শনিবার | অক্টোবর ৩১, ২০২০ | ১৬ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

কিস্তি পরিশোধে পুরো বছরই ছাড় পেলেন ঋণগ্রহীতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে দুই দফায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছাড় দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ব্যবসায়ীরা ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি স্থগিত রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। একই দাবি ছিল খেলাপি ঋণ কম এমন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদেরও। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের দাবি মেনে নিয়ে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের জন্য আবারো সুসংবাদ দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো গ্রাহক ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলে তাকে খেলাপি দেখানো যাবে না। এর ফলে পুরো বছরের জন্যই কিস্তি পরিশোধে ছাড় পেলেন ঋণগ্রহীতারা।

করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক দুর্যোগে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিতে সবার আগে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ না করলেও কোনো ঋণ খেলাপি না করার নির্দেশনা দেয়া হয় মার্চের শেষ সপ্তাহেই। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। সে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধের মেয়াদে আরো ছাড় দিয়ে গতকাল প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি ঋণের শ্রেণীমান যা ছিল, আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সময়ে উক্ত ঋণ তদাপেক্ষা বিরূপমানে শ্রেণীকরণ করা যাবে না। তবে কোনো ঋণ শ্রেণীমানের উন্নতি হলে তা যথাযথ নিয়মে শ্রেণীকরণ করা যাবে। ২০২০ সালের জানুয়ারি বিদ্যমান মেয়াদি (স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ ক্ষুদ্রঋণসহ) ঋণের বিপরীতে জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর সময়কালীন প্রদেয় কিস্তিগুলো বিলম্বিত হিসেবে বিবেচিত হবে।

এতে আরো বলা হয়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট ঋণের কিস্তির পরিমাণ সংখ্যা পুনর্নির্ধারিত হবে। পুনর্নির্ধারণকালে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যতসংখ্যক কিস্তি প্রদেয় ছিল তার সমসংখ্যক কিস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো কিস্তি পরিশোধিত না হলেও ওই কিস্তিগুলোর জন্য মেয়াদি ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন না।

শ্রেণীকরণের সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করায় ভালো গ্রাহকরাও ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করবেন না বলে মনে করেন ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখে ঋণ পরিশোধে বাধ্যবাধকতার সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করলে নির্দেশনা ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো, নতুন নির্দেশনার ফলে বছর কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার সুযোগ থাকল না। এতে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলো চিহ্নিত হবে না। ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে ২০২১ সালে। আগামী বছর খেলাপি ঋণ এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি তারিখে বিদ্যমান চলমান তলবি ঋণগুলো এবং ওই তারিখ থেকে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সৃষ্ট তলবি প্রকৃতির ঋণের মেয়াদ/সমন্বয়ের তারিখ বিদ্যমান মেয়াদ হতে ১২ মাস অথবা ২০২০-এর ৩১ ডিসেম্বর তারিখ (যেটি আগে ঘটে) পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। এসব সুবিধা চলাকালীন ঋণের ওপর সুদ আরোপের ক্ষেত্রে এতত্সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ, ঋণ শ্রেণীকরণ, পুনঃতফসিলীকরণ অথবা বিশেষ সুবিধার আওতায় পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, সেসব ঋণের বিপরীতে নগদ আদায় ব্যতীত আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। সময়ে ঋণের ওপর কোনোরূপ দণ্ড সুদ বা অতিরিক্ত ফি আরোপ করা যাবে না বলেও প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে।

কোনো গ্রাহকের বিশেষ সুবিধা নেয়ার দরকার না হলে পূর্বনির্ধারিত পরিশোধসূচি অথবা ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয় করা যাবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বিশেষ সুবিধা গ্রহণ না করে কোনো গ্রাহক কর্তৃক স্বেচ্ছায় মেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং চলতি তলবি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক কর্তৃক যৌক্তিক রিবেট সুবিধা প্রদান করা যাবে।

ঋণের কিস্তি ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। খেলাপি ঋণ কম এমন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও তাই চাচ্ছিলেন। কিন্তু দাবি পূরণ করতে গিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কারণ ঋণের কিস্তি ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হলে চলতি বছর কোনো ঋণই খেলাপি হবে না। ফলে প্রয়োজন হবে না সঞ্চিতি সংরক্ষণেরও। খেলাপি হওয়া কিছু ঋণ আদায় হওয়ায় মুক্ত হবে আগের সঞ্চিতির অর্থ। পুঁজিবাজার চাঙ্গা হওয়ায় খাতে আয় বাড়বে ব্যাংকগুলোর। সব মিলিয়ে বছর শেষে করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা বেড়ে গেলে তা হিতে বিপরীত হবে। বেশি ডিভিডেন্ড দিয়ে পরিচালকরা বেসরকারি ব্যাংক থেকে মুনাফার অর্থ বের করে নেবেন। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত দুর্বল হবে। এজন্য সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মুনাফা পরিস্থিতি দেখেই শ্রেণীকৃত ঋণের সময় গণনা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি ভাবছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করার। শেষ পর্যন্ত সরকারের নির্দেশনাই মেনে নিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে ব্যাংকগুলোর মুনাফা সঞ্চিতি সংরক্ষণের বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, জারীকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধ বা সমন্বয়ের জন্য বর্ধিত সময়ের সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণের ওপর আরোপিত সুদ আয় খাতে স্থানান্তরকরণ এবং ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হবে।

এদিকে কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা শিথিল করায় চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সময়ে ব্যাংকগুলো শিল্পের মেয়াদি ঋণ থেকে আদায় করেছে ১০ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। যদিও ২০১৯ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকগুলো খাত থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আদায় করতে পেরেছিল। অর্থ আদায়ে একই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর অন্যান্য ঋণেও। সিএসএমই, কৃষিসহ ব্যাংকের সব ধরনের ঋণের কিস্তি আদায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে কমেছে ব্যাংকগুলোর ক্যাশ ফ্লো।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। যদিও ২০১৯ সালে রেকর্ড ৫০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়মিত করেছে ব্যাংকগুলো। বিদায়ী বছর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি, পুনঃতফসিল পুনর্গঠনকৃত দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে লাখ ৩৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। ঋণের সঙ্গে অবলোপনকৃত প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ঋণ যুক্ত হলে ব্যাংকিং খাতের বিপদগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকার বেশি। চলতি বছরে কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার সুযোগ না থাকায় কাগজেকলমে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমবে। কিন্তু ২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ধাক্কা সামাল দেয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন