের প্রতীক। তারা আশা করেন যে, একদিন এই কাপড়গুলো নভোচারীদের শরীরে জড়িয়ে থাকবে এবং এগুলো এমন পরিবেশে তাদের রক্ষা করবে, যা তাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

আটলান্টিক ম্যাগাজিন অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন