রবিবার | অক্টোবর ২৫, ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

পারিবারিক দ্বন্দ্বে অস্তিত্বের সংকটে প্যারাডাইস গ্রুপ

হাছান আদনান

বৈদ্যুতিক তার উৎপাদন বিপণনে দেশের বাজারে আধিপত্য ছিল প্যারাডাইস কেবলসের। দেশের বাজারের অন্তত ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পাশাপাশি বিদেশেও পণ্য রফতানি করছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু পারিবারিক বিরোধে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে কোম্পানিটির উৎপাদন বিপণন। প্যারাডাইস গ্রুপের অন্য সাতটি কোম্পানির অবস্থাও একই।

এরই মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে প্যারাডাইস কেবলসকে দেয়া দেশের অন্তত আটটি ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার ঋণও। ব্যাংকগুলোর দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন প্যারাডাইস কেবলসসহ শিল্প গ্রুপটির সব পরিচালক। এর মধ্যে চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন তার স্ত্রী মাহবুবা মোশাররফ কানাডা পালিয়েছেন। প্রায় তিন দশকে বেড়ে ওঠা শিল্প গ্রুপটির বিপর্যয়ের জন্য এক ভাই দুষছেন আরেক ভাইকে। সব মিলিয়ে বিলীনের পথে রয়েছে প্যারাডাইস গ্রুপের সবকটি প্রতিষ্ঠান।

গ্রুপটিকে ঋণ দেয়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ আর তাদের স্ত্রী-পুত্রদের মারামারিতে সম্ভাবনাময় একটি শিল্প গ্রুপ শেষ হয়ে গেছে। তবে গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন কানাডার নাগরিক হওয়ায় সে দেশে বিপুল অর্থ পাচারও করেছেন। অন্য ভাইরাও কানাডাসহ বিশ্বের একাধিক দেশে অর্থ পাচার করেছেন। এখন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য এক ভাই অন্য ভাইকে দুষছেন। তবে এটি পরিকল্পিত হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

প্যারাডাইস গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এবি ব্যাংকের ঋণ রয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বহু আগেই ঋণ খেলাপি হয়েছে। একাধিকবার পুনঃতফসিল করার পরও খেলাপি হওয়ায় টাকা আদায়ে মামলা করেছে ব্যাংকটি। সে মামলায় প্যারাডাইস গ্রুপের চেয়ারম্যান এমডিসহ অন্য তিন পরিচালকের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। মঙ্গলবার জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন প্যারাডাইস গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান, পরিচালক মনিয়ার হোসেন মোবারক হোসেন। প্যারাডাইস গ্রুপের চার পরিচালক সম্পর্কে আপন ভাই। মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী মাহবুবা মোশাররফের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এবি ব্যাংকের মতোই প্যারাডাইস গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে মামলা করেছে ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড। এর মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংক মামলা করেছে ২০১৯ সালে। আর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২০১৮ সালে মামলা করেছে বলে জানা গেছে।

প্যারাডাইস গ্রুপকে ঋণ দিয়ে ফেঁসে যাওয়া অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক লিমিটেড। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনিক্স লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের কাছ থেকেও বড় অংকের ঋণ নিয়েছে গ্রুপটি। প্যারাডাইস গ্রুপের কোম্পানিগুলো হলো প্যারাডাইস কেবলস লিমিটেড, এসবিএস কেবলস লিমিটেড, সালেহা ওয়্যারস লিমিটেড, প্যারাডাইস টেলিকম লিমিটেড, প্যারাডাইস মেটালার্জিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড, প্যারাডাইস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড, প্যারাডাইস স্পিনিং মিলস লিমিটেড এবং প্যারাডাইস ফ্যাশন লিমিটেড।

চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এবি ব্যাংকে প্যারাডাইস স্পিনিং মিলের নামে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। একই সময়ে ৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ ছিল প্যারাডাইস কেবলসের কাছে। দুটি ঋণ আদায়ে গত ২৫ জুন ২৩ জুলাই দুটি নিলামের আয়োজন করে এবি ব্যাংক। একই সঙ্গে টাকা আদায়ে ২১ জুন অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ব্যাংকটি। সেই মামলায় প্যারাডাইস গ্রুপের চেয়ারম্যান ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব পরিচালকের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পাওয়ার পর মঙ্গলবার প্যারাডাইস গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেনকে ধরতে রাজধানীর নর্থ গুলশানের নম্বর রোডের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। গুলশান থানার উপপরিদর্শক ফেরদৌস ফারুকের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু আসামিদের খুঁজে না পেয়ে শূন্য হাতেই ফিরেছে পুলিশ।

বিষয়ে গুলশান থানার উপপরিদর্শক ফেরদৌস বণিক বার্তাকে বলেন, এবি ব্যাংকের মামলায় প্যারাডাইস গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন, তার তিন ভাই সবার স্ত্রীদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে মোশাররফ হোসেন তার স্ত্রী মাহবুবা মোশাররফ ছাড়া অন্যরা জামিনে আছেন। আমরা মোশাররফ হোসেনের বাসায় অভিযান চালিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে আসামিদের পাওয়া যায়নি। ওই বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীসহ অন্যরা বলেছেন, প্রায় দুই মাস আগে স্ত্রীসহ মোশাররফ হোসেন কানাডা চলে গেছেন। আসামিরা দেশে ফিরলেই গ্রেফতার করা হবে।

প্যারাডাইস গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এসবিএস কেবলস লিমিটেডের কাছে ঢাকা ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৭০ কোটি টাকা। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় অনেক আগেই ঋণটি খেলাপি হয়েছে। কয়েক দফায় সুযোগ দেয়া হলেও এসবিএস কেবলস অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানান ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গ্রুপটি ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করছে না। তবে ব্যাংকের কাছে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত গ্রুপটির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্যারাডাইস কেবলস এসবিএস কেবলস লিমিটেডের কাছে ৬৬ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে এনসিসি ব্যাংকের। বিভিন্ন সময়ে খেলাপি হওয়ায় ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও প্যারাডাইস গ্রুপ টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে বলে এনসিসি ব্যাংকের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

প্যারাডাইস গ্রুপের কাছে পাওনা অর্থ আদায়ের বিষয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রুপটিকে অর্থ পরিশোধে অনেকবার তাগাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ কোম্পানি পরিচালনায় তাদের স্ত্রীদের হস্তক্ষেপের কারণেই প্যারাডাইস কেবলসসহ গ্রুপটির সব প্রতিষ্ঠান বিপর্যয়ে পড়েছে। আমি একাধিকবার মোশাররফ হোসেন, মোবারক হোসেনসহ তাদের ভাইদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলাম। তারা বৈঠকের মধ্যেই একে অন্যকে দায়ী করে তর্কে জড়িয়ে যান।

গ্রুপটিকে ঋণ দেয়া একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোশাররফ হোসেন তার স্ত্রী কানাডার নাগরিক। কানাডায় তাদের বিলাসবহুল বাড়ি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের পাঁচ-সাতটি গাড়ি আছে। তাদের জীবনযাপনের স্টাইল এতটাই বিলাসবহুল যে একবার মোশাররফ হোসেনের কানাডার বাড়িতে ডাকাতি হয়। দেশটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের মধ্যে একমাত্র তার বাড়িতেই ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। মূলত মোশাররফ হোসেনের লাইফস্টাইল দেখে দেশটির অপরাধীরা পর্যন্ত ডাকাতি করতে প্রলুব্ধ হয়েছে। অথচ দেশে তারা ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করছে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন