মঙ্গলবার | অক্টোবর ২০, ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

শেষ পাতা

করোনায় ৮০ শতাংশ ব্যবসা কমেছে এপেক্স ট্যানারির

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে থেকেই ব্যবসায় মন্দা ছিল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত চামড়া খাতের কোম্পানি এপেক্স ট্যানারি লিমিটেডের। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ ব্যবসা কমেছিল কোম্পানিটির। আর এপ্রিল থেকে জুন সময়ে করোনার প্রভাবে আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির ব্যবসা কমেছে ৮০ শতাংশ। এর ফলে ২০১৯-২০ হিসাব বছরে প্রায় কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। লোকসান হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশও কম দিয়েছে এপেক্স ট্যানারি।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পর তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেশে দেশে সংক্রমণ রোধে লকডাউনের মতো নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। এতে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ছিল। মূলত বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত করোনার প্রভাবে পুরো বিশ্বই এক ধরনের অবরুদ্ধ ছিল। এর প্রভাবেই ধস নেমেছে এপেক্স ট্যানারির চামড়া রফতানিতে।

এপেক্স ট্যানারির গতকাল প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল অনুসারে, ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কর-পরবর্তী লোকসান হয়েছে কোটি ৮১ লাখ টাকা। যদিও আগের বছর কোটি ১৫ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছিল কোম্পানিটির। স্টকে থাকা পণ্য বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি করোনার কারণে নগদ অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে ওই হিসাব বছরে এপেক্স ট্যানারির শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহও ছিল ঋণাত্মক। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে ফেয়ার ভ্যালুয়েশন সারপ্লাস বাদে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে টাকা ১৯ পয়সা, যেখানে এর আগের বছর তাদের শেয়ারপ্রতি আয় ছিল টাকা ৪১ পয়সা।

চামড়ার রফতানি চাহিদা পড়ে যাওয়ার কারণে নিট মুনাফা ইপিএস কমেছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ২০১৯-২০ হিসাব বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানির বিক্রি কমেছে ৮০ শতাংশ। বিক্রি কমার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে ব্যয় কমিয়ে সেটি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

এপেক্স ট্যানারির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছিল ২০৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর ওই হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে বিক্রি হয়েছিল ১৪২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সে হিসেবে ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে কোম্পানিটির বিক্রি দাঁড়ায় ৬১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যানুসারে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরে চতুর্থ প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়েয় তুলনায় ৮০ শতাংশ বিক্রি কমেছে। ফলে হিসেবে ২০১৯-২০ হিসাব বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে কোম্পানিটির বিক্রি দাঁড়ায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকায়। আর ওই হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছিল ১১৪ কোটি ১২ লাখ টাকা। ফলে সব মিলিয়ে ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিক্রি দাঁড়িয়েছে ১২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সুপারিশ করেছে এপেক্স ট্যানারির পর্ষদ। আগের হিসাব বছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৬৩ টাকা ৮৯ পয়সায়, যা আগের বছর ছিল ৬৯ টাকা ২১ পয়সা। ঘোষিত লভ্যাংশ অন্যান্য এজেন্ডা অনুমোদনের জন্য চলতি বছরের ২৫ নভেম্বর ভার্চুয়াল মাধ্যমে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করেছে কোম্পানিটি। এজন্য রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ অক্টোবর।

এদিকে এপেক্স ট্যানারির পর্ষদ কোম্পানির উৎপাদিত ফিনিশড লেদার বিক্রির জন্য এফবি ফুটওয়্যার, ফুটবেড ফুটওয়্যার ন্যুভো শুজ লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিগুলো দেশের বাইরে ফুটওয়্যার রফতানি করে থাকে এপেক্স ফুটওয়্যারের কয়েকজন পরিচালক তিন কোম্পানিতেও পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।

চুক্তির বিষয়ে কোম্পানিটির কর্মকর্তারা বলছেন এটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন গ্রেড মানের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করে এগুলো বিক্রি করা হবে। তাদের হিসাব অনুসারে এফবি ফুটওয়্যারের কাছে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ফুটবেড ফুটওয়্যারের কাছে কোটি ২৫ লাখ টাকা ন্যুভো ফুটওয়্যারের কাছে বছরে কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করা হবে। অবশ্য বাজার চাহিদার কারণে বিক্রির পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

২০১৯-২০ হিসাব বছরে একই মালিকানায় থাকা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আরেক কোম্পানি এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবসা মুনাফা কমেছে। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে হাজার ১৮১ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। আর ২০১৯-২০ হিসাব বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০১৯-২০ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সুপারিশ করেছে এপেক্স ফুটওয়্যারের পর্ষদ। এর আগের হিসাব বছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ৫৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল।

১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এপেক্স ট্যানারি চীন ছাড়াও ইউরোপ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চামড়া রফতানি  করে। জুতা চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহূত বিভিন্ন গ্রেডের চামড়া তৈরি করে কোম্পানিটি। এর মধ্যে গরু-ছাগলের ফুল ক্রোম, সেমি ক্রোম ভেজিটেবলসহ বিভিন্ন ধরনের ফিনিশড চামড়া অন্যতম। বছরে কোটি ২০ লাখ বর্গফুট চামড়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের। কোম্পানিটির কারখানায় দুটি ইউনিট রয়েছে। ইউনিট- সাভারের হেমায়েতপুরে বিসিকের চামড়া শিল্পনগরীতে অবস্থিত। আর ইউনিট- গাজীপুরের শফিপুরে অবস্থিত। দ্বিতীয় ইউনিটটি ১০ বছরের জন্য এপেক্স ফুটওয়্যারের কাছে ইজারা দেয়া আছে।

এদিকে ১৯৯৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এপেক্স ফুটওয়্যার স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশে জুতা রফতানি করছে। এপেক্স ফুটওয়্যার দুটি ইউনিটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জুতা উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ইউনিট-- উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানি করা হয়। আর ইউনিট-- উৎপাদিত জুতা দেশের বাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া স্থানীয় বাজারে নিজেদের আউটলেটের মাধ্যমে আরো বেশকিছু ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি করে এপেক্স ফুটওয়্যার।

গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এপেক্স ট্যানারির শেয়ার ১০৯ টাকায় এপেক্স ফুটওয়্যারের শেয়ার ২৩২ টাকা ৭০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন