শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

ক্রেডিট কার্ডের সুদে লাগাম টানল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহারের সঙ্গে বাড়তি শতাংশ যোগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে সুদ নির্ধারণের বিষয়ে প্রায় তিন বছর আগে নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সামান্যও বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড সেবা চালু থাকা ৩৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২৮টিরই ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ২০ শতাংশের বেশি। অবস্থায় ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করে দেয়ার পথেই হাঁটল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী অক্টোবর থেকে দেশের কোনো ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডে ২০ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করতে পারবে না।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং প্রবিধি নীতি বিভাগ থেকে -সংক্রান্ত জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ডে সুদ আরোপ শুরু হবে ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের পর। বর্তমানে ব্যাংকগুলো ৪৫ দিন পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয়। ক্রেডিট কার্ডে ঋণসীমার বিপরীতে ৫০ শতাংশের বেশি নগদ উত্তোলন করা যাবে না বলেও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে দেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের (ক্রেডিট কার্ড ছাড়া) সর্বোচ্চ সুদহার শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। সে হিসেবে শতাংশ যোগ করে ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ডের সুদহার হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ। কিন্তু এখনো দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডে সুদ নিচ্ছে ২৪-২৭ শতাংশ।

কাগজে-কলমে দেশের ৩৭টি সরকারি-বেসরকারি বিদেশী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড থাকলেও সিংহভাগ ব্যাংকেরই গ্রাহক হাতেগোনা। মূলত দেশের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। দেশের ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড সংখ্যা ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ৭৪৮। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংকেরই কার্ড সংখ্যা লাখ ৫০ হাজারের বেশি। বিদেশী স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, বেসরকারি ব্র্যাক, প্রাইম ইস্টার্ন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ক্রেডিট কার্ডের প্রায় ৫০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডে শীর্ষস্থানীয় সবকটি ব্যাংকের সুদহারই ২৪ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে সুদ আদায় করছে ২৪ শতাংশ।

ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়ায় দ্য সিটি ব্যাংকের আয় কমবে বলে মনে করেন ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ক্রেডিট কার্ডে গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে সিটি ব্যাংক দেশে সবার শীর্ষে। খাতে আমাদের বিপুল বিনিয়োগ জনবল আছে। ক্রেডিট কার্ডে ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এজন্যই ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদহার বেশি রাখতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়ায় আমাদের ক্রেডিট কার্ডে - শতাংশ সুদ কমাতে হবে। এতে সিটি ব্যাংকের আয় কমবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ক্রেডিট কার্ডের সুদহার কমিয়ে আনব।

সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় ক্রেডিট কার্ডের দেয়া ঋণের বিপরীতে খেয়ালখুশিমতো সুদ আদায় করছিল ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছিল। এর বাইরে বিভিন্ন নামে চার্জ আদায়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন গ্রাহকরা। ক্রেডিট কার্ডের সুদের নৈরাজ্য নিয়ে ২০১৭ সালে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বণিক বার্তা। পরে ২০১৭ সালের আগস্ট সুদহার বেঁধে দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু নানা অজুহাতে জারি করা নীতিমালার শর্ত লঙ্ঘন করে আসছিল ব্যাংকগুলো। পরিপ্রেক্ষিতেই ক্রেডিট কার্ডের সুদহার বেঁধে নিয়ে গতকাল নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্ট ক্রেডিট কার্ড বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নীতিমালা জারি করা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, ক্রেডিট কার্ডের সুদহার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অন্যান্য ঋণের সুদের সর্বোচ্চ সুদহারের চেয়ে শতাংশের বেশি হবে না এবং সুদহার কেবল অপরিশোধিত বকেয়া স্থিতির ওপর প্রযোজ্য হবে। ওই নীতিমালার নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডে নির্ধারিত সীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ আগাম হিসেবে নগদ উত্তোলন করা যাবে এবং ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে গ্রাহককে কোনো আনসলিসিটেড ঋণ বা অন্য কোনো ঋণ দেয়া যাবে না।

কোনো কোনো ব্যাংক ওই নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন প্রকার নগদে উত্তোলনযোগ্য ঋণ সুবিধা দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ধরনের তত্পরতা ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং ধরনের ঋণের ওপর ফ্ল্যাট রেটে অযৌক্তিকভাবে বেশি সুদ আরোপ/আদায় করছে; যা গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছে। এছাড়া কোনো কোনো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের পরিশোধ না করা বিলের ওপর লেনদেনের তারিখ থেকেই সুদ আরোপ এবং পরিশোধ না করা বিলের বিপরীতে প্রগ্রেসিভ রেটে বিলম্ব ফি আদায় করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

অবস্থায় ক্রেডিট কার্ড লিমিটের বিপরীতে ঋণ সুবিধাসহ মুনাফা যৌক্তিকীকরণ এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগামী অক্টোবর থেকে ক্রেডিট কার্ডের মুনাফার হার ২০ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা যাবে না। ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের জন্য নির্ধারিত সর্বশেষ তারিখের পরদিন থেকে অপরিশোধিত বিলের ওপর সুদ আরোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই লেনদেনের তারিখ থেকে সুদ আরোপ করা যাবে না বলে ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে সুদ আরোপের সময়সীমা নির্ধারণের শর্তটি ব্যাংকের পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেন, সব ঋণের সুদহার শতাংশে নেমে আসায় ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ২০ শতাংশ যৌক্তিক বলেই মনে হয়। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্রেডিট কার্ডে বাংলাদেশের চেয়েও বেশি সুদ আদায় করা হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ড পরিচালনায় ব্যাংকের যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তাতে সুদহার বেশি হওয়াই প্রত্যাশিত। তার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদহার বেঁধে দিয়েছে, তা ব্যাংকগুলো মেনে চলতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, অপরিশোধিত বিলের ওপর বিল পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের পরদিন থেকে সুদ আরোপ করার শর্তটি মেনে নেয়া কঠিন। একজন ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক ব্যাংকের যে পরিমাণ অর্থ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ব্যবহার করেন, সে সময়ের জন্য ওই অর্থের ওপর আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে কস্ট অব ফান্ড কোত্থেকে আসবে, সেটিও ভেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ নগদে উত্তোলনযোগ্য ঋণ সুবিধা ছাড়া অন্য কোনো নামে নগদে উত্তোলনযোগ্য ঋণ সুবিধা দেয়া যাবে না। বিলম্বে পরিশোধিত কোনো বিলের বিপরীতে শুধু একবার বিলম্ব ফি (অন্য যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন) আদায় করা যাবে। এছাড়া ক্রেডিট কার্ডের আগের নীতিমালার অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে।

১২-১৭ শতাংশ সুদে গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক লিমিটেড। সুদে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে মুনাফা কেমন হয়? এমন প্রশ্নের উত্তরে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, আমাদের নিজস্ব কিছু গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছি। গণহারে ক্রেডিট কার্ড বিপণনের পলিসি আমাদের নেই। এজন্য কম সুদ দিয়েও আমরা ক্রেডিট কার্ডে মুনাফা করতে পারছি। বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের জন্য যে নতুন নীতিমালা দিয়েছে, তা মেনে চলতে পূবালী ব্যাংকের সমস্যা হবে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন