শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭

টেলিকম ও প্রযুক্তি

এবার মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে চীনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা

বণিক বার্তা ডেস্ক

চীনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (এসএমআইসি) এবার অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে এসএমআইসির ওপর রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে অনুমোদন ব্যতীত এসএমআইসির কাছে কোনো ধরনের প্রযুক্তি বিক্রি করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের এক চিঠিতে এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। খবর রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য বিরোধ ক্রমে তীব্র হচ্ছে। এসএমআইসির ওপর রফতানি নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়াবে। বিবৃতিতে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ জানায়, এসএমআইসির কাছে সরবরাহকৃত মার্কিন প্রযুক্তি চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হতে পারে। অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকির বিষয়টি পর্যালোচনা করার পরই এসএমআইসির বিরুদ্ধে রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের পদক্ষেপের ফলে পণ্য উন্নয়নে প্রয়োজনীয় মার্কিন সফটওয়্যার প্রযুক্তি পাবে না এসএমআইসি। বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে প্রতিদ্বন্দ্বী চীন প্রশ্নে কয়েক বছর ধরেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চীনভিত্তিক হুয়াওয়ে, টিকটক, উইচ্যাটের ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে এসএমআইসি জানায়, মার্কিন রফতানি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো তাদের কিছু জানানো হয়নি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান দাবি করে চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। চীনের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা এসএমআইসি। প্রতিষ্ঠানটি মূলত বিভিন্ন শ্রেণীর ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের জন্য সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং সেবা সরবরাহ করে আসছে। সামরিক বাহিনীর জন্য কোনো পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে এসএমআইসি।

বিষয়টি ঘিরে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি মুখপাত্র জানান, সুনির্দিষ্ট অনুমোদন প্রশ্নে মন্তব্য করার এখতিয়ার নেই তাদের। কিন্তু তারা জাতীয় নিরাপত্তা বৈদেশিক নীতির সম্ভাব্য হুমকিতে ক্রমাগত নজর রাখা বিশ্লেষণ করছে। একই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সন্দেহজনক মনে হলে ব্যবস্থা নেবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি এসএমআইসি প্রশ্নে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পেন্টাগনের দাবি, এসএমআইসির শেয়ারধারীদের মধ্যে চীনের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিরা রয়েছেন। এছাড়া চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

জানা যায়, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ঠিকাদার এসওএস ইন্টারন্যাশনাল-এর এক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, চীনের সামরিক বাহিনী সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নিজ গবেষণায় এসএমআইসি প্রক্রিয়া প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার তুলে ধরেছেন। অন্য এসএমআইসি ক্রেতাদের সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছিল প্রতিবেদনটিতে।

বিষয়ে এসএমআইসির এক মুখপাত্র বলেন, তাদের চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো যোগসাজশ নেই। আমরা শুধু বাণিজ্যিক সাধারণ ভোক্তাদের ব্যবহারের জন্য চিপ তৈরি করে আসছি।

গত বছর চীন ৩০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি খরচ করেছে কম্পিউটার চিপ আমদানিতে। বৈশ্বিক চাহিদার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট যন্ত্রাংশ এবং কম্পিউটার সরঞ্জামের বড় একটি অংশ চীনের কারখানায় তৈরি হলেও দেশটিকে প্রয়োজনীয় সিলিকন চিপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আনতে হয়।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীনকে সেমিকন্ডাক্টর অন্যান্য আরো অনেক প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী করে তুলতে চাইছেন। এমন লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি নানা পদক্ষেপও নিয়েছে তার প্রশাসন। এসএমআইসি চীনের শীর্ষ চিপ নির্মাতা হলেও দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক স্যামসাং তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি তুলনায় অনেক বছর পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমানের সর্বাধুনিক চাহিদার অ্যাপের জন্য যে চিপ প্রয়োজন, তা তৈরির সক্ষমতা এখনো এসএমআইসির নেই বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অপেক্ষাকৃত সহজ মানের চিপ তৈরির জন্যও এসএমআইসিকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিনিয়োগ ব্যাংক জেফ্রিসের বিশ্লেষকরা বলেন, এসএমআইসির উপাদানের অর্ধেকই আসে মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে। অংশীদাররা যদি সেবা না দেয় এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন উপকরণ হাল আমলের করে না দেয়, তাহলে ব্যবসা করে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে এসএমআইসির। এরই মধ্যে মার্কিন রফতানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে এসএমআইসির ব্যবসায়। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির মোট বিক্রির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই হয়েছে হুয়াওয়ের কাছে। হুয়াওয়েকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চিপ কেনা প্রশ্নে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ব্যবসা কমেছে এসএমআইসির।

ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের মধ্যে চলমান প্রযুক্তি যুদ্ধের সর্বশেষ দৃশ্যমান পদক্ষেপ হলো এসএমআইসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিষেধাজ্ঞা। কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনভিত্তিক শর্ট ভিডিও তৈরির সোস্যাল মিডিয়া অ্যাপ টিকটক মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিশোধ হিসেবে চীনও এখন বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার কথা ভাবছে। তাদের ভাষায় সেসব বিদেশী প্রতিষ্ঠান চীনের জাতীয় স্বার্থ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে। সম্প্রতি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এমন পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে।

প্রযুক্তি বিশ্বে চীনের ক্রমাগত আধিপত্যের লাগাম টেনে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে জোরেশোরে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর প্রযুক্তি নিয়ে যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা ঘনীভূত হতে শুরু করে চীনা জায়ান্ট হুয়াওয়ের ওপর মার্কিন বাজার মিত্র দেশগুলোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে। এর পরই একের পর এক হুয়াওয়েসহ চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পথে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তুলতে রীতিমতো উঠেপড়ে লাগতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এরই অংশ হিসেবে নিরাপত্তার অভিযোগ তুলে গত মাসেই চীনভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি বাইটডান্স নিয়ন্ত্রিত শর্ট ভিডিও তৈরির সোস্যাল মিডিয়া অ্যাপ টিকটক টেনসেন্ট নিয়ন্ত্রিত টেক্সট ভয়েস মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করতে নির্বাহী আদেশে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন