বুধবার | অক্টোবর ২১, ২০২০ | ৬ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

শিনজো আবের উষ্ণতা সুগাতেও পাবে বাংলাদেশ?

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

টানা আট বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে জাপানকে রাজনৈতিক অর্থনৈতিকভাবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন শিনজো আবে। তার গৃহীত আবেনোমিকস অর্থনীতিতে যেমন পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, তেমনি তার পররাষ্ট্রনীতিও টোকিওকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী, বিশ্বস্ত সম্মানিত করেছে বহির্বিশ্বের কাছে। কূটনেতিক সম্পর্ক জোরদার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফর করেন আবে, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদ থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জাপানকে সমর্থন দেয়ায় সফরকালে বাংলাদেশকে শুধু ধন্যবাদ দিয়েই থেমে ছিলেন না তিনি। প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, জাপান বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াবে। চার-পাঁচ বছরে ৬০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তার ঘোষণা দেয়া হয়। এর মধ্যে ১২০ কোটি ডলার তখনই ছাড় হয়েছে। একজন দক্ষ রাজনীতিক হিসেবে এভাবেই ছয় বছর ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছিলেন আবে। স্বাস্থ্যগত কারণে আবের হঠাৎ পদত্যাগে দুদেশের সম্পর্কে আগের সেই উষ্ণতা থাকবে কিনা, কিংবা উত্তরসূরি ইয়োশিহিদে সুগা শিনজো আবের মতো বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন কিনা, তা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে কূটনৈতিক মহলে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালে শিনজো আবের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের যে নতুন যাত্রা হয়েছিল তখন চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখনকার মতো এত নিবিড় ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে গিয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুদেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের ২৭টি প্রকল্পে হাজার ৪০০ কোটি ডলার ঋণ প্রদানে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে চীন। ২০১৭ সালকে বন্ধুত্বের বছর হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বড় প্রকল্পে চীনের প্রভাবের কারণে এরই মধ্যে সবচেয়ে কাছের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে আগের উষ্ণতায় ভাটা যাচ্ছে বাংলাদেশের। যেহেতু ভারতের মতো জাপানের সঙ্গেও বৈরী সম্পর্ক রয়েছে চীনের, অবস্থায় পরস্পর শীতল সম্পর্কের দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সমানতালে মধুর সম্পর্ক রক্ষা করতে পারবে কিনা, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, সম্পর্ক পরিবর্তন হওয়ার কোনো কারণ নেই। নতুন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সহযোগী ছিলেন। বরং নতুন প্রধানমন্ত্রীকে রোহিঙ্গা বিষয়ে আগে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে হবে। শিনজো আবে যেহেতু বহুদিন ধরে ছিলেন, মিয়ানমার নিয়ে তার দুর্বলতা থাকতে পারে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মাত্র যোগদান করেছেন। বাংলাদেশের আগে যদি মিয়ানমার জাপানে চলে যায়, তবে আবারো জাপানকে পক্ষে পেয়ে যাবে তারা। বাংলাদেশের উচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের একটি দ্রুত সফর করা, যাতে তাদের বোঝানো যায় কীভাবে মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়াতারা (জাপান) গণহত্যার পক্ষে, না বিপক্ষে?

১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া  জাপান    দেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। স্বাধীনতার পর থেকে পর্যন্ত ২২ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা দিয়েছে  দেশটি। জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদ থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া এবং এক্ষেত্রে জাপানকে সমর্থন দেয়ার পুরস্কার  হিসেবে শিনজো আবের সফরের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৭২৩ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহযোগিতা করেছে জাপান। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অফিশিয়াল ডেভেলপমন্টে অ্যাসিস্ট্যান্ট (ওডিএ) উন্নয়ন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। রেকর্ড ভেঙে চলতি বছর আরো বেশি ওডিএর প্রতিশ্রুতি দেয় টোকিও। এসবই হয়েছে শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে। কিন্তু সম্প্রতি দায়িত্ব নেয়া জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা সেই সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রাখবেন কিনা, সেটাই দেখার অপেক্ষা এখন। যদিও দায়িত্ব নেয়ার আগেই ইয়োশিহিদে সুগা ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি আবের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবেন না। শুধু তা- নয়, দায়িত্ব নেয়ার পর নিজেকে আবের ধারাবাহিকতা বলেও উল্লেখ করেছেন সুগা।

নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে আশা করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী . কে আব্দুল মোমেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, জাপান আমাদের বৃহৎ উন্নয়ন-সহযোগী। আর আমরা খুবই আশাবাদী যে নতুন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সম্পর্ক আরো উচ্চতর স্থানে যাবে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপানের অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিয়ানমারে জাপান প্রচুর বিনিয়োগ করছে। জাপানের একটি বড় বন্ধু মিয়ানমার। সম্প্রতি জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেছেন। তিনি সেখানে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোর তাগিদ দিয়েছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও শিনজো আবের রোহিঙ্গা নীতি নিয়ে অস্বস্তি ছিল বাংলাদেশের। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ক্যাম্পে থাকা মানুষগুলোকে অর্থ ত্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করলেও আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষে ছিল জাপান। সম্প্রতি শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেন। সময়ে চলমান রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে শিনজো আবেকে অবহিত করেন এবং সংকট উত্তরণে জাপান সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শিনজো আবে মিয়ানমারের সঙ্গে বিষয়ে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দেন। ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগাকে আগে থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে আসার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, নতুন যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনিও শিনজো আবে সরকারেরই অংশ ছিলেন। তিনিও একই কেবিনেটে ছিলেন। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও যুক্ত ছিলেন। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ওনার সম্মতি ছিল। আর বড় বড় বৈঠকেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেকেছেন।

তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক পুরনো। এখানে দুদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সরকার বা দল প্রাধান্য পায়নি। সুতরাং সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে। আর জাপান ইন্দোপ্যাসিফিক করিডরের অন্যতম অংশ। এটিতে গুরুত্ব দিচ্ছে জাপান। বাংলাদেশও ইন্দোপ্যাসিফিক করিডরে যোগ দিয়েছে। ফলে এদিক থেকেও সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশলগত কারণ রয়েছে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার জাপান। চলতি বছরেও সাতটি প্রকল্পে ৩২০ কোটি ডলারের ওডিএ সই করেছে বাংলাদেশ-জাপান। দুদেশের ৪১তম ওডিএর আওতায় ঋণসহায়তা সই করা হয়েছে। দুদেশের সম্পর্কে এটি সবচেয়ে বড় ঋণসহায়তা দিয়েছে জাপান। ৪১তম ওডিএতে দশমিক ৬৫ শতাংশ সুদে ৩০ বছরের সময় দেয়া হয়েছে ঋণ পরিশোধে। সেই সঙ্গে ১০ বছরের অতিরিক্ত সময় বা গ্রেস পিরিয়ড দেয়া হয়েছে। এতে দশমিক শূন্য শতাংশ পরামর্শক ফি রাখা হয়েছে। ৪১তম ওডিএতে যমুনা রেল সেতু-- ৮৯ দশমিক শূন্য ১৬ বিলিয়ন ইয়েন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প-- ৮০ বিলিয়ন, ঢাকা এমআরটি প্রকল্পে ৭২ দশমিক ১৯৪ বিলিয়ন, ঢাকা এমআরটি লাইন প্রকল্পে ৫৫ দশমিক ৬৯৬ বিলিয়ন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে দশমিক ৯০৬ বিলিয়ন, ফুড ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্পে ১১ দশমিক ২১৮ বিলিয়ন এবং শহর উন্নয়ন শহর সুশাসন প্রকল্পে ২৮ দশমিক ২১৭ বিলিয়ন ইয়েনে চুক্তি সই করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ৪০তম ওডিএতে ২৫০ কোটি ডলারের পাঁচটি প্রকল্প সই করেছে বাংলাদেশ জাপান। উন্নয়ন সহযোগিতার অধীনে মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-), বিদেশী বিনিয়োগ সহায়ক প্রকল্প () এবং জ্বালানি দক্ষতা সুরক্ষা সহায়ক প্রকল্পে (পর্যায়-) অর্থায়ন করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন