মঙ্গলবার | মার্চ ০৯, ২০২১ | ২৫ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম পাতা

নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনে শীর্ষে আবুল খায়ের গ্রুপ

মেহেদী হাসান রাহাত

নির্মাণ খাতের অব্যাহত প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় গত দুই দশকে দেশে নির্মাণসামগ্রীর বাজারও সম্প্রসারিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প আবাসন খাতে বিপুল পরিমাণে চাহিদা থাকায় রড সিমেন্টের মতো অত্যাবশ্যকীয় নির্মাণ উপকরণে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও বেড়েছে। লংকাবাংলা ইবিএলের গবেষণা প্রতিবেদন এবং ইস্পাত সিমেন্ট খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশে রড সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণ খাতের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রড সিমেন্টের উৎপাদনও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, গত আট বছরে সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে ভর করে দেশের নির্মাণ খাতের আকার দ্বিগুণ হয়েছে। বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির কারণে দেশের প্রতিষ্ঠিত বড় কয়েকটি শিল্প গ্রুপ খাতের ব্যবসায়ে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করেছে। এসব শিল্প গ্রুপ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আবুল খায়ের, বসুন্ধরা, বিএসআরএম, আরএসআরএম, কেএসআরএম, ক্রাউন, জিপিএইচ ইত্যাদি অন্যতম। এছাড়া দেশের সিমেন্ট খাতে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিরও উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে। পাশাপাশি চীনা জাপানি উদ্যোক্তারাও দেশের ইস্পাত শিল্পে বড় আকারের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

দেশের ইস্পাত সিমেন্ট শিল্পে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবার শীর্ষে রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির আবুল খায়ের স্টিল বা একেএস এখন ইস্পাতের বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৪ লাখ টন। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ মার্কেট শেয়ার কোটি টন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে সিমেন্টের বাজারেও শীর্ষস্থানে রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপেরই ব্র্যান্ড শাহ সিমেন্ট।

১৯৯৩ সালে ঢেউটিনের মাধ্যমে প্রথমে ইস্পাত শিল্পের ব্যবসায় আসে আবুল খায়ের গ্রুপ। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে তারা রড উৎপাদন শুরু করে। শিল্প গ্রুপটি সিমেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২০০২ সাল থেকে। গ্রুপের পক্ষে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, নির্মাণ শিল্প খাতে গতি থাকলে এর সরাসরি সুফল আসে কর্মসংস্থানের ওপর। স্থানীয় অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য থাকে। করোনাকাল করোনাপরবর্তী সময়েও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় সহায়ক হবে নির্মাণ খাত। সরকারের একটি বড় রাজস্বও এখান থেকে আসে। আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ইস্পাত সিমেন্টের বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে।

ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্যানুসারে দেশে বর্তমানে ইস্পাত শিল্পের বাজারের আকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। অ্যাসোসিয়েশনের  তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০টি। বর্তমানে দেশের ইস্পাত খাতের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে বর্তমানে ব্যবহূত হচ্ছে ৫৫ লাখ টন। যদিও করোনার কারণে তা ৩০-৩৫ লাখ টনে নেমে এসেছে। খাতে উদ্যোক্তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা।

১৯৫২ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্টিল রি-রোলিং মিল স্থাপনের মাধ্যমে ইস্পাত শিল্পের ব্যবসায় যুক্ত হয় বিএসআরএম গ্রুপ। বর্তমানে বিএসআরএম গ্রুপের দুটি কোম্পানি দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের (বিএসআরএম) বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা সাত লাখ টন। বিএসআরএমের আরেকটি ইউনিটে বিলেট উৎপাদন করা হয়, যেটির উৎপাদন সক্ষমতা বছরে দেড় লাখ টন। গ্রুপের আরেকটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা সাত লাখ টন। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও কার্যক্রম রয়েছে বিএসআরএমের। হংকংয়ে গ্রুপটির একটি সাবসিডিয়ারি রয়েছে। কেনিয়ায়ও বিএসআরএম বিনিয়োগ করেছে। তাছাড়া প্রতিবেশী ভারতের কলকাতায়ও কয়েক বছর ধরে ব্যবসা করছে বিএসআরএম।

সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বিএসআরএমের বিক্রি হয়েছে হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০১৯-২০ হিসাব বছরে বিএসআরএম স্টিলসের বিক্রি হয়েছে হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। করোনাকালে এপ্রিল, মে জুন মাসে কোম্পানিটির বিক্রি কমে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে জুলাই থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। সময় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি কিছুটা বেড়ে ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালে গত পাঁচ মাসে কোম্পানি দুটির কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার বিক্রি কমেছে।

বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসআরএম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ হিসাব) এবং কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন কর বণিক বার্তাকে বলেন, অগ্রিম আয়করসহ বিভিন্ন ধরনের করের চাপে করোনার আগে থেকেই দেশের ইস্পাত শিল্প ব্যবসায়িকভাবে চাপের মধ্যে ছিল। করোনার কারণে পরিস্থিতি আরো শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। ছোটদের অবস্থা তো আরো খারাপ। এভাবে চলতে থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। করছাড় সুবিধা দেয়া হলে ইস্পাত খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে। এতে করে সরকারও বেশি হারে রাজস্ব পাবে।

দেশের ইস্পাত শিল্পে ১৯৮৪ সালে যাত্রা করে কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (কেএসআরএম) বর্তমানে বছরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা আট লাখ টন।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ে যুক্ত হয় ২০০৮ সালে। বর্তমানে কোম্পানিটির বার্ষিক লাখ ১০ হাজার টন এমএস বিলেট দেড় লাখ টন এমএস রড উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। সম্প্রতি জিপিএইচের নতুন প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। নতুন প্লান্টের সক্ষমতা যোগ করলে জিপিএইচ ইস্পাতের বার্ষিক এসএম বিলেট উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ ৫০ হাজার টনে। লাখ ৯০ হাজার টনে উন্নীত হবে এমএস রড উৎপাদন সক্ষমতা।

১৯৭৮ সাল থেকে দেশের ইস্পাত শিল্পের ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে আনোয়ার গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লাখ ৬০ হাজার টন সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

চট্রগ্রামের মিরেরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা ইস্পাত জায়ান্ট কুনমিং আয়রন অ্যান্ড স্টীল হোল্ডিং কোম্পানি বার্ষিক ২০ লাখ টন সক্ষমতার কারখানা স্থাপনে ২৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এটি দেশের উৎপাদন খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এছাড়াও জাপানের সবচেয়ে বড় ইস্পাত উৎপাদক নিপ্পন স্টীল সুমিতমো মেটাল স্থানীয় কোম্পানি ম্যাকডোনাল্ড স্টীল বিল্ডিং প্রোডাক্টসের সঙ্গে যৌথউদ্যোগে কারখানা স্থাপনে কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। কারখানাগুলো উৎপাদনে চলে আসলে দেশের ইস্পাত খাতে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে উঠবে।

এদিকে ১৪ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে বর্তমানে সিমেন্টের বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড আবুল খায়েরের শাহ সিমেন্ট। খাতটির উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশে সিমেন্টের বাজার ২৮ হাজার কোটি টাকা। খাতে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। এর মধ্যে পাঁচটি বহুজাতিক। সিমেন্ট খাতের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে কোটি টন, যদিও ব্যবহূত হচ্ছে সাড়ে কোটি টন। করোনার কারণে সিমেন্টের বিক্রি হ্রাস পেয়েছে ৫০ শতাংশ। খাতে উদ্যোক্তাদের মোট বিনিয়োগ ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে প্রায় ১০ শতাংশ মার্কেট শেয়ারের ভিত্তিতে সিমেন্টের বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড। বর্তমানে কোম্পানিটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪২ লাখ টন। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ভারতের মেঘালয়ে স্থাপনকৃত লাইমস্টোন প্ল্যান্টের বার্ষিক সক্ষমতা ৫০ লাখ টন।

২০ বছর ধরে দেশের সিমেন্ট খাতে ব্যবসা করছে বসুন্ধরা সিমেন্ট। কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার দশমিক ১০ শতাংশ। বছরে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টন সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তাছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের তালিকাভুক্ত সিমেন্ট কোম্পানি মেঘনা সিমেন্টের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা লাখ টন। সিমেন্টের বাজারে কোম্পানিটির মার্কেট শেয়ার শতাংশ।

দশমিক ১০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে সিমেন্টের বাজারে চতুর্থ স্থানে রয়েছে বহুজাতিক সেভেন রিংস সিমেন্ট। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সিমেন্টের বাজারে প্রবেশ করে। সেভেন রিংসের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ লাখ টন।

আরেক বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গের দখলে রয়েছে সিমেন্টের বাজারের প্রায় শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা বার্ষিক ২৮ লাখ ৫০ হাজার টন।

ইস্পাত সিমেন্ট শিল্পের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিসিএমএর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট বিএসএমএর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মেট্রোসেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে ইস্পাত সিমেন্ট শিল্পের মোট সক্ষমতার অর্ধেকই অব্যবহূত থাকছে। করোনার কারণে চাহিদা আরো কমেছে। দেশে নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে রড সিমেন্টে চাহিদা আরো বাড়বে। তবে বিদ্যমান যে সক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে আগামী ২০-২৫ বছর চাহিদা মেটানো সম্ভব। একসময় রড সিমেন্ট আমদানি করা লাগলেও বর্তমানে আমরা খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে সমস্যা হচ্ছে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে ইস্পাত সিমেন্ট খাতে শতাংশ হারে অগ্রিম আয়করকে অসমন্বয়যোগ্য করা হয়েছে। এরপর থেকেই খাতদুটির উদ্যোক্তারা লোকসান গুনছেন। যদিও গত বছর  এটি কমিয়ে শতাংশ করা হয়েছে কিন্তু এটিও অসমন্বয়যোগ্য। অথচ এর আগে আমরা অগ্রিম আয়কর দিলেও সেটি ছিল সমন্বয়যোগ্য। তাছাড়া সিমেন্টের কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় এবং কয়েক বছর ধরেই কাঁচামালের মূল্য ঊর্ধ্বমূখী। এটিও খাতের উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এদিকে করোনার কারণে বছরের এপ্রিল থেকে ইস্পাত শিল্পের অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম অনেক বেড়ে গিয়েছে এবং সংকটও তৈরি হয়েছে। তাছাড়া আংশিকভাবে কেউ কেউ পেলেও এখনো পর্যন্ত সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা ইস্পাত সিমেন্ট শিল্পের সব উদ্যোক্তারা পাননি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন