বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৯, ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

করোনা

মহামারীতে বিজ্ঞান ও নীতিনির্ধারণের সম্পর্ক

বণিক বার্তা ডেস্ক

কভিড-১৯-এর মহামারীকালে বিজ্ঞান মনোযোগ আলাপের কেন্দ্রে চলে এসেছে। শুরুর দিকে সার্স-কোভ- যখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হতে শুরু করেছে, তখন অনেক গবেষক উৎসাহী হয়ে মনোযোগ দিয়েছিলেন ভাইরাস নিয়ে গবেষণায়। একই সময়ে কিছু বিজ্ঞানী বিজ্ঞান উপদেষ্টা-বিশেষজ্ঞ দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন নীতিনির্ধারকদের তথ্য সরবরাহ করার জন্য। স্থির সতর্কতার সঙ্গে মানুষকে দ্রুতগতিতে বিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করে এবং নিজেদের বিশেষজ্ঞ মত দিয়ে জনগণকে সতর্ক করে তারা তারকা খ্যাতি অর্জন করেছেন। যেগুলো ছিল মূলত লকডাউন সম্পর্কিত এবং সংক্রমণের গতি কমানোর জন্য অন্যান্য বিধিনিষেধ।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা পলিসি ডিরেক্টর ক্রিস টাইলার বলেন, একাডেমিগুলো কভিড-১৯-এর সময়ে অসাধারণ কাজ করেছে, চেষ্টা করেছে যত বেশি সম্ভব প্রাসঙ্গিক তথ্য জোগাড় করতে এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে সরবরাহ করে সাহায্য করতে।

কিন্তু মহামারীকালে কভিড সম্পর্কিত বিজ্ঞান যে গতিতে চালিত প্রচারিত হয়েছে তা কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত নন এমন দর্শকদের জন্য দ্রুত জমা হতে থাকা প্রমাণগুলোকে তুলে ধরা কঠিন ছিল। আবার গবেষণা থেকে উপলব্ধ ফলাফলগুলো দ্রুতগতিতে প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে পোস্ট করা হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলগুলো প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোর হেডলাইনে পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো যথাযথ তদন্ত ছাড়াই তা ছড়িয়ে পড়েছে।

অনেক রাজনীতিবিদ যেমন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো দ্রুত অপরিপক্ব অনুসন্ধানগুলোকে লুফে নিয়েছেন। জনসম্মুখে ন্যূনতম প্রমাণ ছাড়াই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের মতো চিকিৎসা বিষয়ে কথা বলেছেন। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে কেউ কেউ সন্দেহের আঙুল তুলেছেন বিজ্ঞানীদের দিকেই। এক্ষেত্রে আমরা উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের বিজ্ঞান উপদেষ্টা অ্যান্থনি ফাউসির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর কথা বলতে পারি।

কোনো কোনো বিশ্বনেতার মন্তব্যগুলো বেশ উদ্বেগজনক ছিল। টাইলার বলেন, আমার জন্য সবচেয়ে ধাক্কার বিষয় ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জীবাণুনাশক শরীরে ইনজেক্ট করতে বলেন। কভিডের চিকিৎসার পদ্ধতি হিসেবে এটা বেশ চোখ ধাঁধানো হতবুদ্ধি হওয়ার মতো ছিল।

তার পরও টাইলার মনে করেন, অনেক দেশে মহামারীকে ঘিরে বিজ্ঞান সম্প্রদায় নীতিনির্ধারকদের সম্পর্ক বেশ দারুণ। উদাহরণ হিসেবে তিনি জার্মানির নাম উল্লেখ করেছেন। দেশটিতে সরকার বিভিন্ন খাতের নীতিনির্ধারণীতে বিজ্ঞানীদের পরামর্শকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন। যেখানে এপিডেমিওলজি, ভাইরোলজি, অর্থনীতি জনস্বাস্থ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গবেষকরা এখন সামনের বছরগুলোতে মহামারীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। একই সময়ে বিজ্ঞানীরা, যারা নীতিনির্ধারণীতে যুক্ত হতে আগ্রহী তাদের শিক্ষা নেয়ার মতো অনেক কিছু আছে। এছাড়া মহামারীর প্রাথমিক কিছু অন্তর্দৃষ্টি দেখা গেছে, যা বিজ্ঞানী নীতিনির্ধারকদের মধ্যকার সম্পর্ককে উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। ফলে সামনের দিনগুলোতে আরো বেশি প্রমাণনির্ভর নীতি সামনে আসবে।

বিজ্ঞানী নীতিনির্ধারকদের সংস্কৃতিগত পার্থক্য

জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ছাড়াও পলিসিতে নির্বিঘ্নে বৈজ্ঞানিক উপদেশগুলো প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কিছু বাধা রয়েছে। একটি সহজ বিষয় হলো বিজ্ঞানী নীতিনির্ধারকরা সাধারণত ভিন্ন প্রণোদনা সিস্টেমের সঙ্গে বাধিত থাকেন। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির হেলথ পলিসি ম্যানেজমেন্টের প্রফেসর কাই রুগেরি বলেন, চিরায়তভাবে, একজন বিজ্ঞানী কোনো কিছু বোঝার স্বার্থে বুঝতে চান। কারণ বিষয়টির প্রতি তাদের প্যাশন রয়েছে। তাই আবিষ্কার চালিত হয় তার মান দ্বারা। অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের অনেক বেশি উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাদের এমনভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয় যেন তা বেশির ভাগ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনে।

বিজ্ঞানী নীতিনির্ধারকরা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিচালিত হয় ভিন্ন সময়সীমা দ্বারা। টাইলার বলেন, সচরাচর গবেষণা প্রোগ্রামে কয়েক মাস কিংবা বছর লাগতে পারে। যেখানে নীতিনির্ধারণের সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয় সপ্তাহ এবং মাসের মধ্যে। কখনো কখনো তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় কয়েক দিনের মধ্যে। পার্থক্যগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে উৎপাদিত জ্ঞানকে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়াতে সংযুক্ত করাকে বেশ কঠিন করে তুলেছে। টাইলার বলেন, দুটি দল অনিশ্চয়তাকে খুবই ভিন্নভাবে মোকাবেলা করে। একাডেমিকরা এর সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত, কারণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার অংশ। যেখানে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে যথার্থতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংস্কৃতিগত পার্থক্য বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়েছে কভিড-১৯-এর মহামারীকালে। যেখানে বিজ্ঞানীরা খুব দ্রুতগতিতে কাজ করার পরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেমন ভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং শিশুরা সংক্রমণের বিস্তৃতিতে কেমন ভূমিকা রাখে, সেগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সে সঙ্গে পলিসিবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো নিতে হয়েছিল সীমিত প্রমাণের ভিত্তিতে। পাশাপাশি গবেষণায় পরিবর্তন আসার সঙ্গে প্রমাণেরও পরিবর্তন হয়ে গেছে।

পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রফেসর কারেন আকেরলফ বলেন, আমরা বিজ্ঞানের অগোছালো দিকটি দেখেছি। সব গবেষণা সমানভাবে সম্পন্ন করা ছিল না। উদাহরণস্বরূপ বিস্তৃতভাবে মাস্কের ব্যবহারের কথা বলা যায়। শুরুতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সরবরাহ স্বল্পতার আশঙ্কায় অনেক রাজনৈতিক নেতা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দ্বারা সর্বসাধারণের মাস্ক পরাকে অনুৎসাহিত করা হয়েছিল। পাশাপাশি মাস্ক পরা আসলেই সাধারণ মানুষকে সাহায্য করে কিনা সে সম্পর্কিত তথ্যও ছিল কম। সে সময় পূর্ব এশিয়ার বাইরে খুব অল্প জায়গাতেই মাস্ক পরা নিয়ে বাধ্যবাধকতা ছিল। অবশ্য সেখানে কভিড-১৯ মহামারীর অনেক আগে থেকেই মাস্ক পরার বিধান ছিল।

এরপর ধীরে ধীরে গবেষণাগুলো প্রমাণ দিতে থাকে যে মুখ ঢেকে রাখার ফলে সংক্রমণকে হ্রাস করা সম্ভব। ফলে বিজ্ঞানী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও এটি ব্যবহার করার প্রতি জোর দিতে থাকেন। যা আবার বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোকে চালিত করে নির্দিষ্ট জনপরিসরে মাস্ক পরাকে বাধ্যতামূলক করার দিকে।

প্রফেসর ম্যাগান আজাদ বলেন, আমরা এমন সব প্রমাণ নিয়ে কাজ করছি, যা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তবে এটা ভালো যে বিষয়গুলো বদলে যাচ্ছে কারণ এর অর্থ আমরা নতুন প্রমাণে নজর দিতে পারছি যা সামনে আসছে।

বিজ্ঞান পলিসিকে ঐক্যবদ্ধ করা

নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিজ্ঞান পলিসি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি উপায় আছে দুটি সম্প্রদায়ের মাঝে সম্পর্ককে উন্নতি করার জন্য, যা কিনা নীতিনির্ধারকদের সাহায্য করবে আরো বেশি প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য।

উপযুক্ত সরঞ্জাম পার্থক্য দূর করতে সাহায্য করতে পারে। বছরের শুরুর দিকে রুগেরি বিভিন্ন খাতের কর্মরত বিশেষজ্ঞদের এক জায়গায় নিয়ে আসার প্রয়াস নেন। যেখানে মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং, অর্থনীতি এবং পলিসি তৈরির কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে সব মিলিয়ে মহামারী থেকে পাওয়া শিক্ষাকে আরো বেশি কাজে লাগিয়ে দুটি সম্প্রদায়কে এক জায়গায় আনতে পারলে ভবিষ্যৎ মহামারীগুলোকে আরে ভালোভাবে ঠেকানো সম্ভব হবে।

দ্য সায়েন্টিস্ট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন