শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার হাল-হকিকত

ড. মো. আবু তাহের

উচ্চশিক্ষা একটি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে দ্রুত বদলে দিচ্ছে আজকের পৃথিবীকে। উপলব্ধি থেকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে যাচ্ছে। তবে এটাও সত্য যে উচ্চশিক্ষা অনেকটা ব্যয়বহুল হওয়ায় এর অর্থায়নেও অনেক দেশকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

স্বাধীনতা-উত্তর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার যাত্রা হয়েছিল। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি, আন্তর্জাতিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৮টিতে; যার মধ্যে ১৩৬টিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং এতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা (অধিভুক্ত অঙ্গীভূতসহ) ৪২ লাখ হাজার ৯৯৬।

সারণি-- দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর প্রায় ৬৭ ভাগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোয় অধ্যয়নরত; যদিও ওই কলেজগুলোয় পঠন-পাঠন শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন রয়েছে। সত্ত্বেও এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে কর্মমুখী আধুনিক জ্ঞান দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে সরকার ঘোষিত ভিশন ২০২১, ২০৩০ ২০৪১-এর বাস্তবায়ন সম্ভব।

গত ১০ বছরে (২০০৯-১৮) বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধির পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার গুণাগুণ উত্কর্ষ বৃদ্ধি করা দরকার। কেননা গুণগত মান ছাড়া শিক্ষার সংখ্যাগত বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতার প্রেসক্রিপশন মাত্র। তাই যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম, পঠন-পাঠন গবেষণার সর্বজনীনতা গ্রহণযোগ্য মানের রাখা অতি জরুরি।

সম্প্রতি কিউ.এস. ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২০ ছয়টি মানদণ্ডের আলোকে বিশ্বের এক হাজারটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি র্যাংকিং প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রথম ৮০০টির মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। তবে ৮০১ থেকে এক হাজারের মধ্যে বুয়েট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার কারণ উদ্ঘাটনপূর্বক কালবিলম্ব না করে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আগামীতে উচ্চশিক্ষার মান সুনিশ্চিত করতে হলে ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দসহ শিক্ষা গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধিসহ বহির্বিশ্বে দেশের ইমেজ বৃদ্ধিতে নানামুখী তত্পরতা চালাতে হবে। পাশাপাশি সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ, শিক্ষা প্রশাসনে অভিজ্ঞ, শিক্ষকতা গবেষণায় সুখ্যাতি অর্জনকারী এবং মুক্তিযুদ্ধ অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী অধ্যাপকদের যথাস্থানে পদায়ন করতে হবে। এতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা- (এসডিজি-) অনুযায়ী শিক্ষার মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।

স্বাধীনতা-উত্তর শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এর সম্প্রসারণও হয়েছে বেশ উল্লেখযোগ্য। তবে এটা সম্প্রসারণ নাকি বিস্ফোরণ, তা সময়েই বলে দেবে। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধিষ্ণু অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়া নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য সেবা সংস্থাগুলো পরিচালনার জন্য যোগ্য লোক না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশ থেকে লোক এনে কাজ চালাতে হচ্ছে। এটা দেশের জন্য মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তারা বেকার হয়ে পড়েছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ভাগ। আর অশিক্ষিতদের মধ্যে শতকরা দশমিক ভাগ বেকার। বর্তমানে শিক্ষিত অশিক্ষিত মিলিয়ে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। করোনা মহামারী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে।

এটা সত্য যে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার মান উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। এর অনেক কারণ রয়েছে, যার দায় ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা কেউ এড়াতে পারেন না। পৃথিবীব্যাপী উচ্চশিক্ষা সীমিত। কিন্তু বাংলাদেশে সেটাই সবচেয়ে সহজলভ্য। উচ্চশিক্ষা বিশেষায়িত হওয়া দরকার, যা সবার জন্য প্রয়োজন না- হতে পারে। বিশ্বায়নের যুগে কর্মবাজারে চাহিদা অনুযায়ী মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং এর কারিকুলাম, পাঠদান, পঠন-পাঠন, সর্বোপরি গবেষণার বিষয়টিকে ঢেলে সাজাতে হবে। যাতে আগামীতে উত্থিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে অর্থনীতির চাকাকে সচল গতিশীল রাখা সহজতর হয়।

 

. মো. আবু তাহের: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন