শনিবার | অক্টোবর ৩১, ২০২০ | ১৬ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

মানুষ আবার গৃহবাসী হবে

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান

গত ছয় মাসে, সাবেক সহকর্মী জাহান তওহিদ দম্পতির আমন্ত্রণে, একবার মাত্র অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে বের হয়েছি। পূর্বাচলে তাদের নদীর ধারে বাড়িটিতে। খোলা আকাশ, স্বস্তির বাতাস, কী যে ভালো লাগল! বাজার সদাই অনলাইনে। এমনকি প্রাত্যহিক হাঁটাও ঘরের ভেতরে। অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় সহধর্মিণী ফুল, করল্লা পুঁইশাকের লতা  লাগিয়েছে। এক কোণে দুটো চেয়ার একটা ছোট্ট টেবিল পেতেছে। সকালে ডাইনিং টেবিলে নাশতার পর নিজেকে শুনিয়ে গৃহকর্মীকে বলি, পার্কে চা দাও। এক চিলতে বারান্দাই এখন হয়ে উঠেছে আমাদের পার্ক! বিকালেও এখানে বসে চা খেতে খেতে পশ্চিমের রোদ থেকে ভিটামিন ডি আহরণের কসরত করি।

মনে পড়ে, আগেও ঘরবাড়িই ছিল আমাদের প্রাণস্পন্দন। মাঝে বেশ খানিকটা জায়গা খালি রেখে দুপাশে সারি সারি স্বজনদের ঘর। খালি জায়গায় বাচ্চাদের খেলাধুলা, ধান শুকানো, মাড়াইসহ যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ঘরের পেছনে সবজি, ফলফলাদির বাগান, গৃহপালিত হাঁস-মুরগির আবাস, গরুর বাথান। সঙ্গেই পুকুর স্নানের, মাছের জন্য। চারপাশে সারি ধরে ডাব, সুপারির গাছ। সামান্য বাইরেই কর্মক্ষেত্র, ধানের, আখ, ডাল মৌসুমি সবজির ক্ষেত পানের বরজ। হাত বাড়ালেই প্রোটিন, শাকসবজি, সফট ড্রিংক, এমনকি প্রসাধন নেশার পান পান খেয়ে ঠোঁট লাল করলে স্বামী সোহাগী হয়!

অসুখ হয়েছে, তার চিকিৎসাও বাড়িতে। জ্বর হলে মাথায় জলপট্টি, পানি ঢালা। তাতেও জ্বর না কমলে স্থানীয় ডিসপেনসারির কম্পাউন্ডার খালু বা চাচার আগমন। মাত্রা দাগ দেয়া শিশিতে তিতা ওষুধ! তাতেও কাজ না হলে গঞ্জে বা টাউনে এলএমএফ ডাক্তার তো আছেই, যার - টাকা ফির মধ্যে ওষুধও অন্তর্ভুক্ত।

বাইরে যাওয়া মানে, সপ্তাহে দুই হাঁটবারে বাড়িতে যা নেই অথচ প্রয়োজন তেল, নুন, চিনি ইত্যাদি আনতে যাওয়া। বেড়ানো মানে ক্ষেতের ধারে ঝিরঝির হাওয়া, পাশে নদী বা খাল থাকলে তার পাড়ে জলের ধারা দেখা অথবা ভাগ্যবান হলে সমুদ্র মন্থনের শব্দ শোনা। লম্বা বেড়ানো মানে, নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি যাওয়া, স্কুল ছুটিতে যখন আম-কাঁঠালের গন্ধে - করত সারা বাড়ি। ছিল বাড়িতে তৈরি পিঠেপুলি, আর কমবয়সী হলে খালা, ফুফু, আপু, মামা, চাচাদের কোলে চড়া তাদের চুমুর উৎপাত!

এরপর উন্নয়ন এল। হাঁস-মুরগির মতো আমরা অ্যাপার্টমেন্ট নামক টংয়ে উঠলাম। কেউ কাউকে চিনি না। লিফটে, সিঁড়িতে হাই-হ্যালো এটুকুই। আর সকাল হলেই তড়িঘড়ি ঘরে নাশতা সেরে অফিসে দে ছুট। শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় মিটিং, সন্ধ্যায় দাওয়াত। ছুটির দিন তো আরো বেশি ব্যস্ত। শহর থেকে বাইরে যাওয়া, গাজীপুর, কক্সবাজার। তার ওপর ভ্যাকেশন তো আছেই। আজকাল দেশে ভ্যাকেশনের খরচ বেশি, তার চেয়ে বিদেশে সস্তা। কলকাতা গেলে ঘোরা বাজার একসঙ্গে হয়ে যায়। এখন কলকাতার দোকানিদের মাথায় হাত। কেউ কি একবারও ভেবেছেন কলকাতায় মার্কেটিংয়ের ফলে কত স্থানীয় দোকানির কপাল ভেঙেছেন এতদিন! তাছাড়া, সিমলা, মানালি, পাতায়া, সেন্টোসা, জেন্টিং আইল্যান্ড, মালদ্বীপ, লন্ডন, হিউস্টন, টরন্টো না গেলে আর ইজ্জত থাকে না। ওখানকার চার ডজন ছবি ছাড়া ফেসবুকে কী স্ট্যাটাসইবা দেবঘুমের সময়টুকু ছাড়া বাসায় থাকা হয় না বললেই চলে। অথচ এখন মাসের পর মাস ঘরে থিতু হয়ে আছি। আদর্শ বলা যাবে না, তবে দিন কেটে যাচ্ছে। 

আর অফিস মানে, আসতে-যেতে চার ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে সাতসকালে বের হয়ে রাত করে বাড়ি ফেরা। অফিসে কেবল মিটিং, মিটিং আর চিটিং, ফাইল চালাচালি। মানুষ হয়রানির নিত্যনতুন ফিকির আবিষ্কার, ঘুষ-দুর্নীতির মহোৎসব! ব্যাংকে চাকরি হলে তো কথাই নেই। অফিস ছুটির পর ক্লায়েন্টের সঙ্গে সলাপরামর্শ, রাতের ডিনার শেষে দিনে ফেরা। ছুটির দিনেও অবকাশ নেই। তাই তো অফিসের সহকর্মীকে শিশুসন্তান কত বড় হয়েছে তা জানাতে খাড়া না দেখিয়ে দুহাত দুপাশে প্রসারিত করে আড়াআড়ি দেখাতে হয়। কেননা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি সন্তানকে শায়িত দেখেছেনঘুম থেকে ওঠেনি, ফিরে এসে দেখেন সে তখনো শায়িতঅর্থাৎ ঘুমিয়ে পড়েছে। 

উন্নয়ন আমরা সবাই চাই, তবে যে উন্নয়ন আমাদের গৃহবিমুখ করে তা চাই না। আমরা চাই অফিস বাসায় অবস্থানের একটা ভারসাম্য আসুক। বেশি সময় আমরা পরিবারের সঙ্গে কাটাই। আমাদের সন্তানরা মা-বাবাদের যাতে বেশি সময় ধরে ঘরে পায়। প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে অফিসের অনেক কাজই বাসায় বসে করা সম্ভব। বাসায় বসে স্কুল-কলেজের পাঠদান গ্রহণও সম্ভব। বাজারে না গিয়েও বাজার সদাই করা সম্ভব। ফলে আমাদের রাস্তায় যানজট কমেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস পানির ব্যবহার কমেছে। করোনাকালের অভিশাপ থেকেও আমরা শিক্ষা নিতে পারি।

কেউ কেউ বলছেন, করোনার ঘাটতি মেটাতে আমাদের সপ্তাহে পাঁচদিনের পরিবর্তে ছয়দিন কাজ করতে হবে। এটাকেই বলে উল্টোযাত্রা। অফিসের সময় বাড়ানোর পরিবর্তে তা কমাতে হবে। হাজিরার পরিবর্তে উৎপাদনশীলতার ওপর জোর দিতে হবে।

আমাদের জীবনে ব্যয়বাহুল্য হ্রাস করতে হবে। আগে জানতাম কেবল দিনমজুররা দিনে আনে দিনে খায়। এখন দেখছি ফিটফাট ভদ্রলোকরাও মাসে আনে মাসে খায়। দুতিন মাস বেতন না পেলে বা কম বেতন পেলে সংকট মোকাবেলার জন্য তাদের কোনো সাশ্রয় নেই। আমাদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় বাড়াতে হবে। কেবল কি ব্যক্তি, আমাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোরও বেহাল অবস্থা। আমাদের সুপার স্টার গার্মেন্টস শিল্পও সংকটের শুরুতেই শ্রমিক বেতনের নাম করে সরকারের কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতে।

আমরা মনে হয় ধরেই নিয়েছি যে কোনো সংকট আসবে না। আপত্কালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কোনো সহায় নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই বাধ্যতামূলক সঞ্চয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে। ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য। আমাদের দেশে তা নেই। সিঙ্গাপুরের ন্যায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক ভবিষ্যিনধি বা উন্নত দেশের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শুরু করতে হবে।

দেশে দেশে স্থপতি নগর-পরিকল্পনাবিদরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। দপ্তর নয়, গৃহই হবে সব পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। অফিস সম্পর্কেও নতুন ভাবনা শুরু হয়েছে। কেবল করোনাকালে নয়, অনেকেই বলছেন, কখনই আগের অফিসে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। বাড়ি থেকেই অফিসের কাজ চলবে। অফিসের কিছু সুবিধা এখন বাড়িতে দেয়া হবে।

আমাদেরও একই পথ ধরে এগোতে হবে। বিদ্যুৎ, ওয়াসা, গ্যাস, রাজউক, ভূমি রেজিস্ট্রিসহ সব সেবাকাজের অন্তত ৯০ শতাংশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে, অনধিক এক সপ্তাহের মধ্যে সারতে হবে। যেসব সংস্থা তা করতে পারবে না, তাদের কাজ বেসরকারি খাতে দিয়ে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় সভা পরিহার করে অধিকাংশ সভা জুম, গুগল টকে সারতে হবে। মন্ত্রিসভা, একনেক, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক দিয়েই তা শুরু করতে হবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয়, রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম কমবে কর্মদক্ষতা বাড়বে। মানুষের হয়রানি কমবে। যেসব দেশ এসব কার্যকর করতে পারবে না তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে হেরে যাবে।

দুটি অনুগল্প দিয়ে লেখা শেষ করি। সাবেক সহকর্মী জালাল আহমদ ফেসবুকে ছবি দিয়েছেন তার নবপরিণীতা স্ত্রী হবিগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে ঘন আঁশযুক্ত মাছ পরিষ্কার কাটার পরীক্ষা দিচ্ছেন। নবপরিণীতা পরীক্ষক মা, খালা, নানি, দাদিদের সবার মুখের হাসি দেখে মনে হচ্ছে, চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে। নারী-পুরুষ সমানাধিকারে বর্তমান যুগে কনের বাড়িতে জামাই নবজাত শিশুর ন্যাপি পরিষ্কার করতে পারে কিনা চাচা, মামা, খালুরা সে পরীক্ষা নিতে পারেন। আগে বিয়ের আগে-পরে অনেক আনন্দ হতো। এখন মুম্বাইয়ের ছবির অনুকরণে জৌলুশপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাতে প্রাণের উচ্ছলতা নেই। সেসব বিয়ের অনেকগুলো আবার  কদিন পরই ভেঙে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় গল্পটিও সিলেট থেকে। আমরা তখন টিলাগড়ে মুরারীচাঁদ সরকারি কলেজের আবাসে থাকি। একদিন দেখি আব্বা বাসার পেছনে কাঠা দুয়েক জায়গায় একটা ছোট খুরপি দিয়ে মাটি আলগা করছেন। আমি তখন টগবগে, তাগড়া জোয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আব্বাকে বললাম, আপনি রেস্ট নেন। বাকিটা আমি করে দিচ্ছি। আব্বা মৃদু আপত্তি করলেন, তুই কি পারবি? তবে সরে গেলেন। আমি পাশের পোলট্রি ফার্ম থেকে বড় একটা কোদাল নিয়ে মাটি কোপাতে লাগলাম। ১০ মিনিটের মধ্যেই হাতে ফোসকা পড়ে গেল আর আমি হাঁপাতে শুরু করলাম। আম্মা আমার অবস্থা দেখে বললেন, তুই উঠে আয়। তোর আব্বা শেষ করবে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। তার কিছুক্ষণ পর শেখঘাট কলোনিতে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে সন্ধ্যায় ফিরে আসি। দেখি আব্বা পুরো জমিটাই সবজি ক্ষেতের জন্য তৈরি করে ফেলেছেন। তথাকথিত উন্নয়ন আমাদের অকর্মণ্য করে তুলেছে, আমাদের বিয়ের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আমরা আমাদের আনন্দের দিনগুলোতে সকর্মণ্য হয়ে ফিরে যেতে চাই। আমরা স্বজন সান্নিধ্যে আবার গৃহবাসী হতে চাই।

 

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান: সাবেক সচিব অধ্যাপক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন